বৈশাখ সংখ্যা :: ১৪৩৩
বোশেখ আমার
হাসানাত লোকমান
বোশেখ আমার বাংলা বছর প্রথম সবুজ হাসি
মাটির বাসন তালের পাখা পাতার মোহন বাঁশি।
বোশেখ আমার জীর্ণ জীবন কাল-সাগরে লীন
নতুন দিনের সূর্যালোকে শুভ্রশুচি দিন।
বোশেখ আমার বিদায়-বরণ ভাঙা গড়ার খেলা
বটতলাতে নাগরদোলা রঙ ছড়ানো মেলা।
বোশেখ আমার হালের খাতা আশা অংকে ভরা
বিন্নী ধানের খৈয়ের হাসি হৃদয় আকুল করা।
বোশেখ আমার আউলা বেলা ঘুড়ি উড়া মাঠ
খালে বিলে জল জোয়ারে খেয়া ভাসা ঘাট।
বোশেখ আমার বিজন দুপুর ঘুঘু ডাকা বন
কাঁচা আমের গন্ধে আকুল দস্যি ছেলের মন।
বোশেখ আমার মেঘের ভেলা বুক কাঁপানো ঝড়
নতুন ধানে হাসি ভরা চাষীর গোলা ঘর।
বোশেখ আমার শাকে সজীব গিমা তিতা রাত
কাঁচালঙ্কা সকাল বেলা পান্তা ইলিশ ভাত।
বোশেখ আমার বাংলা মায়ের আঁচল-ঝরা ছায়া
নকশিকাঁথা গান কবিতা স্বদেশ মাটির মায়া।
নওরোজ
মির্জা হজরত সাইজী
হে ইরানি বালিকা
তোমাদের নওরোজ কবে?
তোমরা কি নওরোজে পান্তাভাত খাও?
মাটির থালা পোড়া মরিচ ভাজা ইলিশের
ছোটখাটো টুকরো বিশেষ?
যুদ্ধের বিভৎস আওয়াজে এখনো কি
গুলবাগে গায় কোন বুলবুলি, আজ
ভোরের শালিককে নাচতে দেখে ভাবছি
তুমি কি এখন কুতকুত খেলছো তোমাদের
আঙিনার খেজুর বীথির নিচে।
নাকি ‘শুকনো পাতার নূপুর পায়ে.....’
চুল আচরাতে গিয়ে আমার মেয়ের
হাত থেকে মাটিতে পড়ে গেল রাঙা
মাথার চিরুনি
আমার স্ত্রীর হাত থেকে খসে পড়ে
ভেঙে গেল তার সৌখিন চায়ের পেয়ালা
আজ সঘন নাচছে আমার বাম চোখের পাতা;
হে স্বপময় নীল নয়না বালিকা পারিজাত
হে গানের বুলবুলি লিটল এনজেল
আমাদের আঙিনার দোয়েল বলছে
তুমি ভালো নেই
বেগুন গাছের ডালে মন খারাপ করে
বসে আছে বউ কথা কও পাখি
বলছে তোমরা ভালো নেই।
হে নিস্পাপ বালিকা কন্যা আমার
হে অবুজ সবুজ বালিকা
আমি বড়ই বেকারার, শুধু
তোমাদের জ্বরা যুদ্ধ আর মুমূর্ষরে
ধূয়ে মুছে উড়িয়ে দিতে
পাঠিয়ে দিলাম বৈশাখী গান আর
তাপস নি:শ্বাস মাখা বাঙলার এক
আকাশ ভালোবাসা।
আমার হৃদয়ের এই ছোট্ট অর্ঘ্যটুকুন
তুমি গ্রহণ করো
হে বালিকা জননী আমার।
গালে রঙের দাগ
রেখা আক্তার
চৈত্র শেষে বোশেখ এসে বলছে হেসে ইশ!
আমার নামে বাঙালি খাও পান্তাভাত ইলিশ।
আমি যখন হাওয়ায় দুলি বাংলা মায়ের কোলে
এই একটা দিন পান্তার সাথে ইলিশ কথা বলে।
বোশেখ মানে আউল-বাউল লালন-রবি-নজরুল
বোশেখ মানে বটের ছায়ায় বাউল গান তুমুল।
একই সুরে হাছনের গান আরেক সুরে লালন
বৈশাখ মানে কুঁড়ে ঘরে ঝড়হাওয়ার কাঁপন।
বোশেখ মানে এলো কুন্তল নারীর খোঁপায় ফুল
বোশেখ মানে ঢাক বাজে, বাজে খুসির ঢোল।
এই বৈশাখে সবাই মিলে পান্তা-ইলিশ খাক
বোশেখ মানে রঙের আঁচড় গালে রঙের দাগ।
এসো হে বৈশাখ এসো
হে
সুলতান মাহমুদ
চৈত্রের বেলা শেষে বৈশাখী হাওয়া
বাংলার ঘরে ঘরে খুশির গীত গাওয়া
বলাকারা অলখে কোথায় লুকায়
কচি ধানে দোলা লাগে পূবের হাওয়ায়।
জলের নাচনে দেখি নতুনের ছোঁওয়া
ডিঙি নৌকা ভরে আসে খইয়ের মোয়া!
তপ্ত রোদের ঝাঁঝে উতলা রাখাল
বাঁশি ফেলে ডুব দেয় উথাল পাথাল।
রঙিন ঘুড়ি হাসে মিছে অবকাশে
আউলা বাতাস আসে গোধূলীর বাঁকে।
কস্তুরি ফুলের সাথে কলমীর আড়ি
হেলেঞ্চা হেসে যায় খুকুদের বাড়ি!
শান বাঁধা পুকুরে আনমনে বসা
বৈশাখে জুইঁশাখে শত ফুল ফোটা।
ঐ তব চেয়ে দেখ নতুন কেতন
পল্লী বালার ঠোঁটে কিসের কাঁপন
বাংলার প্রান্তরে কে যে আসে বারে বারে
সুরের ভাজে শুনি এসো হে বৈশাখ
এসো হে...।
শুদ্ধ চাওয়া
ইয়াসিন আযীয
বৃষ্টিবিহীন ঝড়ঝাপটাহীন
বৈশাখ চাই না,
চাই না ভোটবিহীন
নির্বাচনহীন—গণতন্ত্র;
চাই না কারচুপি
চাই না পরাজিতের পলায়ন
চাই না পুরুষশূন্য গ্রাম
চাই না নারী, শিশুর আতঙ্ক।
পহেলা বৈশাখ
জান্নাতুল ফেরদৌস মুক্তা
পহেলা বৈশাখ, সকাল বেলা,
ডগডগে রোদ, খুশির মেলা।
সাদা-লাল শাড়ি, পাঞ্জাবি পরে...
শহরজুড়ে গান বাজে ঘরে ঘরে।
পান্তা ভাত আর ইলিশ মাছ,
খাবার টেবিলে উৎসবের আঁচ!
মাটির খেলনা, বাঁশের বাঁশি,
রঙে রঙে ভরে উঠেছে গ্রামীণ হাট-বাসি।
বটমূলে বাজে রবির গান,
সুরে সুরে জাগে প্রাণ।
মঙ্গল শোভাযাত্রা চলে,
রঙিন মুখে হাসি দোলে।
নতুন বছর হোক শুভ-ময়,
বাংলার ঘরে আসুক সুখের সময়।
পহেলা বৈশাখ
ইসরাত মিম
নতুন দিনের নতুন আলো,
রাঙা রোদে ভরে ভালো,
পুরোনো সব দুঃখ মুছে
হাসি ফুটুক মুখে মুখে।
শঙ্খধ্বনি, ঢাকের তালে,
গ্রাম শহর একসাথে চলে,
লাল-সাদা সাজে প্রাণ,
এসেছে আজ বৈশাখের গান।
হালখাতা, মিষ্টি হাসি,
আনন্দে ভাসে ঘরবাড়ি,
নতুন স্বপ্ন বুকের মাঝে
জেগে ওঠে সাজে সাজে।
এসো সবাই করি আহ্বান—
ভালোবাসায় ভরি প্রাণ,
পহেলা বৈশাখ হোক সবার
নতুন সুখের এক দোরগোড়ার।
একগুচ্ছ বৈশাখী ছড়া
ইব্রাহিম খলিল
০১ পান্তা বিলাস
কবে কখনো শুরু হলো
পান্তা ইলিশ খাওয়া,
ভোর বেলাতে সেজেগুজে
বটমুলে যাওয়া?
সেই ইতিহাস কেউ ঘাটি না
লাগিয়ে হাওয়া পালে,
ইচ্ছে করেই যাই জড়িয়ে
ভিন্নমতের জালে।
ভিন্ন দেশের ভিন্ন কথা
ভিন্ন কাপড় সাজ,
নিজের দেশের সংস্কৃতি
শুধুই স্মৃতি আজ।
একটা দিনে বৈরাগী হই
একতারা লই হাতে,
হাজার টাকায় পান্তা বিলাস
গরিব মরে ভাতে।
০২ পান্তা বিলাস
কাক ডাকা সেই
ভোর বিহানে—
উঠিস যেমন রোজ,
পান্তা করিস খোঁজ।
দে পেটে দে
পাথর চাপা—
জাগিস না তুই
ওরে খ্যাপা—
পান্তা যে আজ,
আভিজাত্যের ভোজ।
০৩ বৈশাখ
কোন বিষয়টা মাথায় রেখে
বলবো নববর্ষ?
গরিব লোকের পান্তা নিয়ে
তোমরা মজা করছো।
তোমার মজা তুমি করো
দোষ কিছু নেই তাতে,
দোহাই তোমার হাত দিও না
পান্তা মরিচ ভাতে।
পান্তা ওদের রোজের রুটিন
যেথায় ক্ষুধার বাস,
এমনতরো কষ্ট নিয়ে
করছো উপহাস?
তোমার টাকায় সাজবে তুমি
ঘুরবে বাবার গাড়িতে,
পান্তা খাবে হাজার টাকায়
বাসন্তি রঙ শাড়িতে।
দিনটা জুড়ে রমনা ঘুরে
গভীর রাতে ফিরবে ঘর।
আবার তো সেই ইংরেজি গান
বাংলা হবে ভীষণ পর।
০৪ সূক্ষ নিপূণ চাল
একটা দিনে শখের বসে
পান্তা খাওয়ার ধুম,
মাসটা জুড়েই প্রস্তুতি তার
নেইতো চোখে ঘুম।
বোশেখ এখন অষ্টাদশীর
অভিসারের দখলে,
হালখাতাটা বিলুপ্ত প্রায়
ভুলে গেছি সকলে।
হালখাতা যে কোথায় গেলো
পাইনা খুঁজে তারে,
ইলিশ খাওয়ার ভ্রান্তরীতি
কে চাপালো ঘাড়ে।
ইলিশ খাওয়া নয়তো কোন
সংস্কৃতির হাল,
জাতীয় মাছ ধ্বংস করার
সূক্ষ নিপূণ চাল।
০৫ বৈশাখ এবং ঝরা পাতা
ভিন্ন ধারার বৈশাখ আমরা
করতে পারি পালন,
বদলিয়ে চাল চলন।
পান্তা যাদের রোজের রুটিন
কিংবা উপোস থাকে,
আজকে খাওয়াও তাকে।
নিজের জন্য নতুন জামা
বাড়তি একটা নাও,
দরিদ্রকে দাও।
সত্যিকারের আনন্দ টা
তবেই তুমি পাবে,
গরিব যখন খাবে।
তারচে এসো সবাই মিলে
ঝরাপাতা খুঁজি,
দুঃখ ওদের বুঝি।
০৬বিলাসী পান্তা
হাজার টাকা বরাদ্দ তোর
পান্তা খাওয়ার তরে,
কাজের পোলা উপোস থাকে
চার দেয়ালের ঘরে।
ফুটানি তো ঠিকই করিস
মাইয়া নিয়া সাথে,
উপহাসে মেতে উঠিস
পান্তা মরিচ ভাতে।
তোদের পান্তায় ইলিশ থাকে
ভর্তা নানান পদ,
গরিব তো খায় নুন মরিচে
বদের ব্যাটা বদ।
সত্যি যদি গরিব প্রীতি
একটুও তোর থাকে,
পথের শিশুর মুখটা দেখিস
রঙ তামাসার ফাঁকে।