স্বাধীনতা দিবস সংখ্যা ২০২৬
ছবি:: নাদিরা নূরবধ্যভূমির হাড়দুর্বা ছুঁয়ে
শ্যামসুন্দর দেবনাথ
রক্তসিঁড়ি বেয়ে মেঘের উপর সূর্যদর্শন
মুক্ত হাওয়ায় উদার আকাশমনে নিরন্তর
মাটির কথা মাতৃজঠর স্মৃতি সংগ্রাম দৃশ্যে
নারীধর্ষণ, অত্যাচার, লুণ্ঠন, অগ্নিসংযোগ
গণহত্যা একাত্তরে হায়েনাদের তাণ্ডব
পাকদোসরদের মানবতা বিরোধী অপকর্ম
আজও শিহরণ জাগায় শিরায় উপশিরায়
স্নায়ুদিনে আঁধার নেমে আসে বর্বরস্মৃতির
এক বধ্যভূমি পালং থানার মধ্যপাড়ায়।
ঘাতক ধর্ষক দালালদের অসহ্য নিষ্ঠুর কাহিনি
এখনও ঊর্মি আঘাত ক্রোধরক্ত সফেন সমুদ্র উত্তাল
গণবিবেক সোচ্চার, দাবি ঘাতকের চরম বিচার-
নবপ্রজন্মের বিজ্ঞানছোঁয়া হাত প্রতিবাদ প্রতিশোধে।
একাত্তরের সেই ঘাতকেরা আবার ফণা তোলে
স্বাধীন দেশের লালসূর্যের সবুজ পতাকাটা
খাবলে ধরে গিলে ফেলতে উদ্যত-
আজও তারা চক্রাকারে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত!
সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প ছড়ায় অবলীলায়
আকাশে বাতাসে পানিতে পাতালে শিশুবৃদ্ধে।
সারাদেশের বধ্যভূমির হাড়দুর্বা ছুঁয়ে
শহিদী রক্তে আর বীরাঙ্গনার নিঃশ্বাস পথে
প্রদীপ্ত অঙ্গীকার হোক- ঘাতকের বিচার-
অপশক্তি রুখে শোষণমুক্ত সমাজ গড়ার।
মুক্তিযোদ্ধা
খান মেহেদী মিজান
মুক্তিযোদ্ধা,
তুমি মহাকালের অগ্নিপুরুষ
বর্ষীয়ান নেতা, ইতিহাসের জৌলুশ
তুমি অনাদিকাল প্রজ্জ্বলিত নক্ষত্র
নতুন সূর্যের কারুকাজ।
মুক্তিযোদ্ধা,
তুমি নব প্রজন্মের নির্দেশিকা বাইনোকুলার
পাথরে খোদাইকৃত অবিনশ্বর চোখ
তুমি দুঃসাহসিক সংশপ্তক
নতুন পথের অভিযাত্রী, এ জাতির তাজ।
মুক্তিযোদ্ধা,
তোমার শত্রু হননের ঐ ট্রিগারচাপা অঙ্গুলি
ধাবমান জ্যোতিষ্ক
তোমার রাইফেল কষিত পেশিশক্তি
বন্ধনহীন শিকল ভাঙার হাতুড়ি।
মুক্তিযোদ্ধা,
তোমার বজ্রকণ্ঠের জয়ের ধ্বনি
আজও প্রকম্পতি ব্যজন ভরা ব্যঞ্জনে
তোমার স্খলিত রক্ত সবুজাভ ভেদী
লাল সূর্যের আভা, নতুন ভোরের চিহ্ন
নব প্রজন্মের চলার দিশারী।
মুক্তিযোদ্ধা,
তোমার কোনুইয়ের পর্বতারোহী ক্রলিং
মার্কওয়েলম্যান, মাইক-করবেটের মতো
তোমার পঙ্গুত্ব পদ স্বাধীনতার স্তম্ভ
তুমি সূর্য সন্তান।
মুক্তিযোদ্ধা,
তুমি জাতির গৌরব
তোমাকে স্যালুট, বিনম্র শ্রদ্ধা চিরকাল।
তুমি সমুজ্জ্বল শিখা অনির্বাণ।
মুক্তিযুদ্ধের শহীদ স্মরণে
শাহ জালাল মিয়া
তৈয়বুর, জাহিদ, লিয়াকত, হান্নান, আয়ুব, খোরশেদ,
শুকুর, মান্নান, বাকি--তোমরা নয়জন ছিলে
হেমায়েত বাহিনীর নয়টি উজ্জ্বল নক্ষত্র
--নয়জন বীর মুক্তিযোদ্ধা
সুদূর মুকসুদপুর কাশিয়ানি ভাঙ্গা শিবচর থেকে এসেছো তোমরা
তোমাদের সহযোদ্ধা ছিল ইপিআর আর স্থানীয়
মুক্তিযোদ্ধাদের আর একটি দুঃসাহসী দল-
জননেতা আব্দুর রাজ্জাকের জন্মস্থান এই ডামুড্যা
এখানকার নরম মাটিতে কলমি আর ঘাস ফুলেরা
বাতাসের সাথেখেলা করে।
গ্রীষ্মে আবার সে মাটির বুক থেকে উষ্ণ নিশ্বাস বের হয়
জয়ন্তীয়া তীরের এই নৌবন্দর ডামুড্যাকে ক'দিন আগেই
মুক্তাঞ্চল ঘোষণা করেছিলে তোমরা
স্বাধীন বাংলার লাল সবুজ পতাকা উড়িয়েছিলে এখানকার
স্কুল, কলেজ, দোকানপাট, হোটেল-রেস্তোরায়
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের আহ্বানে সাড়া দিয়েই যুদ্ধে নেমেছো
দেশকে মুক্ত করবে বলে
১৫ অক্টোবর ১৯৭১। ভোর না হতেই বিষধর সাপের মত
নিঃশব্দে এগিয়ে এলো ওরা, এগিয়ে এলো ওদের
লঞ্চ আর গানবোটের বিরাট বহর
নদী তীরে এমবুশে ওত পেতেছিলে তোমরা
শত্রু নাগালে আসতেই গর্জে উঠল তোমাদের এস এল আর,
এসএমজি, গ্রেনেড, রাইফেল
তোমাদের নিক্ষিপ্ত রকেটের ঘায়ে শত্রুর লঞ্চ আর
গানবোটের কিয়দংশ উড়ে গেল
নিহত হলো শতাধিক হানাদার আর ওদের দোসর রাজাকার
যুদ্ধ চলল বিকেল অবধি--
কিন্তু দুঃসময়ে বেইমান হারমাদ রাজাকারদের কুটিল
চক্রান্তের শিকার হলে তোমরা মুক্তিযোদ্ধার ছদ্মবেশে প্রতারিত করে পেছন
থেকে আঘাত হানল ওরা।
গুলি চালাল তোমাদের পিঠে, মাথায়, বুকে
মৃত্যুর শীতল কোলে ঢলে পড়লে তোমরা
তোমাদের তাজা রক্তে সিক্ত হলো মাতৃভূমির মাটি
রক্তে লাল হলো জয়ন্তীয়ার জল-
হেরে গেলে তোমরা, হেরে গেলাম আমরা,
হারল মুক্তি পিয়াসি ডামুড্যার বাঙালিরা ব্যাংকারে ব্যাংকারে আরও রক্ত ঝরাল ওরা
হত্যা করল স্থানীয় আহসান, শহীদ শিকদারসহ আরও অনেককে
পুড়ে ছাই করল ঘর বাড়ি, দোকানপাট, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান সবকিছু
নিঃস্ব হলাম আমরা শ্রমিক, কৃষক, মজুররা নিঃস্ব হল এখানকার ব্যবসায়ী
তোমাদের এই আত্মদান আজও ভুলিনি আমরা
মুক্ত স্বাধীন দেশে প্রতিদিন ভোর আসে- পূর্বাকাশ রাঙা হয়
পাখিরা গান গায়, শিশুরা কাঁদে হাসে কিশোরী স্বপ্ন দেখে
জয়ন্তীয়ায় জোয়ার হয়- মুক্ত বাতাস বয়ে যায়
তবু অক্টোবর এলে তোমাদের ত্যাগের কথা মনে পড়ে
তোমাদের শ্রদ্ধা জানাই বীর শহীদরা তোমাদের সালাম জানাই।
সাবাস বাংলাদেশ
সুলতান মাহমুদ
হাজার বছরের বাংলা গড়ে উঠেছে পদ্মার তীরে তীরে
সাম্য-মৈত্রী, শ্রদ্ধা-ভালোবাসা আর শান্তি সুখের নীড়ে।
অপার সৌন্দর্য আর সভ্যতার চরম শিখরে,
স্বর্ণ কমল সোনালি দিন রেখেছে এ দেশ ঘিরে।
ইবনে বতুতা বলল এসে বহু প্রান্তর ঘুরে,
অনেক দেখেছি, কিন্তু কোনো দেশ, দেখিনি এমন করে।
পালায় করে স্বর্ণ মাপে, টাকায় আটমণ চাল
চাঁদের হাসি থাকত ঘরে, সুখে কাটত কাল।
হিন্দু , মুসলিম, বৌদ্ধ, খৃষ্টান ভাই ভাই হয়ে,
ডেকেছে তাদের আপন প্রভুকে, থেকেছে মিলেমিশে
কিন্তু, এরা কারা, দস্যু-হন্তা নামে পলাশীতে ?
চাঁদের বুকে কালিমা এঁকে , চাঁদকে দেয় ঢেকে।
সিরাজের খুনে লালে লাল হল বাংলার প্রান্তর
উঁহু উঁহু করে কাঁদিছে পাপিয়া, কাঁদেনিকো বিষধর!
হেরেছে এদেশ কিন্তু হারেনি শহীদ তিতুমীর
হারেনি মজনু শাহ, শরীয়তউল্লাহ, হারেনি বঙ্গবীর
হারেনি পাগলা কানাই, সূর্য সেন সেদিন
হারেনি ক্ষুদিরাম, উচ্চে তুলেছে শির।
ফাঁসির মঞ্চে গেয়েছে যারা জীবনের জয়গান
তাদেরই লালে জাগল এ দেশ, ডাকল স্বাধীনতার আহ্বান।
রাজনীতির রঙ্গমঞ্চে হল অনেক রক্ত লেখা,
দেশ ভাগের বিনিময়ে পেলাম স্বাধীনতা।
নতুন স্বপ্নের দোলায় দোলে পেলাম পূর্ণতা
চাঁদের হাসি বাঁধ ভেঙে যায়, ঘুচে সকল ব্যাথা।
কিন্তু আবার একি শুনি আমার বর্ণমালা
থাকবেনা আর বইয়ের পাতায়, গল্প-গান আর কবিতায়
মায়ের মুখের মায়ের ভাষা, নেবে ওরা কেড়ে।
বাংলা তখন জাগল আবার সকল আগল ঝেড়ে
নানা তা হবেনা তা হবেনা রাষ্ট্র ভাষা বাংলা চাই
মিছিল চলে নদীর মতো উত্তাল তরঙ্গ ভেঙে
সেই নদী আজ লাল হয়েছে অ আ ক খ এর রক্তে।
চুপ মেরে যায় কুপমন্ডুক, দুয়ারে দেয় তালা
মায়ের ভাষা মায়ের মুখে পায় যে পূর্ণতা।
আমরা জাগি নতুন করে, নতুন গানে, নতুন সুরে
৫৪ এর যুক্ত ফ্রন্ট, ৬৬ এর ছয় দফা, ৬৯ এর গণঅভ্যুত্থান
৭০ এর নির্বাচন আর ৭ ই মার্চের ভাষণ
ভয় পেয়ে যায় ওরা
তবুও সংলাপের পথ ছিল খোলা।
কিন্তু
হঠাৎ করে দুমড়ে দিয়ে ঢোকে এরা কারা?
খুনের নেশায়, রক্ত নেশায় হয়ে মাতোয়ারা।
নেই কি দয়া এদের কারো, নেই কি লজ্জা শরম
জানোয়ারের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ে হয়ে মানুষের জম।
খুন, ধর্ষণ লুটতরাজে কাঁপে বাংলাদেশ
মুসলিম হয়ে এটা ওদের কেমন রকম বেশ?
তাল হারিয়ে মান হারিয়ে ওরা হল যে বেহুশ
কা-পুরুষ, কা-পুরুষ ওরা, কা-পুরুষ।
বাংলা আবার জেগে উঠে নতুন উচ্ছ্বাসে
প্রতিশোধের আগুন ছোটে নিঃশ্বাসে, নিঃশ্বাসে।
বাংলার দামাল ছেলেদের তুমুল আক্রমনে,
দেখো এবার মাথার খুলি কেমন করে উড়ে।
রক্ত লেখায় হয় যে লেখা নতুন কবিতা
সবুজ দেশে জেগে উঠে নতুন পতাকা।
হাজার রক্তের বিনিময়ে পেলাম স্বাধীনতার রেশ
সাবাস, সাবাস, সাবাস বাংলাদেশ।
সবুজ পায়রা
ইয়াসিন আযীয
একটি সবুজ পায়রা
খাঁচা ভেঙে বেরুতেই
পায়ে নতুন করে
শিকলে আবদ্ধ হলো।
মুক্ত আকাশে উড়ে বেড়ানোর
শত বছরের স্বপ্ন
কী করে, কীভাবে যে-
খুন হয়ে গেল অজান্তেই!
এক রাতে নেকড়েদল
ধারালো দাঁত, নখসমেত
নিরীহ সবুজ পায়রার ওপর
ঝাঁপিয়ে পড়ল।
পায়রার সবুজ পালক
রক্তে লাল হয়ে ভিজে গেল
ত্রিশ লক্ষ ছোটোবড়ো পালক
বৃত্ত থেকে খসে
মহাকাশে ফুটে থাকা এক একটি
উজ্জ্বল নক্ষত্র হয়ে গেল!
পঁচিশে মার্চ রাত
ইব্রাহিম খলিল
একাত্তরের পঁচিশে মার্চ রাত
শান্ত কোন বাবার বুকে
ছেলের কঁচি হাত।
গল্প শুনে ক্লান্ত খোকা চুপ
নির্ভরতায় বাবার বুকে-
লুকায় খোকার মুখ।
খোকার চোখে স্বপ্ন ভুরি ভুরি
কালই প্রথম নীল আকাশে-
উড়বে যে তার ঘুড়ি।
হঠাৎ রাতে পাক পশুদের হানা
ফিনকি দিয়ে রক্তে খোকার-
ভিজলো লাটাই খানা।
রক্তের সূর্যোদয়
ইসরাত মিম
যে ভোরে সূর্য উঠেনি, উঠেছিল রক্তের লাল,
২৬শে মার্চ লিখেছিল ইতিহাস সেরা জ্বলন্ত কাল।
নিস্তব্ধ রাত কেঁপে উঠেছিল গুলির শব্দে হঠাৎ,
স্বাধীনতার স্বপ্ন তখন জেগে ওঠে অগ্নিঝড়ের মত।
মাটির বুকে লুটিয়ে পড়ে কত অজা
না নাম,
তাদের রক্তে আঁকা হলো লাল-সবুজের অবিরাম।
কাঁদেনি তারা, থামেনি তারা, ভয় পায়নি মৃত্যু,
দেশের জন্য দিয়েছিল জীবন—এটাই ছিল সত্য।
আজও যখন পতাকা উড়ে নীল আকাশের তলে,
লুকিয়ে থাকে সেই কান্না, সেই গল্প প্রতিটা দোলে।
২৬শে মার্চ মানে শুধু একটি দিনের নাম নয়,
এটা এক সাহসের কাহিনি, এক অমর পরিচয়।
এসো আজ প্রতিজ্ঞা করি, ভুলবো না সেই দিন,
যে দিনে জন্ম নিয়েছিল আমাদের স্বাধীনতা রঙিন।
শহীদের রক্ত যেন না যায় কখনো বৃথা,
বাংলাদেশ বেঁচে থাকুক ভালোবাসায়, চিরকাল অমলিন ব্যথা।
