কীর্তিনাশার
কাব্য :: শীত সংখ্যা ১৪৩২
শীতে
চায়ের কাপে
খান মেহেদী মিজান
শীতের আকাশ হতে তুমি
শিশির হয়ে ঝরো যদি,
আমি ঘাসের ডগা হবো
কিংবা পদ্মপাতার নদী।
রাখতে ধরে রোদের কণা
কিংবা শিশির বিন্দু
খুলে দিবো মনের দুয়ার
ভিতর বুকের সিন্ধু।
তুমি শীতের বাতাস হলে
আমি চাদর হবো,
আষ্টে-পিষ্ঠে ওম দিয়ে
গায় জড়িয়ে তোমায় রবো।
তুমি শীতের কাঁপন হলে
আমি হবো রোদ,
রোদের পরশ ছড়িয়ে গায়ে
করবো দেনা শোধ।
হিমেল শীতের শিশির যখন
ঝরছে গো টুপটাপ
ভালোই হতো তোমার হাতের
পেলে চায়ের কাপ।
জান্নাত
পালানো যুবক
সুলতান মাহমুদ
খসরু নাকি জান্নাত থেকে
পালিয়ে এসেছে। জান্নাতের এত নেয়ামতরাজি, আদর আপ্যায়ন দেখে সে নাকি ক্লান্ত।
উঠতে বসতে শুধু সুখ আর সুখ। সুখে সুখে তার নাকি অসুখ হয়ে গেছে। তাই সে সিদ্ধান্ত নিয়েছে
সে আর জান্নাতে থাকবে না। তাই সময় সুযোগ বুঝে সে জান্নাত থেকে পালিয়ে এসেছে। কথা হচ্ছে
জান্নাততো মৃত্যুর পরের বিষয়। মৃত্যুর আগেই খসরু জান্নাতে গেল আবার সেখান থেকে পালিয়েও
আসল এটা কেমন কথা।
-তো তুই যে পালালি সে না
হয় মানলাম কিন্তু তোর জান্নাতে যাওয়ার কাহিনিটা কি?
-জানি তোরা এটা জানতে চাইবি।
তোদের ঈমানে ভেজাল। মুখের কথায় বিশ্বাস নাই। প্রমাণ চাস তাইতো? আসলে আমি কয়েকদিন আগে
মারা গিয়েছিলাম।
-মারা গেলি কিভাবে?
-সে এক ইতিহাস বটে।
-কেমন ইতিহাস শুনি।
-বিষয়টা হলো সেদিন আমি যখন
স্কুলের হোস্টেল থেকে পালিয়ে বাড়ি আসছিলাম।
-হোস্টেল থেকে পালালি মানে?
-আর বলিস না ওখানে মানুষ
থাকে? খালি পড়া আর পড়া। হোস্টেলের নিয়ম খুব কড়া। মোবাইল চালানো যাবে না, সন্ধ্যার পর
বাইরে থাকা যাবে না, সিনেমা হলে যাওয়া যাবে না, বন্ধুদের সাথে আড্ডা দেওয়া যাবে না,
বেশি রাত জাগা যাবে না, সকালে ঘুমানো যাবে না, সিগারেট খাওয়া যাবে না। খালি না আর না।
এত না এর মধ্যে মানুষ থাকতে পারে? তুই বল। এছাড়া, হোস্টেলের খাবারদাবার সে আরেক প্যারা।
কোন বৈচিত্র্য নেই। পাতলা ডাল, আলু ভর্তা, রুই মাছের ঝোল কিংবা দু’টুকরো মুরগীর মাংস;
কতদিন ভালো লাগে বল।
-কিন্তু পড়াশোনা করতে হলেতো
একটু কষ্ট করতেই হবে।
-খাতা পুড়ি এ পড়াশোনার।
আমি কি বাড়িতে পড়াশোনা করতাম না।
-তুমি যদি বাড়িতেই পড়তা
তাহলে তোমার বাবা তোমাকে খোঁয়াড়ে রেখে আসত না। তোমাকে নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়েইতো এ বিশেষ
ব্যবস্থা।
-তুই বেশি কথা বলিস। যাহোক
মূল ঘটনায় আসি। হোস্টেল থেকে পালিয়ে আমি একটা চোরাগোপ্তা পথে বাড়ি আসছিলাম। একটা ক্ষেতের
আল ধরে হাঁটছিলাম। এরি মাঝে ঘটে গেল কাণ্ডটা।
-কি কাণ্ড?
-একটা গরু কোথা থেকে যেন
আমার সামনে এসে দাঁড়াল।
-তারপর তারপর।
-আরে শোন না। তার ইয়া বড়
শিং। সে আমাকে বলল রাস্তা থেকে সরে দাঁড়া আমি এখান দিয়ে যাব। বিষয়টা আমার প্রেস্টিজে
লাগল। আমি হলাম গিয়ে সৃষ্টির সেরা জীব আইমিন আশরাফুল মাখলুকাত। আমাকে দেখে কোথায় সে
সরে দাঁড়াবে তা না উল্টো আমাকেই সরে দাঁড়াতে বলছে। মানব জাতীর একজন প্রতিনিধি হিসেবে
এ অপমান আমি মেনে নিতে পারি না। আমি বললাম দেখ আমি বেয়াদবি পছন্দ করি না তুই উল্টা
রাস্তা ধর। কিন্তু গরুটি আমার কথা শোনল না। যা বুঝলাম সে ভালো বংশের গরু না। তার শিক্ষা
দীক্ষার যথেষ্ট অভাব। মানব জাতীর মর্যাদা সম্পর্কে তার কোন ধারণা নেই। সে উল্টো আমাকে
ঝারি দিল। তবেরে.. আমার শিং দেখেও তোর মনে কোনো ভয় ডর নেই। আজ তোর একদিন কি আমার একদিন।
বলে আমাকে দিল এক গুঁতা। গুঁতা খেয়ে যা হওয়ার তাই হল। আমি অক্কা পেলাম। গরুর কাছে মানব
জাতীর সম্মান বিসর্জন না দিয়ে ধরাধাম ত্যাগ করলাম।
-ধরাধাম ত্যাগ করলি?
-হুম।
-তারপর ইহধামে আবার কিভাবে
ফিরে এলি?
-সেটাইতো বলছি। তারপর-
চোখ খুলে নিজেকে আবিষ্কার করলাম জান্নাতের দরজায়।
-তারপর কী হলো?
-তারপর জান্নাতে কিছুদিন
কাটিয়ে চলে আসলাম। এত সুখ আর সহ্য হলো না। সুখে সুখে অসুখ হবার যোগাড়!
-তুমি জান্নাতে ছিলে নাকি
পুলিশ কাস্টডিতে ছিলে সেটা বল? পড়াশোনার নাম নাই, আড্ডা ফাঁকিবাজি, বিড়ি সিগারেট ধরেছ
এই বয়সেই শেষ পর্যন্ত হোস্টেল সুপার তুমাকে লাথি মেরে বাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছে। হোটেল থেকে
মাঝরাতে বের হয়ে চোর সন্দেহে পুলিশ তুমায় ধরে নিয়ে গেছে। সেখানে হালকা পাতলা উত্তম মাধ্যম খেয়ে আজ এসে আমাদের কাছে জান্নাত থেকে পালানোর গল্প ফেঁদেছো।
-মানে মানে তোদের এসব পচা
কথা কে বলেছে? কোন দুষ্ট এসব ছড়িয়েছে আমার নামে?
-তুমি কি মনে করেছ এমনি
এমনি তুমি ছাড়া পেয়েছো, তুমাকে জামিন দিয়ে আনা হয়েছে।
-মানে তোরাই তাহলে আমাকে
ছাড়িয়ে এনেছিস?
-হুম। এবার বাড়ি চলো--চাচা
লাঠি নিয়ে বসে আছে তোমাকে আসল জান্নাতের স্বাদ দিতে!
কুয়াশা
মোড়ানো গ্রাম
ইব্রাহিম খলিল
আযানের ডাক শুনে ছুটে যায় সব
পাখিরাও ধীরে ধীরে করে কলরব,
ফোটা ফোটা শিশিরে ভেজা মাঠ ঘাট
কুয়াশায় ঢেকে আছে এ গ্রামের হাট।
গুন গুন করে চাচি তিলাওয়াত করে
ওজু করে মেয়ে শিশু সিপারা ধরে,
ঘুম ছেড়ে ছোটরাও মসজিদে যায়
ফজরের জামাতে নামাজে দাড়ায়।
গাঢ় ঘন কুয়াশায় ঢেকে আছে খাল
ভোর বেলা সেইখানে কেউ ফেলে জাল,
কুয়াশা ভেদ করে মাঠে যায় গরু
আলসেমি ছেড়ে করে চাষ বাস শুরু।
গায়ে গতরে মেখে কাঁদা মাটি জল
নিড়ানিতে মন দেয় কৃষকের দল,
সূর্যের আলোটাও ধীরে ধীরে ফোটে
বই কাধে ছোট শিশু স্কুলে ছোটে।
শীতের সকাল তবু কাজ নেই থেমে
খেজুরের রস পেড়ে গাছি যায় ঘেঁমে,
রস দিয়ে গুড় করে কৃষকের বউ
গৃহস্তঘর জুড়ে ঘ্রাণে মৌ মৌ।
তিলে তিলে বেড়ে উঠি মোরা এই গাঁয়
ঘাঁস মাটি নোনা জল ফসলের ছায়
এইখানে হাটা চলা এইখানে ঘোরা,
শীত জুড়ে গ্রাম থাকে কুয়াশায় মোড়া।
পিঠা
কখন হবে
আসাদুল্লাহ কাওসার
পিঠা পুলির ধুম
চোখে নাই ঘুম,
চুলার পাশে বসে আছি
গায়ে লাগে উম।
মাকে বলি মাগো
পিঠা কখন খাবো,
ঢাকনাটা মা সরিয়ে দাও
সুগন্ধিটা নেবো।
আর কতোক্ষণ লাগবে মাগো
দেরি সয়না আর,
ঢাকনাটা না হয় সরিয়ে,
দেখো আরেকবার।
মা বললেন খোকা
তুইতো খুব বোকা,
পিঠা নিশ্চয়ই খাবি তুই
দেবোনাতো ধোকা।
এই যে এবার হলো
ঢাকনাটা মা তোলো,
আমি আর মানছিনা মা
যতোই তুমি বলো।
আচ্ছা বাবা দিচ্ছি
তোর জন্যই তো নিচ্ছি
পিঠাটা কেমন ফুলেছে দেখ
হয়েছে কি সিদ্ধ।
আহ্ কী মা গরম
হয়েছে খুব নরম,
তোমার পিঠার তুলনা করলে
দোকানিরা পায় শরম।
এতো মজা পিঠা
হয়েছে খুব মিঠা,
পুরোটা মা খেয়ে নেব
ফেলবো না এক ছিটা।
হয়েছে খুব হয়েছে
আর লাগবে না বলা,
তারাতাড়ি খেয়েনে বাবা
আর করিস না কলা।
গরম গরম খেলাম
মজা খুব পেলাম,
মায়ের সঙ্গে গল্প করে
আমি ঘুমিয়ে গেলাম।
শীতের
সকাল
ইসরাত মিম
ভোরের আকাশে কুয়াশা নামে
নরম সাদা চাদরের মতো,
ঘুম জড়ানো পৃথিবী তখন
নিজেকে লুকায় নিঃশব্দে।
সূর্যটা আসে দেরি করে,
লাজুক শিশুর হাসির মতো,
মেঘের ফাঁক গলে আলো পড়ে
শীতল পথের বুকে নরম হয়ে।
হাতের মুঠোয় চায়ের কাপ,
ধোঁয়ার ভেতর গল্প জাগে,
শীতের সকালে অল্প উষ্ণতা
মনকে ছুঁয়ে ধীরে লাগে।
পাতাহীন গাছ দাঁড়িয়ে থাকে
নিস্তব্ধ কোনো ভাবনায়,
পাখির ডাক ভেসে আসে
কুয়াশা ভেজা জানালায়।
এই সকালে শব্দ কম,
অনুভূতি কথা বলে বেশি,
শীতের সকাল মানেই যেন
নিজের সাথে নিজের দেখাদেখি।
সময় থেমে থাকতে চায়,
একটু ধীরে হাঁটে জীবন,
শীতের সকালে বুঝে যাই
নীরবতাও হতে পারে আপন।
শীত
ইয়াসিন আযীয
সাইবেরিয়া থেকে হিমালয় চূড়া ছূঁয়ে
উত্তরের হাওয়ায় চড়ে
শীত আসে।
শীত আসে হেঁটে হেঁটে,
উড়ে উড়ে...
শীত আসে হাওয়ায় ভেসে
ভেসে
শীত এসে লোমকূপের গভীরে
লুকিয়ে নৃত্য করে
চামড়া ছেদ করে, পাঁজরের
ফাঁক গলে
ঢুকে পড়ে আরও গভীরে।
শীত বাড়ে, জামা-গেঞ্জি
পরি
শীত বাড়ে, পরি সোয়েটার-জ্যাকেট
শীত বাড়ে, পরি জুতা-মোজা-মাফলার
শীত বাড়ে, গিজারে পানি
গরম হয়
শীত বাড়ে, রুম হিটার
চলে...
শীত এলে বস্তির ছোট্ট
খুপরিতে
পলিথিনের ফুটো সেলাই
হয়
তাল আর নারকেল পাতায়-
শীত বাড়ে, একটা জামা
গায়
শীত বাড়ে, সেই জামাটাই
গায়
শীত বাড়ে, দ্বিতীয়টা
যে নেই
শীত বাড়ে, মোজা-জুতা
কই
শীত বাড়ে, স্পঞ্জের
সেন্ডেল পায়
ওদের শীত কাটে একটা
জামায়।
ওদের রুম হিটার কুড়িয়ে
আনা
কয়েক টুকরো কাঠের আগুন।
সকালে পাশের কুয়ার ধোঁয়াওঠা
হিমশীতল পানিতে মুখ
ধোয় ওরা
সাহেবের বাসার গিজারের
গরম পানিতে
ওরকম ধোঁয়া কই?
