‘মা’কে নিয়ে কবিতা
মনে পড়া
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মাকে আমার পড়ে না মনে।
শুধু কখন খেলতে গিয়ে
হঠাৎ অকারণে
একটা কী সুর গুনগুনিয়ে
কানে আমার বাজে,
মায়ের কথা মিলায় যেন
আমার খেলার মাঝে।
মা বুঝি গান গাইত, আমার
দোলনা ঠেলে ঠেলে;
মা গিয়েছে, যেতে যেতে
গানটি গেছে ফেলে।
মাকে আমার পড়ে না মনে।
শুধু যখন আশ্বিনেতে
ভোরে শিউলিবনে
শিশির-ভেজা হাওয়া বেয়ে
ফুলের গন্ধ আসে,
তখন কেন মায়ের কথা
আমার মনে ভাসে?
কবে বুঝি আনত মা সেই
ফুলের সাজি বয়ে,
পুজোর গন্ধ আসে যে তাই
মায়ের গন্ধ হয়ে।
মাকে আমার পড়ে না মনে।
শুধু যখন বসি গিয়ে
শোবার ঘরের কোণে;
জানলা থেকে তাকাই দূরে
নীল আকাশের দিকে,
মনে হয় মা আমার পানে
চাইছে অনিমিখে।
কোলের ‘পরে ধরে কবে
দেখত আমায় চেয়ে,
সেই চাউনি রেখে গেছে
সারা আকাশ ছেয়ে।
মা
কাজি নজরুল ইসলাম
যেখানেতে দেখি যাহা
মা-এর মতন আহা
একটি কথায় এত সুধা মেশা নাই,
মায়ের মতন এত
আদর সোহাগ সে তো
আর কোনোখানে কেহ পাইবে না
ভাই।
হেরিলে মায়ের মুখ
দূরে যায় সব দুখ,
মায়ের কোলেতে শুয়ে জুড়ায়
পরান,
মায়ের শীতল কোলে
সকল যাতনা ভোলে
কত না সোহাগে মাতা বুকটি
ভরান।
কত করি উৎপাত
আবদার দিন রাত,
সব সন হাসি মুখে, ওরে সে যে
মা!
আমাদের মুখ চেয়ে
নিজে রন নাহি খেয়ে,
শত দোষে দোষী তবু মা তো
ত্যজে না।
ছিনু খোকা এতটুকু,
একটুতে ছোটো বুক
যখন ভাঙিয়া যেত, মা-ই সে তখন
বুকে করে নিশিদিন
আরাম-বিরামহীন
দোলা দিয়ে শুধাতেন, ‘কী হল
খোকন?’
আহা সে কতই রাতি
শিয়রে জ্বালায়ে বাতি
একটু অসুখ হলে জাগেন মাতা,
সবকিছু ভুলে গিয়ে
কেবল আমারে নিয়ে
কত আকুলতা যেন জগন্মাতা।
যখন জনম নিনু
কত অসহায় ছিনু,
কাঁদা ছাড়া নাহি জানিতাম
কোনো কিছু,
ওঠা বসা দূরে যাক—
মুখে নাহি ছিল বাক,
চাহনি ফিরিত শুধু মা-র পিছু
পিছু!
তখন সে মা আমার
চুমু খেয়ে বারবার
চাপিতেন বুকে, শুধু একটি
চাওয়ায়
বুঝিয়া নিতেন যত
আমার কী ব্যথা হত,
বলো কে এমন স্নেহে বুকটি
ছাওয়ায়!
তারপর কত দুখে
আমারে ধরিয়া বুকে
করিয়া তুলেছে মাতা দেখো কত
বড়ো,
কত না সুন্দর
এ দেহ এ অন্তর
সব মোরা ভাই বোন হেথা যত পড়।
পাঠশালা হতে যবে
ঘরে ফিরি যাব সবে,
কত না আদরে কোলে তুলি নেবে
মাতা,
খাবার ধরিয়া মুখে
শুধাবেন কত সুখে
‘কত আজ লেখা হল, পড়া কত
পাতা?’
পড়ে লেখা ভালো হলে
দেখেছ সে কত ছলে
ঘরে ঘরে মা আমার কত নাম করে!
বলে, ‘মোর খোকামণি।
হিরা-মানিকের খনি,
এমনটি নাই কারও!’ শুনে বুক
ভরে!
গা-টি গরম হলে
মা সে চোখের জলে
ভেসে বলে, ‘ওরে জাদু কী
হয়েচে বল!’
কত দেবতার ‘থানে’
পিরে মা মানত মানে—
মাতা ছাড়া নাই কারও চোকে এত
জল।
যখন ঘুমায় থাকি
জাগে রে কাহার আঁখি
আমার শিয়রে, আহা কীসে হবে
ঘুম!
তাই কত ছড়া গানে
ঘুম-পাড়ানিরে আনে,
বলে, ‘ঘুম! দিয়ে যা রে
খুকু-চোখে চুম!’
দিবানিশি ভাবনা
কীসে ক্লেশ পাব না,
কীসে সে মানুষ হব, বড়ো হব
কীসে;
বুক ভরে ওঠে মার
ছেলেরই গরবে তাঁর,
সব দুখ সুখ হয় মায়ের আশিসে।
আয় তবে ভাই বোন,
আয় সবে আয় শোন
গাই গান, পদধূলি শিরে লয়ে
মা-র;
মার বড়ো কেউ নাই—
কেউ নাই কেউ নাই!
নত করি বল সবে ‘মা আমার! মা
আমার!’
মা
কাজী
কাদের নেওয়াজ
মা কথাটি চোট্ট অতি
কিন্তু জেনো ভাই,
ইহার চেয়ে নাম যে মধুর
তিন ভুবনে নাই।
সত্য ন্যায়ের ধর্ম থাকুক
মাথার ‘পরে আজি,
অন্তরে মা থাকুন মম
ঝরুক স্নেহরাজি।
রোগ বিছানায় শুয়ে শুয়ে
যন্ত্রণাতে মরি,
সান্তনা পাই মায়ের মধু
নামটি হৃদে স্মরি।
বিদেশ গেলে ঐ মধু নাম
জপ করি অন্তরে,
মন যে কেমন করে
আমার প্রাণ যে কেমন করে।
মা যে আমার ঘুম পাড়াত
দোলনা ঠেলে ঠেলে
শীতল হত প্রাণটা, মায়ের
হাতটা বুকে পেলে।
কত ভালবাসি
কামিনী রায়
জড়ায়ে
মায়ের গলা শিশু কহে আসি,—
“মা,
তোমারে কত ভালবাসি!”
“কত
ভালবাস ধন?” জননী শুধায়।
“এ-ত।”
বলি দুই হাত প্রসারি' দেখায়।
“তুমি
মা আমারে ভালবাস কতখানি?”
মা বলেন
“মাপ তার আমি নাহি জানি।”
“তবু
কতখানি, বল।”
“যতখানি
ধরে
তোমার
মায়ের বুকে।”
“নহে
তার পরে?”
“তার
বড়ো ভালবাসা পারি না বাসিতে।”
“আমি
পারি।” বলে শিশু হাসিতে হাসিতে!
পল্লী জননী
জসীম উদ্দীন
রাত থম থম স্তব্ধ
নিঝুম, ঘোর-ঘোর-আন্ধার,
নিশ্বাস ফেলি, তাও শোনা যায়, নাই কোথা সাড়া কার।
রুগ্ন ছেলের শিয়রে বসিয়া একেলা জাগিছে মাতা,
করুণ চাহনি ঘুম ঘুম যেন ঢুলিছে চোখের পাতা।
শিয়রের কাছে নিবু নিবু দীপ ঘুরিয়া ঘুরিয়া জ্বলে,
তারি সাথে সাথে বিরহী মায়ের একেলা পরাণ দোলে।
ভন্ ভন্ ভন্ জমাট
বেঁধেছে বুনো মশকের গান,
এঁদো ডোবা হতে বহিছে কঠোর পচান পাতার ঘ্রাণ?
ছোট কুঁড়ে ঘর, বেড়ার ফাঁকেতে আসিছে শীতের বায়ু,
শিয়রে বসিয়া মনে মনে মাতা গণিছে ছেলের আয়ু।
ছেলে কয়, “মারে, কত
রাত আছে? কখন সকাল হবে,
ভাল যে লাগে না, এমনি করিয়া কেবা শুয়ে থাকে কবে?”
মা কয় “বাছারে ! চুপটি করিয়া ঘুমা ত একটি বার,”
ছেলে রেগে কয় “ঘুম যে আসে না কি করিব আমি তার ?”
পান্ডুর গালে চুমো খায় মাতা, সারা গায়ে দেয় হাত,
পারে যদি বুকে যত স্নেহ আছে ঢেলে দেয় তারি সাথ।
নামাজের ঘরে মোমবাতি মানে, দরগায় মানে দান,
ছেলেরে তাহার ভাল করে দাও, কাঁদে জননীর প্রাণ।
ভাল করে দাও আল্লা রছুল। ভাল কোরে দাও পীর।
কহিতে কহিতে মুখখানি ভাসে বহিয় নয়ন নীর।
বাঁশবনে বসি ডাকে
কানা কুয়ো, রাতের আঁধার ঠেলি,
বাদুড় পাখার বাতাসেতে পড়ে সুপারীর বন হেলি।
চলে বুনোপথে জোনাকী মেয়েরা কুয়াশা কাফন ধরি,
দুর ছাই। কিবা শঙ্কায় মার পরাণ উঠিছে ভরি।
যে কথা ভাবিতে পরাণ শিহরে তাই ভাসে হিয়া কোণে,
বালাই, বালাই, ভালো হবে যাদু মনে মনে জালবোনে।
ছেলে কয়, “মাগো! পায়ে পড়ি বলো ভাল যদি হই কাল,
করিমের সাথে খেলিবারে গেলে দিবে না ত তুমি গাল?
আচ্ছা মা বলো, এমন হয় না রহিম চাচার ঝাড়া
এখনি আমারে এত রোগ হোতে করিতে পারি ত খাড়া?”
মা কেবল বসি রুগ্ন ছেলের মুখ পানে আঁখি মেলে,
ভাসাভাসা তার যত কথা যেন সারা প্রাণ দিয়ে গেলে।
“শোন মা! আমার লাটাই
কিন্তু রাখিও যতন করে,
রাখিও ঢ্যাঁপের মোয়া বেঁধে তুমি সাত-নরি শিকা পরে।
খেজুরে-গুড়ের নয়া পাটালিতে হুড়ুমের কোলা ভরে,
ফুলঝুরি সিকা সাজাইয়া রেখো আমার সমুখ পরে।”
ছেলে চুপ করে, মাও ধীরে ধীরে মাথায় বুলায় হাত,
বাহিরেতে নাচে জোনাকী আলোয় থম থম কাল রাত।
রুগ্ন ছেলের শিয়রে
বসিয়া কত কথা পড়ে মনে,
কোন দিন সে যে মায়েরে না বলে গিয়াছিল দুর বনে।
সাঁঝ হোয়ে গেল আসেনাকো আই-ঢাই মার প্রাণ,
হঠাৎ শুনিল আসিতেছে ছেলেহর্ষে করিয়া গান।
এক কোঁচ ভরা বেথুল তাহার ঝামুর ঝুমুর বাজে,
ওরে মুখপোড়া কোথা গিয়াছিলি এমনি এ কালি-সাঁঝে?
কত কথা আজ মনে পড়ে
মার, গরীবের ঘর তার,
ছোট খাট কত বায়না ছেলের পারে নাই মিটাবার।
আড়ঙের দিনে পুতুল কিনিতে পয়সা জোটেনি তাই,
বলেছে আমরা মুসলমানের আড়ঙ দেখিতে নাই।
করিম যে গেল? রহিম চলিল? এমনি প্রশ্ন-মালা;
উত্তর দিতে দুখিনী মায়ের দ্বিগুণ বাড়িত জ্বালা।
আজও রোগে তার পথ্য জোটেনি, ওষুধ হয়নি আনা,
ঝড়ে কাঁপে যেন নীড়ের পাখিটি জড়ায়ে মায়ের ডানা।
ঘরের চালেতে ভুতুম
ডাকিছে, অকল্যাণ এ সুর,
মরণের দুত এল বুঝি হায়। হাঁকে মায়, দুর-দুর।
পচা ডোবা হতে বিরহিনী ডা’ক ডাকিতেছে ঝুরি ঝুরি,
কৃষাণ ছেলেরা কালকে তাহার বাচ্চা করেছে চুরি।
ফেরে ভন্ ভন্ মশা দলে দলে বুড়ো পাতা ঝরে বনে,
ফোঁটায় ফোঁটায় পাতা-চোঁয়াজল গড়াইছে তার সনে।
রুগ্ন ছেলের শিয়রে বসিয়া একেলা জাগিছে মাতা।
সম্মুখে তার ঘোর কুজঝটি মহা-কাল-রাত পাতা।
পার্শ্বে জ্বলিয়া মাটির প্রদীপ বাতাসে জমায় খেল,
আঁধারের সাথে যুঝিয়া তাহার ফুরায়ে এসেছে তেল।
মায়ের বাড়ির পথে
সিকান্দার
আবু জাফর
মায়ের বাড়ি যখন ইচ্ছে এসো
অষ্ট প্রহর সব দরজা খোলা।
পথ চিনতে কষ্ট কেন হবে।
হাড়ের গুঁড়ো, মাথার ঘিলু
কলজে ছেঁড়া ছেঁড়া
সাজিয়ে পথের নিশান করা আছে,
দেখামাত্র, অমনি যাবে চেনা।
আরো অনেক চিহ্ন আছে পাতা
ভোরের আলো ফুলের গন্ধ
নানান পাখির বুলি
মরে মরে ছড়িয়ে আছে বলে
পথ চলতে পায়ে লাগবে
নানা রঙের ধূলি।
দুষ্টু ছেলের ডাকাত-খেলার
খুশি
মিষ্টি মেয়ের চোখ-ধারালো হাসি
শুকিয়ে গিয়ে ঝুলছে দেখো
পথের কাঁটা গাছে।
দুপুর-ঢাকা বট অশথের ছায়া
কিংবা ঘাসের সবুজ শীতলপাটি
দেখবে পুড়ে কয়লা হয়ে আছে।
চলতে পথে বারে বারেই শিউরে
উঠবে দেহ
মনে হবে পায়ে পায়ে জড়িয়ে যাচ্ছ বুঝি
কারও আশা ভালোবাসার নিথর শবদেহ।
মায়ের বাড়ির পথে যদি
ঘনায় আঁধার নিশা
কানপাতলেই ছেলে-মরা
মায়ের কান্না শুনে
মিলবে পথের দিশা।
মা,
আমি রোরো
সুবোধ সরকার
আমার মা একদিন কাশি
থামিয়ে বলেছিল
‘খোকা, আমার পাশে একটু বসবি?’
সেদিন আমি বলেছিলাম, ‘মা
ছটা দশে আমার ফ্লাইট। এক্ষুণি বেরুবো’।
আজ আমি একা। কুড়ি
তলার ডাইনিঙ টেবিলে
কেউ আমাকে খেতে ডাকে না।
কেউ বলে না, একটু ভাত দিই?
ডাইনিং টেবিলে বিড়াল বসে থাকে। থাক।
একটা স্তব্ধ ডিনার সেট। তিনটে দিগন্তহীন চেয়ার।
পায়ে জ্যোৎস্না লেগে আছে। ছাড়াতে পারি না।
‘খোকা, আমার পাশে
একটু বসবি?’
‘মা’ বলে একটা চিৎকার করে উঠি কুড়িতলা থেকে
কথাটা কি আজ আমি রোরোকে বললাম?
কি হবে বলে? কোনদিন ওর কাছে যাবে না।
তাছাড়া কথাটা আমারও
নয়।
একটা গোটা সল্টলেক, একটা বিধান নগর
চিৎকার করে বলছে:
‘খোকা, আমার পাশে একটু বসবি?’
কিছু
মনে নেই
আল মাহমুদ
কাল আমি আমার মা’র
সাথে অনেকক্ষণ কথা বলেছি।
অদ্ভুত বৃদ্ধা। একদা আমাকে জন্ম দিয়েছিলেন। সম্ভবত
এখন বিশ্বাস হতে চায় না। যখন মিটমিট করে
আমাকে দেখলেন। আমার গরম লাগছিল।
আমি বললাম, চলো মা আমরা একটু চা খাই,
বুড়ি হেসে তসবীহ টিপতে লাগলেন,
তোর যেখানে জন্ম হয়েছিলো, মনে আছে?
নিম গাছের নীচে ছনের চালায়। সে রাতে
আমাদের একফোঁটা চা-ও ছিলো না।
আমি কাপটা নামিয়ে রাখতে রাখতে বললাম,
না মা, কিছু মনে নেই।
পেঁচার ডাকে আমার
ভয়, এদিকে তোর কান্না
ঘরে নেই পুরুষ। তোর বাপ গেছে চরের ধান
পাহারা দিতে। কে-যেন আজান হাঁকলো
হাজী শরিয়তের মত গলা। ধাই মেয়ে
তোকে দোলাতে দোলাতে বললো,—
বল লেংটা তুই কোন মসজিদে যাবি?—
মনে আছে?
না মা, আমাদের কাপ
জুড়িয়ে
পানি হয়ে গেল যে!
আমার মা
ভাস্কর চৌধুরী
আমার মা শেষের কবিতার নায়িকা নন আমার মা
হয়তো উপন্যাসের দলিত নাম হৈমন্তী অথবা সর্বজয়া,
আমার মায়ের নাম দুঃখ। কাঁসার থালায় সাদা
কিছু
ঝরা ফুল আমার মা বিধবা নন, নিতান্ত ঢেউহীন
জল
পাশের বাড়ির রাঙাবউ ডাকে, খোলের ভেতর লেপ
টা ঢুকিয়ে যা, দু মুঠো চাল সিদ্ধ আজ খা আমার
মা
রবীন্দ্র সংগীত নন, হয়তো লালন হয়তো কখনো
শুনেছেন, অতুলপ্রসাদ রাধারানীর কেত্তন। পড়েছেন
সমুদ্রের স্বাদ। আমার মা শ্লোক বলতেন। পাখি
পালতেন লাউ এর গাছে জল ঢালতেন, সন্ন্যাসিনী
এলে আমার মা তার পাশে বসে বলতেন,
মন জুড়ানো এক খানা গান আছে? গা।
স্মৃতি : স্কেচ
কৃষ্ণা বসু
কিশোরী কালের কথা
মনে পড়ে,
কার্তিক মাসের হিম সন্ধ্যা।
মায়ের ক্ষিপ্র হাতে রুটি ফুলে উঠছে
উনুনের লালে।
রান্নাঘরের সেই কোণ বড় অপরূপ ছিল,
স্নেহ ছিল, প্রশ্রয় ছিল আর ছিল
অফুরান মৃদু তাপ, জীবনের।
পরিণত যৌবনা নারীটি শিল্পীর মতন
তার সংসার সামলান;
আর আমি বাচাল কিশোরী
তার কাছে বসে পড়া করি, গল্প করি,
মা কিছু সখীত্ব দেন তাঁর কিশোরী কন্যাকে।
বাইরে
দুধ-জ্যোৎস্নায় শশাফুল ফোটে
তার ওপর নেমে আসে পুরোনো বাড়ির পেঁচা,
হিম পড়ে, খুব হিম পড়ে।
ভিতরে উনুনে দুধ ঘন
হয়।
মা
গেরিলা আজাদ (নীল ডাহুক)
‘মা’
একটি কম্পাস
তাকে
ঘিরেই বৃত্ত, বৃত্তের জ্যা
বৃত্তের
ভারকেন্দ্রে বলতে তিনিই
দৈর্ঘ-প্রস্থ্য
হীন এক অভিকর্ষ শক্তি।
সব
নিউক্লিয়ার শক্তি তাকে ঘিরেই আবর্ত করেই ঘুড়ছে।
বিজ্ঞানি
নিউটন জানে না এই মহাকর্ষ শক্তি কতটা প্রবল।
কতটা
কাছে টানে।
মায়ার সাগর
খান মেহেদী মিজান
মাগো তুমি মায়ার সাগর
তোমার সমান নাই,
তোমার ভালোবাসা পেলে
দুঃখ ভুলে যাই।
এদেশ ঘুরি ওদেশ ঘুরি
পাই যে কত জন,
তোমার মত কারও মায়ায়
জুড়ায় নাতো মন।
সন্তানেরে না খাইয়ে
তুমি নাহি খাও,
সন্তানেরা অসুস্থ হলে
তুমি পানাহ চাও!
সন্তানেরা কষ্ট দিলেও
তুমি দোয়া করো
আল্লাহ আমার সন্তানেরে
করো অনেক বড়।
মা, মামা, মায়া
খান নজরুল ইসলাম
কিছু শব্দের প্রতি আমার বেশ দুর্বলতা আছে -
মা, মামা, মায়া।
মা একজনই হয়
মামা কয়েকজন
মায়া অফুরন্ত!
এই দুর্বল শব্দগুলোতে আমার ভীষণ অতৃপ্তি
মায়ের প্রেম,ভালোবাসা, সোহাগে অপূর্ণতা
মাম’য় অভিযোগ, অনুযোগ, অনুরাগ, অভিমান
মায়া, জীবনে আমার অদৃশ্য!
মা সংযোজনে কিছু শব্দে আমার অনুপ্রাণন!
মানবিক
মানবতা
মাধুর্য
মাধুকরী
মাধুরি
মার্জিত
মানুষ
মায়া
আমি প্রতিটি শব্দ
পালন করি
লালন করি
ধারণ করি
আসলে আমি মাকে’ই ধারণ করি।
যে বুলিতে মা আছে সে বুলিতে
মা’কে খুঁজি!
মা দিবস
সুলতান মাহমুদ
কয়েকটি বিবর্ণ ফুলের পাশে
একঘেঁয়ে গোধূলীর লগ্ন পেড়িয়ে
নিষ্ঠুর নিয়তির প্রতি ডালে ডালে
হঠাত্ দু একটি ফুল ফুটার অপেক্ষাতে...
কাকচাতকিনীর মত বসে আছে মা
জীবনের স্বর্ণালী ক্ষণ শেষে আজ সে একা!
এইতো কিছু ক্ষণ পার হলেই
বেজে উঠবে কলিং বেল
আলো ঝলমল করে
নাতি নাতনী ছেলে মেয়ে আসবে চলে!
পেষ্টি কালারের কয়েকটি আইসক্রিম
চেরী ফলের স্বাদে বড়সড় কেইক
সাথে থাকবে কোল্ড ড্রিংস
হাতে এক গুচ্ছ রজনী গন্ধার স্টিকি!
মা তোমায় ভালোবাসি বেশ
তুমি সুখি হও, ভালো থেকো অশেষ।
কিছুটা সময় বয়ে যাবে আলো আঁধারিতে
নাতি নাতনীদের মিছে দুষ্টমিতে!
তারপর পুরো এক বছরের বিদায়ী বার্তা
মায়ের নিয়তীতে আবার নামবে খরা।
হয়ত বেঁচে থাকলে আবার হবে দেখা
নয়ত মরে শুটকি হয়ে থাকবে একা!
সরকারী গাড়িতে অবশেষে
মায়ের পচা লাশ ঠাই পাবে কফিনে!
ওগো পাশ্চাত্য সভ্যতার যান্ত্রিক সভ্যরা
কিংবা পাশ্চাত্যের চশমায় রাঙিন মানুষেরা
তোমাদের কাছে মা দিবস বিশেষ একটা দিন
কিন্তু আমাদের কাছে মা দিবস,
সারা বছর, তিনশত পয়ষট্টি দিন!
দূরে যাচ্ছি
আসাদুল্লাহ কাওসার
বড় হচ্ছি, আর দূরে যাচ্ছি,
দূরে
তোমার আঁচল ছেড়ে অনেক
দূরে
এখন আর ভয়ে তোমার আচঁলে মুখ
লুকানো হয় না।
এখন আর ছোট্টবেলার শাসনটুকু
পাই না।
বৃষ্টিতে ভিজলে কেউ আর লাঠি
নিয়ে তেড়ে আসে না।
দুধ মাখা ভাত নিয়ে কেউ আর
আমার পেছন ছোটে না।
মাগো, আমি বড় হচ্ছি আর দূরে
যাচ্ছি, দূরে
তোমার আঁচল ছেড়ে বহু দূরে...
কেউ আর আমায় আঙুল ধরে হাটতে
শেখায় না
কেউ আর ঘুমের ঘরে আমার মাথায়
হাত বুলায় না
আমি এখন অসহায় ভীষণ
অসহায়।
মা, এখন আর কেউ ঘুম থেকে
তুলে মক্তবে পাঠায় না
এখন আর কেউ ঘুমানোর সময়
কবিতা শোনায় না।
এখন আর দুঃস্বপনে তোমাকে
জড়িয়ে ধরা হয় না।
মাগো, বড় হচ্ছি, দূরে যাচ্ছি
আর ভীষণ অসহায় হচ্ছি।
স্রষ্টার পরে মা
এমআর মিজান
মা, সৃষ্টিকর্তাকে জিজ্ঞেস
করেছিলাম আজ, কাল, অনেকদিন আগেও
সৃষ্টিকর্তা তুমি ছাড়া আমি
কার বান্দা হতে পারতাম?
তোমার পরে আর কে সৃষ্টিকর্তা
হতে পারে?
সৃষ্টিকর্তা আমাকে বারবার
একটিই জবাব দিয়েছেন,
সে তোমার মা, সে তোমার মা।
আমি ব্যাখ্যা জানতে
চেয়েছিলাম খুব বায়না করে,
আজ, কাল, অনেকদিন আগেও,
সৃষ্টিকর্তা বারবার একটিই
প্রশ্ন করেছেন,
কার কাছে তোমার শান্তি মিলে
খুব?
কার কাছে কাঁদলে অন্তরে,
দেহে প্রশান্তি নেমে আসে?
আমি ভেবে ভেবে দেখলাম সেতো
সৃষ্টিকর্তার পরে শুধু মা।
শুনে সৃষ্টিকর্তা হেসে
বলেছেন আমি আছি
তুই মায়ের কাছেই শুধু ফিরে
যা...
মা নামের পৃথিবী
ইসরাত মিম
মা মানে, ভোরের বেলা পাখির মিষ্টি গান,
মা মানে, শান্ত ছোঁয়ায় জুড়িয়ে যাওয়া প্রাণ।
মা মানে, হাজার কষ্ট হাসিমুখে সয়ে,
সন্তানের সুখের জন্য জীবন দেওয়া লয়ে।
মা মানে, আঁধার রাতে জ্বলে থাকা আলো,
মা মানে, সব হারিয়েও বলবে, “আছি ভালো।”
মা মানে, না বলা যত দুঃখ বুকের মাঝে,
তবুও হাসি ফুটিয়ে রাখে সন্তানেরই কাজে।
মা মানে, রোদে পুড়ে ছায়া হয়ে থাকা,
ঝড় এলে দুই হাত দিয়ে আগলে রাখা।
মা মানে, ভাঙা মনে সাহস জাগানো,
হারিয়ে গেলে সঠিক পথে আবার ফেরানো।
মা মানে, ছোটবেলার মিষ্টি সেই ডাক,
মা মানে, পৃথিবীজোড়া ভালোবাসার পাক।
মা মানে, অসুখ হলে কপালে রাখা হাত,
একটু ছোঁয়াতেই দূরে সরে যায় সব আঘাত।
মা মানে, নিজের সুখটুকু নিঃশব্দে হারানো,
সন্তানের হাসির জন্য জীবনটা সাজানো।
মা মানে, জান্নাত যেন এই পৃথিবীর বুকে,
তার দোয়াতে সুখ নেমে আসে দুঃখভরা মুখে।
মা তুমি বেঁচে থেকো হাজার বছর ধরে,
তোমার দোয়ায় জীবন আমার রঙিন স্বপ্ন ভরে।
পৃথিবীতে তোমার মতো আপন কেউ নাই,
মা তুমি আছো বলেই ভালো আছি তাই।
মা
ইয়াসিন আযীয
অনেক কারণেই মনে হয় বড়ো হয়ে
গেছি
চাকরি করে নিজের পায়ে
দাঁড়িয়েছি!
সংসারি হয়েছি: স্ত্রী,
ছেলেমেয়ে নিয়ে।
এখনো ঘুমের ঘোরে ‘মা’ বলে ডেকে
উঠি
এটা যতটা মায়ের প্রতি
ভালোবাসা
তারচেয়ে বেশি নির্ভরতার এ
ডাক।
স্কুল পাস করে যখন কলেজে...
তখনো মায়ের চোখে ছোটোই রয়ে
গেলাম।
মুঠোফোন তখনো আসেনি হাতে
হাতে
কখনো ফিরতে দেরি হলে কলেজ
থেকে
না খেয়ে মা দাঁড়িয়ে থাকতেন
পথের ধারে।
পাশের বাড়ির ভাবিকে বলতেন,
‘শুনছ?
পোলা আমার এখনো ফেরেনি
বাড়ি!’
রাস্তায় পেলে খেলতে থাকা
ছেলেমেয়ের দল
উৎকণ্ঠা আর উদ্বেগ মেশানো
স্বরে বলতেন
‘দেখেছিস তোরা আমার ছেলেকে,
বল?’
টিনএজ শেষ করে যখন যৌবনে-তখন
চলতি পথে মায়ের সাথে ঢাকার
ব্যস্ত রাস্তায়...
মা পেছন থেকে ধরে রাখতেন
শার্টের কলার।
ভাবতেন ভিড়ের মাঝে হারিয়ে
যায় যদি ছেলে!
আমি বিরক্ত হয়ে ছাড়িয়ে নিতে
চাইতাম।
আর এখন বুঝি পৃথিবীর সব
মায়েরা এরকমই
মায়ের কাছে সন্তান কখনোই বড়
হয় না।
