শ্যামসুন্দর
দেবনাথ: একজন ম্যাজিক রিয়েলিজমের কবি
ইয়াসিন আযীয
মহাবিশ্বের যতটুকু মানুষের দৃষ্টিগোচর হয়েছে তার বেশিরভাগই
শূন্য কিংবা ফাঁকা। কিন্তু আধুনিক বিজ্ঞান বলে মহাবিশ্ব ফাঁকা বা শূন্য নয়—পুরোটাই ডার্ক
ম্যাটার ও ডার্ক এনার্জি দ্বারা পরিপূর্ণ। ডার্ক ম্যাটার ও ডার্ক এনার্জির সাথে
কবিতাও যুক্ত হয়েছে! আর এই কবিতা মহাবিশ্বে উড়িয়েছেন কবি শ্যামসুন্দর দেবনাথ। আমরা
জানি যেখানেই জুলুম, অত্যাচার, অনিয়ম এবং বিশৃঙ্খলা সেখানেই কথা বলে কবির কলম। কথা
বলে তাদের বিরুদ্ধে: যারা রক্ত চোষে, যারা খিদে না পেলেও খায়; যারা শুষে নেয় মাটির
মধুরস, মানুষের হাড়মাংস ও রক্ত। ধনীর হাতির উদর পৃথিবীটা হজম শেষে রক্তের গন্ধ
খোঁজে শুঁড় উঁচু করে। পৃথিবী ছেড়ে শুক্র-মঙ্গল-বুধ শোষণের স্বপ্ন দেখে। তাই কবিও
কম যান না। সুতোছেঁড়া ঘুড়ির পিঠে কবিতা ওড়ান, হাওয়ার তালে ছেঁড়া মেঘে ছন্দ ছড়ান।
হিমালয়ের মাথা ছুঁয়ে, ইথার তরঙ্গে ভেসে ভেসে, মহাশূন্যে পদধূলি ফেলে—মাটির প্রেম,
ফুলের হাসি, শূন্যতার ব্যথা; হৃদয়ের জামধরা দরজায় চেপে না রেখে, হৃদয়ের গোপন
আকুতি, মনের কথা ঘুড়ির পিঠে চড়িয়ে মহাকাশের মহাশূন্যে উড়িয়ে দেন কবিতা!
মহাশূন্যে কবিতা উড়িয়ে দিয়ে এভাবেই
উদাত্ত আহ্বান জানান: মুক্তচিন্তকের ঐক্য গড়ে রুখে দাঁড়াও/সাম্রাজ্যবাদের উদ্যত
দীর্ঘশুঁড়। অসংখ্য এমনি আহ্বানে ভরপুর উনচল্লিশটি কবিতার সমন্বয়ে তাঁর ‘মহাশূন্যে কবিতা ওড়াই’ কাব্যগ্রন্থটি বের
হয়েছিল পঙ্খিরাজ প্রকাশনি থেকে ২০১৯ সালের একুশের বই মেলায়। যার বেশিরভাগ কবিতায়
কবি বিষয়ে, উপস্থাপনায় এবং শব্দ চয়নে ম্যাজিক দেখিয়েছেন। যে ম্যাজিকের অন্তরালে
লুকিয়ে আছে জীবনঘনিষ্ঠ এক একটি রিয়েলিজম। তাইতো কবি তাঁর প্রথম কবিতাটির নাম
দিয়েছেন ‘ম্যাজিক রিয়েলিজম’। বোদ্ধা পাঠকই পারবে সে রিয়েলিজমকে আবিষ্কার করতে।
তাঁর অনেক কবিতা একবার পড়ে নিছক কয়েকটা লাইন মনে হতে পারে। কিন্তু সেই কয়েকটি
লাইনের অন্তরালের গভীরতা থেকে মণিমুক্তা খুঁজে পেতে একাধিকবার পড়তে হবে। যত পড়া
যাবে তত এর গভীরতায় হারিয়ে গিয়েই খুঁজে পাওয়া যাবে এর প্রকৃত ম্যাজিক রিয়েলিজম।
মহাশূন্যে কবিতা ওড়াতে গিয়ে কবি তাঁর প্রথম কবিতাতে শ্রাবণ ধারার মেঘের ডানায় চড়ে,
জ্যোৎস্নার রশ্মি বেয়ে, পাহাড় টপকে চাঁদে ওঠেন স্বর্গ ধরার আশায়। কিন্তু সর্বত্রই
ছল-চাতুরি-মুখোশ। পরি-ভূমি-পদ লোভে দেবতাদেরও কাড়াকাড়ি সেখানে। তাই কবি বলেন,
অবশেষে হৃদয়ের ডাক শুনি/শাওন ধারায়ই ডুবে থাকি। ‘দৈববাণী’ কবিতায় এক চিত্তে, একমনে
দেবতার নাম জপে যাওয়া, গুণকীর্তন করা; ব্যাকুল না হয়ে, একমনে ধৈর্য সহকারে,
বিশ্বাস ভক্তি নিয়ে নাম জপে যাওয়ার কথা বলেছেন, না-পাওয়া অবধি। এরকমই কিছু শব্দ ও
লাইন রয়েছে; যেখানে দেবতা তাঁর অনুসারীদেরকে ‘দেব তা’ বলে বলে আশ্বস্ত করেন।
কিন্তু ‘জানোই তো আমি পেলে তো দেব’ এই লাইনটি আমাকে ভিন্ন কিছু ভাবায়। রাজনৈতিক
নেতাদের আমরা দেবতার আসনে বসাই। তাদের আমরা ভোট দিয়ে নির্বাচিত করি। তারা আমাদের
রাস্তাঘাটসহ দেশ ও জনগণের সার্বিক উন্নয়নে অবদান রাখবেন বলে। কিন্তু বেশিরভাগ সময়
দেখা যায় তারা নিজেরা নিজেদের আখের গোছাতেই ব্যস্ত থাকে। জনগণ, সমাজ ও দেশ তাদের
কাছে তুচ্ছ হয়ে যায়। ‘ভোটের আক্ষেপ’ নামের আরেক কবিতায় এ বিষয়ে ছন্দে ছন্দে চমৎকার
বর্ণনা রয়েছে।
কবি-সাহিত্যিকরা সময়ের আয়না। সমাজের
অসংগতি, ঘুণে ধরা, জং ধরা ক্ষতগুলো দেখিয়ে দেন। যাতে সমাজ ও দেশ ভালো পথে পরিচালিত
হয়। দেশ হয় সুন্দর এবং নৈরাজ্য মুক্ত। অপশক্তি রুখো, দেশপ্রেমের চেতনায় এক হওয়ার
আহ্বান জানিয়েছেন ‘ওদের রুখো’ কবিতায়। একাত্তর থেকে অদ্যাবধি দেশের শত্রু যারা
তাদেরকে কবি জঙ্গলের শিকারি, রাতের ঝড়ো দানব, ধূর্ত বোমাবাজ, জাগ্রত ভ্যাম্পায়ার,
ইয়াহিয়া টিক্কার প্রেতাত্মা, ওৎপাতা শকুন, জোঁক, মশা এবং ছারপোকার সাথে তুলনা
করেছেন। গ্রন্থটির প্রায় সকল কবিতা ২০১১ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে রচিত। কিন্তু ‘ওদের
রুখো’ কবিতাটি ১৯৯৯ সালে যশোরে উদীচীর অনুষ্ঠানে বোমা হামলার পর রচিত। তবুও এ
কবিতায় একাত্তর থেকে অদ্যাবধি স্বাধীনতার শত্রু, দেশ, জাতি ও সমাজ বিরোধী তথা
এদেশের শত্রুদের স্বরূপ ফুটে উঠেছে।
কবিরা শব্দ নিয়ে খেলা করেন। অপ্রচলিত
শব্দ কিংবা হারিয়ে যেতে বসা শব্দে প্রাণদানকারী হচ্ছেন কবি। প্রান্তিক মানুষের
ব্যবহৃত শব্দ যা শহরের মানুষ ব্যবহার করে না: ক্যাঁচকেঁচানি, ওস, শুলানি, গিটঠু,
পুলকি, ঠাটা, ছেমা ইত্যাদি শব্দ তাঁর বিভিন্ন কবিতায় আমরা পাই—যা প্রান্তিক
মানুষরাই বেশি ব্যবহার করে থাকেন। পাশাপাশি প্রচলিত কিছু ইংরেজি শব্দ: শেয়ার,
মোবাইল টু মোবাইল, টিম ইত্যাদি বাংলার সাথে মিশিয়ে দিয়েছেন অবলীলায়। পুরো
গ্রন্থজুড়ে এমনিভাবে ব্যতিক্রম শব্দ শৈলীতে কবিতার শরীর বুনেছেন কবি।
এ গ্রন্থের কিছু কবিতায় স্থানীয় ভাষার
সফল প্রয়োগ দেখতে পাওয়া যায়। ‘পাইছিল কোন পাপে’ কবিতাটিতে স্থানীয় ভাষা প্রয়োগের
মাধ্যমে ভালো মানুষ সেজে সম্পর্ক গড়ে শেষে জমিজমাসহ সর্বস্ব হাতিয়ে নেওয়ার যে
প্রবনতা বা পায়তারা আমাদের সমাজে রয়েছে তার চিত্র পরিলক্ষিত হয়। ‘সূর্যরথ’ কবিতায়ও
এদের বর্ণনা রয়েছে: ঝোঁক বুঝে কানে দেয় লোভেপড়া মায়ামন্ত্র/পরের ভিটে গেলার ফন্দি,
মুখে গণতন্ত্র।
‘একদিন ফিরবে বেহুলার স্বামী’ তেমনি
একটি কবিতা যেখানে দেশভাগের ফলে মানুষের চিরনির্বাসনের হাহাকার ফুটে উঠেছে।
মাতৃভূমির মায়াচৌম্বক আমৃত্যু ছায়ামূর্তি/স্মরণে শয়নে-স্বপনে হৃদয়ে কাঁটা
বিঁধায়/তাজা একটি জীবন নিয়ে চির নির্বাসন/এ কোন ঋতি।/বিবেকের রীতিতে তীরক্ষেপ। শাসন-শোষণের যাঁতায় পিষে মাতৃছায়া/
ভাগাভাগির বিরহ আমৃত্যু জ্বালায় তুষানলে।
স্থানীয় ভাষার প্রয়োগে লিখিত খুব
গুরুত্বপূর্ণ আর একটি কবিতা ‘বাপের বিডা’। বাপের বিডা বলতে কবি স্বাধীন বাংলাদেশের
কথা বলেছেন। যেখানে তিনি বংশপরম্পরায় বসবাস করে আসছেন। ‘লোয়া কাডের বানাইলাম
গর/চাইড্যা খুঁডির পর/দুইডা খুঁডি সরাইয়া ফ্যালে/ঘাতক মিরজাফর।’ এভাবেই শুরু হয়েছে
কবিতাটি। কিন্তু এটা নিছক আঞ্চলিক ভাষার গতানুগতিক কোন কবিতা নয়। এখানে বাংলাদেশ
সৃষ্টির পর চারটি মূলনীতির উপর প্রতিষ্ঠিত সংবিধানে পরবর্তীতে যে সংশোধনী আনা হয়
সে কথাই বলা হয়েছে। তাই কবি বলেন সাম্যদৃষ্টি নষ্ট হয়ে গরডা হইল নরবইর্যা, এক
দিকে কাইত। এ কথা দ্বারা কবি আমাদের সাংবিধানিক সাম্যদৃষ্টি বিনষ্টের প্রতি
দৃষ্টিপাত করে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির মাঝে সুখের অন্বেষণ করেছেন। কিন্তু সে
কাঙ্খিত সুখ আসেনি—অধরাই রয়ে গেছে। দুঃখ কাটেনি, অভাব নিত্য সঙ্গী হয়ে আগের মতোই
সংসার চালানোর কষ্ট রয়েই গেছে। নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত শ্রেণি—‘নিত্তি সদায়
কিনতে গ্যালে/বাজারে দেহি আগুন/জুজুর ভয় রইয়া গেছে/ক্যাডা অয় কবে খুন।’ এতকিছুর
পরেও একাত্তরের সংবিধানে ফিরে যাবে দেশ এ আশায় বুক বাঁধেন কবি: ‘সোনার বাংলা সোনার
দ্যাশ/কবে দেইখ্যা যামু/চাইড্যা খুঁডির গরে থাকলে/মইর্যাও সুখ পামু।’
অকালে কবির প্রিয়তমা স্ত্রী বিয়োগ
ঘটেছে। স্ত্রীকে হারানোর ব্যথা তার অনেক কবিতাতেই ফুটে উঠেছে। অর্ধাঙ্গিনীহারা
হৃদয় মরুভূমি সাহারা/চিতায় পোড়ে প্রেম ছাইয়ে বিরহের ধারা। কিংবা দূরবীণ অণুবীণ
আত্মবীণে-/স্বজন সংকুল গৃহকুল-কুলহারা আমি/এত মায়া, এত স্নেহ-সোহাগ, এত প্রেম/তবু
তৃতীয় নয়নের সম্পর্কের মরীচিকা-/কেউ আপন নয়, আমার এই ‘আমি’টাও/যৌবনেই এক বোষ্টমী
গান গেয়ে যায়/ এ জগতে কেউ কারো নই গো মোরা, কেউ.../কারোর কেউ নই গো আমি, কেউ
আমার... ইত্যাদি। শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় তার ‘মানবজমিন’ উপন্যাসে এক জায়গায়
বলেছেন—সৃষ্টিকর্তা
মানুষ সৃষ্টির মাধ্যমে খুঁজেছেন। তাই কবির ভাষাতেই বলতে হয় আমরা আসলে কেউ কারো নই;
সব মানুষই নিজের মাঝে একলা একা। ‘আমার মাঝে আমি’ কবিতাতেও একই সুর নিহিত। কিছুদিন
পূর্বে করোনায় আক্রান্ত রোগীই হাড়ে হাড়ে বুঝতে পারছেন এ কথাটির মর্মার্থ।
‘অদৃষ্টের জালে হুল ফোটায়’ কবিতায়
বর্তমান সময়ের প্রভাবশালী বিভিন্ন দল ও গোষ্ঠীর ভূমিদস্যুতার চিত্র ফুটে উঠেছে।
বালুমানুষ জল রক্ত গিলে খায় নাকে-মুখে-কানে-চোখে নব ছিদ্রে। তবুও ভেজে না ওদের
বুক, পোড়ে না ওদের কাঙ্খিত সুখ। এঁটেল মানুষের জীবনজুড়ে দুর্ভোগ। অসহায় ইহকাল
জিম্মি, কাঙ্গালমানুষের যন্ত্রণার ছটফটানি ঘাতকের খায়েশ আরও বাড়ায়! পতিত জমি,
পুকুর, খাল এমনকি নদীও গিলে খায়, তাদের কবি বালুমানুষ এবং যারা বালুমানুষের
আগ্রাসনের শিকার তাদেরকে কবি ‘এঁটেল মানুষ’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।
আমরা জানি কবি কবিতায় তাঁর সময়ের
সমাজের নানা অনিয়ম, অপকৌশল ও সহিংসতার বিরুদ্ধে লেখনীর মাধ্যমে প্রতিবাদ করে
থাকেন। কাজী নজরুল ইসলাম ব্রিটিশ বেনিয়াদের বিরুদ্ধে কলম ধরে জেল খেটেছেন। ‘অঙ্কুরে
কাঁদে প্রেম’ এ গ্রন্থের ব্যতিক্রম একটি কবিতা যা কবি একেবারে নিজস্ব স্টাইলে। এই
কবিতাটি পড়তে গিয়ে আমার ‘সর্ষের ভিতর ভূত’ কথাটি মনে হয়েছে। রূপক ধর্মী এই কবিতার
মাধ্যমে কবি দেখিয়েছেন আমাদের বর্তমান সমাজ এতটাই ঘুণে ধরা যে—আপনি কোথায়
হাত দিবেন? কেঁচোর গর্তে হাত দিবেন, দেখবেন সেখানে সাপ ঢুকে আছে। অন্যায়ের
প্রতিবাদ করবেন, দেখবেন আপনার পাশে কেউ নেই! সর্বত্র রক্ষকই ভক্ষক; কার বিরুদ্ধে আপনি কলম ধরবেন? দেখবেন আপনি প্রভাবশালী, দুর্নীতিবাজের
রোশানলে পুড়ে মরছেন। তাই কবি বলেন, ‘ডাকাতির গল্প লিখতে না লিখতেই বড়োবাবুর চোখ
রাঙানি আর ধমক/অথচ এক প্রেমিক ফুল ছেঁড়ার দায়ে চৌদ্দশিকে।’
‘ভালোবাসার দুধে বিড়ালের মুখ’ কবিতাটি
আমার কাছে সুকান্তের ছাচে গড়া মনে হয়েছে। যেখানে কবি গল্পের ছলে রূপকের মাধ্যমে—প্রিয়া,
প্রণয়, সুপ্রিয়া ও বিড়াল চারটি চরিত্র গড়েছেন। যেখানে বিডাল ভিলেনের ভমিকায়।
প্রিয়া প্রণয়কে ভালোবেসে এক গ্লাস দুধ খেতে দেয়। সুপ্রিয়া এসে জানায় দুধে মুখ
দিয়েছিল বিড়াল। প্রেমাপ্লুত প্রণয়ের ততক্ষণে দুধ
পান শেষ। প্রিয়ার বিড়ালের প্রতি ক্ষোভ, বোনের উপর
বিরক্তি, প্রণয়পানে লজ্জাবোধ আর শঙ্কিত মন, উৎকণ্ঠার ফোয়ারা—যদি প্রণয়নের
কিছু হয়ে যায়। অপরদিকে প্রণয় বিড়ালচুমুর গিলে ফেলা দুধটুকু আলজিভ অবধি এনেও বমি করে
ফেলতে পারছে না প্রিয়ার রক্তিম বদন নীলাভ, কম্পিত অধরোষ্ট্র দেখে। পাশাপাশি প্রিয়ার কষ্ট ও অপরাধবোধ জাগাতে চায় না বলে। কিন্তু হিসাব-খাতায়
কষিত প্রেমের চূড়ান্ত ফলাফল শুধু প্রণয়ের হৃদয়পাতায় উত্তরমালায় গেঁথে রইলো না.
পাঠকও আন্দাজ করে নিলেন যে যার মতো—প্রিয়া ও প্রণয়নের প্রেমের চূড়ান্ত ফলাফল। প্রেমের কবিতাতেও
সফল কবি: তোমার আমার প্রেমের গভীরতা মালে না কেউ/শুধু মশারি দ্যাখে মহাসাগরের তলা
কোথায়/আমাদের প্রেমের ওজন তুলাদণ্ডে হয়নি কখনো/শুধু বিছানাই বোঝে লাইনের ‘পরে ক’বগির
ট্রেন। এমন অসংখ্য প্রণয় পঙক্তি আমরা দেখতে পাই।
‘সাপের সাথে বসবাস’ কবিতার প্রথম
লাইনটি এরকম: পুরনো ভিটে নতুন ঘর, বীরত্ব—সাপ রেখে বসবাস। পুরনো ভিটে বলতে আমরা স্বাধীনতা উত্তর
বাংলাদেশ এবং নতুন ঘর বলতে স্বাধীনতার শত্রুদের নিয়ে বসবাসের কথাই বলা হয়েছে।
স্বাধীনতার পর স্বাধীনতাবিরোধীদের সাধারণ ক্ষমা করে দেওয়া হয়। পরবর্তীতে তারাই
দেশের বড় বড় পদে আসীন। তাই কবি দুঃখ ভারাক্রান্ত সুরে বলেন: ঘরের ভাই ঘাতক অগ্নিদ
ভয়াল/অঙ্কুরে অবিনাশ খেসারত আজ চরম। কিংবা ক্রমরুদ্ধ দুয়ার—জো টি নেই
পালাবার/যন্ত্রণার মৃত্যু, নেই কিছু বলার।
কবির বেশিরভাগ কবিতার শুধু শিরোনাম
পড়েই পুরো কবিতা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায় না। ‘নিপীড়ন রুখো’ কবিতাটির শিরোনাম
পড়েও কবিতা সম্পর্কে ঠিক তেমনি পুরোপুরি ধারণা পাওয়া যায় না। ‘গরিবের ঘর পোড়ে ধনীর
আগুনে’ লাইন দিয়ে কবিতাটি শুরু। পুরো কবিতায় কবি গরীব দুঃখি মেহনতী মানুষকে ধনী
শ্রেণি, সম্রাজ্যবাদীদের হাত থেকে রক্ষার মন্ত্র দিয়েছেন। ঢিল মেরে শকুন
তাড়াও/একযোগে রুখে দাঁড়াও/ধনীরেদ জোঁক মুখে লবণ ছিটাও/সাম্রাজ্যবাদের পতন
ঘটাও/নিপীড়ন রোখো, শোষণ ঠেকাও/মেহনতী মানুষের ঐক্য জাগাও। একই আহ্বান জানিয়েছেন
তিনি মহাশূন্য শোষণ কবিতার শেষ দু’লাইনে: মুক্তচিন্তকের ঐক্য গড়ে রুখে
দাঁড়াও/সাম্রাজ্যবাদের উদ্ধত দীর্ঘশুঁড়।
কবি-সাহিত্যিকরা সময়কে ধারণ করেন। কবি
শ্যামসুন্দর দেবনাথ তাঁর সময়কেই ধারণ করেছেন ‘মহাশূন্যে কবিতা ওড়াই’ গ্রন্থে। ‘বোধেরা
জাগুক শিকড়ে’ কবিতায় বর্তমান সময়ের স্বরূপ ফুটে উঠেছে প্রতিটি চরণে চরণে! কোনটা
কাক কোনটা ময়ূর চেনা ভারি দায়/কোমড়ের কাইতন যদি সাপ হয়ে কামড়ায়/লোহাজাত মরিচা
লোহাকেই খায়/উড়ে এসে শূন্যলতা গাছেরে চুমায়। কবি-সাহিত্যিকরা যে শুধু সময়কে ধারণ
করে তা নয়। সংকট থেকে উত্তরণের পথও বাতলে দেন তাঁদের লেখনীর মাধ্যমে। কবিতার শেষ
দুই লাইনে সঠিক ট্রাকে ফিরে আসার তেমনই এক আহ্বান দেখতে পাই: ‘আম গেল ছালা গেল রস
খায় পরে/এখনো সময় আছে— বোধেরা জাগুক শিকড়ে।’
হনুমানের খোলস পরে একটি মানুষ
চিরিয়াখানায় একগাছ থেকে আরেক গাছে লাফাতেই বাঘের খাঁচায় গিয়ে পড়ে। প্রাণ ভয়ে
চিৎকার করতে থাকে লোকটি, ‘... বাঁচাও, আমি মানুষ, আমাকে বাঁচাও। দর্শকের ধিক্কার—বেশ হয়েছে,
খাক এখন, মানুষ হনুমান হয়েছ! কিন্তু পরক্ষণেই চিত্র পাল্টে যায়।’ বাঘ কানের কাছে
ফিসফিস করে বলে: ‘এই চুপ কর হতভাগা, আমিও মানুষ তোকে খাব না।’ এটা আসলে নিছক একটা
প্রতারণার গল্প নয়। আমাদের সমাজের চিত্র। ‘খোলস মোলাহেজা’ নামক কবিতায় এ চিত্রটি
ধারণ করেছেন কবি। শিশুদের প্রলোভন দেখিয়ে ঘুম পাড়ানো, খাওয়ানোসহ বিভিন্ন বিষয়ে
সতর্ক করেছেন কবি। ‘লোভের প্রলেপ’ কবিতায় কবি লোভের প্রলেপে প্রতারণা দিয়ে
সন্তানকে ধোকাবাজ হিসেবে গড়ে না তোলার আহ্বান জানিয়েছেন। তার অধিকাংশ কবিতায়
সমাজের প্রতি পলে পলে নানা অনাচার, অসংগতি, অনিয়ম দুর্বলের প্রতি সমাজের ক্ষমতাধর
ও বিত্তবানদের অন্যায়, অত্যাচার, জুলুম রূপকের আকারে তুলে ধরেছেন।
‘ভূত’ শিশুতোষ কবিতা। ছন্দে ছন্দে
শুধু শিশুদের মন থেকে নয়, বড়োদের মন থেকেও ভূত তাড়ানোর চেষ্টা করেছেন। সমাজের একটি
বিশেষ শ্রেণি আদিকাল থেকেই ভূত নামের জুজুর ভয় দেখিয়ে আসছে জনমনে। তাই কবি
লিখেছেন: ‘ভূত’ থাকে তো ভীতুর মনে/মনের একটা রোগ/সুযোগ বুঝে ভণ্ড বাড়ায়/সমাজে
দুর্ভোগ। এমনিভাবে ‘মামা’ কবিতায় সূর্য মামা, চাঁদ মামা, সিংহ মামা, কংস মামা,
ছেমা মামা, নাই মামা এবং কানা মামাসহ সমাজের বিভিন্ন প্রকার মামার ভিন্নতার শ্রেণি
ও কর্ম অত্যন্ত সুচারু রূপে শ্রেণিবিন্যাস করে দেখিয়েছেন।
‘জীবন্ত যন্ত্রণায় পাথরজীবন’ কবিতাটি
কবির ব্যক্তিজীবনের হলেও, এতে দুষ্ট ও শিষ্ট মানুষের আচরণগত বৈশিষ্ট্য ফুটে উঠেছে।
প্রতিটি চরণে তারই বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে। অগ্নিতে আমি বাঁচি, নিঃস্ব হয়েও বাঁচি/অসুখের
মধ্যে ধুঁকে বাঁচি হৃদরোগে। একাধিকবার আগুন লেগে কবি সর্বোচ্চ হারান। তিনি একজন
লোক গবেষক। তাঁর সংগ্রহিত বিভিন্ন তথ্যসহ সতেরটিরও অধিক পাণ্ডুলিপি আগুনে ভস্মীভূত
হয়। এছাড়াও অকালে হারান প্রিয়তমা স্ত্রীকে। ব্যক্তি জীবনে প্রত্যন্ত অঞ্চল জুড়ে
রয়েছে তাঁর পদচারণা। তাই দুষ্ট, সাধু, ঠকবাজ, প্রতারকসহ বিভিন্ন ধরনের মানুষের
সাথে তাঁর পরিচয়; উঠাবসা বিভিন্ন পেশার মানুষের সাথে। তাঁর বাসায় আগমন ঘটে
প্রতিদিন স্থানীয় কবি লেখকদের। শুধু স্থানীয় কবি সাহিত্যিক নন, দেশের প্রথম সারির
কবি সাহিত্যিকদেরও আনাগোনা রয়েছে তাঁর বাসায়। এসব কথা এ কবিতাতেই দেখতে পাওয়া যায়।
আমি বাঁচি হাজারো কষ্টের মাঝে/অকাল বিপত্নীকাতর দুঃখের সাগরে ভেসেও ভস্মস্তুপে হৃদয়ের জালার ফাঁকে ফাঁকে/আমি বেঁচে উঠি
মানুষের ভালোবাসায় ভরে। দুষ্টের বদমাসির মাঝেও আমি বাঁচি চেতনায়/উৎখাত ষড়যন্ত্রের
বাস্তহারার মর্মবেদনার মাঝে/জমিলোভীর উৎপাত, অনাচার-পদাঘাত করে/আমি বাঁচি ঠকবাজের
প্রতারণা গলাটিপে—। আমি বাঁচি চোখের জলে ভেলায় চড়ে/ভালো মানুষ অথচ কথা রাখে না—এ কষ্ট বয়ে।
বিষয় নির্বাচনে নতুনত্ব ও বৈচিত্র্যের
মাধ্যমে রূপক ও জাদুবাস্তবতার অন্তরালে সমাজের নানা অসঙ্গতি প্রকাশ তাঁর কবিতার
প্রধান বৈশিষ্ট্য। যা নতুন লিখিয়েদের জন্য অনুকরণীয় একটি দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। কারণ
তাঁর কবিতায় আছে সূর্যরথ ওড়ানো আঁধার ভাঙার শপথ। আছে নতুন ভোরের সূর্য প্রত্যাশা।
এই গ্রন্থটি সব ধরনের পাঠকের কাছে ভালো লাগবে আমার প্রত্যাশা। এখানে যেমনি রয়েছে
ছন্দবদ্ধ শব্দের গাঁথুনি তেমনি আছে কবিতার উত্তরাধুনিক মুক্ত চলার গদ্যের কাব্যিক
ভুবন। ‘তাঁর ভাবনার জগৎ আপন সমাজ, কখনো তা সমাজ ছুঁয়ে আন্তর্জাতিক আকাশ স্পর্শ
করতে চেয়েছে। বিশেষ করে সমাজের অধিকার বঞ্চিত ও ব্রাত্যজনের দুঃখ-সুখই তাঁর কাব্যিক
হৃদয় ভূমিতে তোলপাড় তুলেছে’—মহাশূন্যে কবিতা ওড়াই পাণ্ডুলিপি পড়ে এমনটাই মন্তব্য করেছেন
বিশিষ্ট শিশুসাহিত্যিক ও কবি ফারুক নওয়াজ।
বর্তমান সময়ে প্রকাশিত দৈনিক পত্রিকার
সাহিত্য পাতা এবং সাহিত্যের ছোটকাগজগুলিতে প্রকাশিত কবিতার চাইতে নিভৃতচারী কবি
শ্যামসুন্দর দেবনাথের কবিতা শিল্প-শুদ্ধতায় কোন অংশে কম নয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে
তাঁদের অনেককেই ছাড়িয়ে অনেক উঁচুতে বা মহাশূন্যে উঠে গেছে তাঁর কবিতা—আমার
বিশ্বাস।
‘মহাশূন্যে কবিতা ওড়াই’
লেখক: শ্যামসুন্দর
দেবনাথ
প্রকাশন: পঙ্খিরাজ
প্রচ্ছদ: সুদর্শন বাছার
প্রকাশ কাল: ২০১৯ একুশে বইমেলা
