রাতের আয়নায় :: রথীন্দ্রকান্ত ঘটক চৌধুরী
ভাদ্রমাসের সূর্য আকাশের
মাঝখানে চলে এসেছে। মেঘমুক্ত কড়া রোদে ঝা-ঝা করছে তেতে-ওঠা খালপারের রাস্তাটা।
বাজার ভেঙে দোকানীরা সব সওদা মাথায় বাড়ি ফিরছে। গেরস্তরা পুরো এক-দুপুর খাটুনির পর
স্নানের সময় গরু নাওয়াতে নিয়ে আসছে খালে—কেউবা নৌকা বোঝাই একবেলার
কাটাপাট এনে জাগ দিচ্ছে খালের মোড়ের প্রশস্ত জায়গাটায়। সকাল থেকে ঘাটে নৌকা বেঁধে
ঠায় বেকার বসে থেকে থেকে হতাশায় ভেঙে পড়ে হাশিম। এত বেলায় আজ আর কি কোন কেরায়ার
আশা আছে। কেবল আজকের দিনটা বলেই তো নয়—হামেশাই তো এরকম বেকেরায়া দিন যাচ্ছে
ইদানিং। কখনো-সখনো কালে ভদ্রে একটাকা আট আনার রুজিতে কী করে সংসার চালাবে সে। তার
ওপর জিনিসের দরতো বেড়েই চলেছে দিনের পর দিন। আর পাঁচটার কথা না হয় ছেড়েই দিল, শুধু
যে নুন দিয়ে চারটি ভাত খাবে তারই কি কোন উপায় আছে। চাউলের মণ কুড়ি থেকে লাফিয়ে
লাফিয়ে পঁয়ত্রিশে উঠেছে—কদিন বাদেই তো চল্লিশ
পঞ্চাশ হলো বলে। আউশের খন্দে কয়েক দিনের জন্য নাও বাওয়া ছেড়ে মোল্লা সাহেবের
ক্ষেতে ধান দাওয়া করেছিল। ভাগে পাওয়া একমণ তিনসের ধানের শেষ অবশিষ্ট আধসের চালের
সংগে শাঁক পাতা কচুর মূল সিদ্ধ করে কালকের দিনটা কোনরকমে চালিয়ে দিয়েছে আমিনা। আজ
কাক ভোরে উঠে চুপি চুপি নৌকা খুলে চোরের মতো ঘাটে চলেছে হাশিম আমিনার সংগে দেখা
হবার ভয়ে। সে জানতো সকালে নাস্তা দেবার বদলে সে আজ অসহায় করুণ বোবা দৃষ্টিতে
তাকিয়ে থাকবে হাশিমের দিকে। নিরুপায় ব্যথার সে টনটনানি কিছুতেই সহ্য করতে পারতো না
সে।
হাশিম ভেবে চলে আমিনার কথা।
নিজেতো ছই-এর নিচে সব রকমের ঝঞ্জাট এড়িয়ে বেশ নিশ্চিন্তে বসে আছে। তিন বছরের ছেলে
হামিদ হয়তো এতোক্ষণে খিদের জ্বালায় দাপাদাপি করে মাকে অস্থির করে তুলেছে। রাবেয়া
কিছু না বলে চুপি চুপি ঘরের এক-কোণে বসে বেড়ার দিকে মুখ করে চোখ দিয়ে দরদর করে জল
ছাড়তে শুরু করেছে। আর বড় ছেলে আজগর? সে হয়তো একটা ছেঁড়া কাঁথা জড়িয়ে মরার মতো
দাওয়ার উপর পড়ে আছে। এ দৃশ্যে মায়ের বুক নিয়ে কী-করে সহ্য করছে আমিনা। দুঃখ-কষ্টে
হতচেতন হয়ে নিশ্চয়ই সে মাঠের আলের দিকে হাশিমের আশায় তাকিয়ে উঠোনের এককোণে বসে
আছে। ভাবনার ঘোরে চোখ দুটিতে পলক পড়ছে না তার।
মাথা ঝিম ঝিম করতে থাকে
হাশিমের, শিরশির করতে থাকে সমস্ত শরীরটা। মাথাটা ভাবতে ভাবতে আগুন হয়ে ওঠে। মাটির
শানকে করে জল তুলে কয়েকবার মাথায় ঢেলে দেয় সে, তারপর পুরা দু’শানক জল ঢক্ ঢক্ করে
খেয়ে উৎভ্রান্তের মতো তামাকের ডিবেটা হাতড়াতে থাকে। নাঃ একছিলিম তামাকও আর অবশিষ্ট
নেই—চেছে-পুছে সকাল থেকে বসে বসে সব জ্বালিয়েছে। পাশের নৌকার
মাঝি আমিনউদ্দিন ছই-এর তলায় বসে ঠুকঠাক করে খাপে খাপে পাটাতন সাজাচ্ছিল। হাশিম গলা
বাড়িয়ে ডাকেঃ ‘আমিন ভাই, ও আমিন ভাই কী করতে লাগজ?’
‘করুম আর কি—মাথার বেলা পশ্চিম দিকে হেইল্যা পড়ছে, পেটের ভিতরও চোঁ চোঁ
সুর হইচে—অখন নৌকা ছাইড়্যা বাড়ি যাইমু ভাবছি। তুমি বুঝি এই বেলা আর
যাইবা না?’
‘না,’ চিন্তিতভাবে
অতিসংক্ষিপ্ত উত্তর দেয় হাশিম, তারপরে বলে, ‘এক ছিলুম তামাক খাওয়াইয়া যাও—সকাল থেইকা খাইয়া খাইয়া আমার ডিবাটা একেবারে খালি হইয়া
গেছে।’
ডিবাতে হাত ঢুকিয়ে যতটা তামাক একবার তুলতে পারল হাশিমের হাতে তুলে দিল আমিনউদ্দিন। হাশিম তামাক সাজে, আগুন ধরায়—তারপর দুজনে বসে টানে। আমিনউদ্দিন উঠতে চায় হাশিম তাকে হাত ধরে টেনে বসায়, ‘আরে যাইবাইতো—বস-বস—এত ব্যাস্ত ক্যান?’
আমিনউদ্দিনকে টেনে বসিয়ে উদাসীন দৃষ্টিতে আকাশের দিকে তাকিয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে হাশিম, তারপরে অসংলগ্নভাবে হঠাৎ বলে ওঠে ‘আইজতো আর এ্যাকটা কেরায়াও পাইলাম না—পোলাপান কয়টারে যে চাইরটা খাওয়াইয়া বাঁচাইয়া রাখতে পারুম—এমনই বুঝি না—একটা বুকভাঙা দীর্ঘনিশ্বাসে তার কথার শেষের দিকটায় মিলিয়ে যায়। উত্তর খুজতে কিছুক্ষণ হাতড়ায় আমিনউদ্দিন, তারপর বলে, ‘তা আর কী কইম, ভাই—দিনকাল বড় খারাপ পড়ছে। পঞ্চাশ সনের থেইকাও বড় আকাল আইব বুঝি এইবার।’
নোয়াখালি, কলকাতায়
দাংগা-হাংগামা—দেশ ভাগাভাগি—হিন্দুস্থান পাকিস্তান—ঘরবাড়ি বেচে দলবেধে হিন্দুদের দেশ ছেড়ে চলে যাওয়া—আকাল: কোথা দিয়ে কেন যে কীভাবে কী হলো কিছুই বুঝে উঠতে
পারেনা হাশিম-আমিনউদ্দিন। ‘হিন্দুরা গিয়াই আমাগো খাইয়া গ্যাছে। কেরায়া করোনের লোক
কি এখন আর দ্যাশে আছে। আগে থাকতেই তো সীরাজমিয়া কইছিল: ‘তোমরা কেউ হিন্দুগো
ইষ্টিশনে পার কইর্যা দিয়া আইও না।’ সেই কথা আমরা শোনলাম কই—শোনলে কি আর আউজগা এমন মন্দ কপাল হইত।’ হুকা টানতে টানতে
আপসোসের স্বরে টেনে টেনে বলে আমিনউদ্দিন।
পাট জাগ দেওয়া—গরু নাওয়ানো শেষ করে গেরস্তরা সব স্নানে নেমেছে, আমিনউদ্দিন
নৌকা খুলে দিল বাড়ির উদ্দেশ্যে। দিগন্তহীন ভাবনায় যেন উড়ে চলেছে হাশিমঃ দশ গাঁয়ের মাতব্বর সীরাজ মিয়া, মুসলমানের মরুব্বি—কেতাবের আয়াৎ যেন তার দিলের
মধ্যে গাঁথা: হজ করে এলেন দুবার, সময় মতো নামাজ না করে কেউ তাকে কোন দিন জল
স্পর্শও করতে দেখেনি জীবনে। ফুডকমিটির প্রেসিডেন্ট হয়ে দিনরাত কত পরিশ্রম করছেন
দেশের জন্য—দশের জন্য। আজ এস, ডি, ওর দরবারে—কাল ম্যাজিস্ট্রেটের দরবারে চেষ্টা করতে কি আর তিনি ত্রুটি
করছেন। তিনি বলেন, ‘সকলের লইগা তো আর সব কাজ না। খোদা যখন আমারে বুদ্ধি বিবেচনা
খেমতা দিয়া পাঠাইছেন, তখন নিজের ক্ষেতি স্বীকার কইরাও দশের ভালর চেষ্টা করতেই হইব।
খোদার হুকুম বুইঝ্যা শুইন্যা যারা তামিল করে না, তারা তো কাফেরের থেইকাও দুষমন।’
সময় মতো এমন জ্ঞানীগুণী পরোপকারী মাতকার মুরুব্বির কথা না শুনেই মরতে বসেছে আজ
দেশের গরীবরা। হঠাৎ হাশিম যেন মনের মধ্যে নিজেদের এই চরম দুঃখ-দুর্দশার একটা
যুক্তি খুঁজে পায়। পাঁচ গাঁয়ের মাঝিদের একসংগে ডাকিয়ে কতো বুঝিয়েছেন সীরাজ মিয়া—‘পাকিস্তান হইচে এইবার গরীব সুখের দিন আইছে। বেশী লোভ কইরা
নিজের হাতে তোমরা নিজেগ কপাল খাইওনা, হিন্দুগ কেরায়া না বাইলে তোমরা মরবা না, তারা
যদি সোনা গয়না টাকা-পয়সা লইয়া এই দ্যাশ ছাইড়া চইল্যা যায় তবে কিন্তু না খাইয়া মরতে
হইব—সেই কথা মনে রাইখ্য।’ আল্লার নামে সেদিন সমস্ত মাঝিদের কসম
করিয়ে তবে ছেড়েছিলেন তিনি। নতুন নতুন কড়কড়ে নোটের লোভে সে কসম তারা দুদিন যেতে না
যেতেই বেইমানের মতো খিলাপ করেছিল। মুরুব্বির যুক্তি-উপদেশ উড়িয়ে দিয়েছিল হেসে।
কুড়ল মেরেছিল নিজেদের পায়ে নিজের—সীরাজমিয়ার কথাইতো আজ অক্ষরে
অক্ষরে সত্য হতে চলেছে। এত বড়ো বেইমানি কখনো চোখ বুজে সইতে পারেন খোদা—
‘কেরে? কেরায়া যাইতে পারবি—কদমপুরের হাটে।’
গুণ-ছিড়ে যাওয়া ধনুকের মতো
লাফিয়ে উঠে দাঁড়ায় হাশিম,—চেয়ে দেখে বাজারের বড় মহাজন
শ্রীনাথ কুণ্ডু ছাতা বগলে রাস্তার উপর দাঁড়িয়ে নৌকা খুজছে। ফোঁটা তিলক কাটা গুরু
গোঁসাইর মতো গোলগাল তেল-ঘি ঢালা চেহারাটা রোদে পুড়ে যেন মাজা বাসনের মতো জিল, জিল
করছে।
‘নাও কেরায়া করবেন—আসেন কত্তা, আসেন। কই যাইবেন কইলেন?’ সোল্লাসে গলার স্বর তিনগুণ চড়ে যায় হাশিমের।
‘কদমপুরের হাটে। সেই খান থেইকা কিছু, মাল আনতে হইব—কত নিবি ঠিক কইর্যা ল।’
‘আপনাগো লগে আবার দরাদরি
করতে লাগব ক্যান কত্তা, যা ভাল মনে করেন বিবেচনা কইরা দিবেন।’ সারাদিনের প্রথম
কেরায়ার চলনদারের সংগে দরকষাকষি করতে কেমন লাগে হাশিমের। কুণ্ডু মশাই-এর এক টাকার
প্রস্তাবে এক রকম বিনা ওজর-আপত্তিতেই রাজি হয়ে যায় সে। এক টাকা কেন, কুণ্ডু মশাই
আটআনার উপরে উঠতে না চাইলেও তাকে ফিরাতো না হাশিম। এমন অলক্ষনী অপয়া দিনে শ্রীনাথ
কুণ্ডুকে দিয়েই তার প্রথম বউনি। তিনি না এলে তার কপালে আজ কী লেখা ছিল কে জানে।
কুণ্ডু মশাই-এর প্রতি কেমন একটা অপরিসীম কৃতজ্ঞতায় ভরে ওঠে হাশিমের মন।
মাথায় গামছার ফেটি বেধে
ঘাটের খুঁটি থেকে দড়ি খুলে ত্রস্ত-গতিতে নৌকা ছেড়ে দেয় সে। এতক্ষণে পেটের ক্ষিধের
টনটনিটা একেবারেই মরে গেছে তার, মাথার ঝিমঝিমানিটা যেন উড়ে গেছে ধোঁয়া হয়ে।
হামিদ-রাবেয়া-আজগরকে নিয়ে আর দুশ্চিন্তা নেই এখন। আর কঘণ্টা পরেইতো চাল নিয়ে সে
বাড়ি ফিরবে। এ বেলার ব্যবস্থা নিশ্চয়ই আমিনা ইতিমধ্যে কিছু একটা করেছে। এ রকমতো
আরো কতদিন হয়েছে—তা বলে আমিনা কি হাল ছেড়ে
দিয়ে কাচ্চা বাচ্চাদের উপোস করিয়ে রেখেছে? যে করেই হোক একটা না একটা ব্যবস্থা
করেইছে সে সবদিন।
পাকামাঝির ক্ষিপ্রতার সংগে
লগি চালায় হাশিম: হঠাৎ দমকা বাতাসে ঠাসা ঠাসা একগাদা মেঘ সরে যাওয়া আকাশের মতো
হাল্কা হয়ে যায় তার মনটা, স্বচ্ছ প্রসন্নতা উপচে পড়ে চোখেমুখে।
‘আপনারাও পাকিস্তান ছাইড়্যা
চইল্যা যাইবেন নাকি কত্তা; সকলেই তো চইল্যা গেল’—
‘সক্কলে যাইলেই কি আর আমরা
যাইমুরে—বোঝচনা হুজুগ—সব হুজুগ—রাসভারি গলায় উত্তর দেয় শ্রীনাথ কুণ্ডু।
কুণ্ডুর সংগে হাশিমের
আলোচনা এগুতে পারে না বেশীদূর। নদীর ঠাণ্ডা হাওয়ায় স্থূলাকায় লোকটা আরামে দু’চোখের
পাতা এক করে ঝিমুতে ঝিমুতে খানিক বাদেই নাক ডাকতে শুরু করে দেয় বাঘের মতো।
সূর্য পশ্চিম দিকে অনেকটা
হেলে পড়েছে। কিন্তু ভাদ্রমাসের চামড়া পোড়ানো রোদের ঝাঁঝ কমেনি একেবারে। কদমপুর
হাটে হরি-সাহার গদি সংলগ্ন ঘাটে নৌকা ভিড়ায় হাশিম। খানিক বাদে হাশিমকে আসতে বলে
শ্রীনাথ কুণ্ডু ব্যস্ত-সমস্ত হয়ে নৌকা থেকে নেমে পড়ে। হাশিম মাথার ফেটিটা খুলে
ফেলে ঘামে নেয়ে-ওঠা শরীরটাকে মুছে নিয়ে ছই-এর নিচে বসে হাত পা ছেড়ে দিয়ে হাঁপায় খানিকক্ষণ,
তারপর ঢক্ ঢক্ করে আকণ্ঠ জল খেয়ে আমিনউদ্দিনের কাছ থেকে পাওয়া খয়রাতি তামাকের
অবশিষ্টটুকু কল্কেতে পুরে হুকো টানতে শুরু করে দেয় একটানা। হাফরের মতো বুকটা তার
ওঠা-নামা করে ঘন ঘন।
হাটে নেমে ঘুরে ঘুরে সারি
সারি দোকান দেখে হাশিম। পিয়াজ-আলু-পান-মরিচ-কচু টাল করে জিনিস সাজিয়ে দোকানীরা সব
খদ্দেরের আশায় বসে আছে। খদ্দের কোথায় খদ্দের! চারদিকে খুঁজে বেড়ায় হাশিমের সন্ধানী
চোখ দুটি। চোখ ধাঁধানো রং বেরং এর মনোহারী জিনিসের দোকানের পাশ ঘেষে চলে সে।
ঝুলিয়ে রাখা একরাশ লাল তাগা নজরে পড়তেই থমকে দাঁড়ায় হঠাৎ। হামিদের মাজায় একগাছা লাল তাগা পরাবার বাসনা আমিনার অনেক দিনের। ‘পোলাপানগো খালি মাজার রাখতে নাই।
একগাছা তাগা হামিদের লাইগ্যা আইজই আইন্য কিন্তু—টুকটুকে
লাল রঙ দেইখ্যা আইন্য, দেইখ্য অরে ক্যামন সুন্দর মানায়।’ রোজ রোজ বলে বলে হয়রান
হয়ে এখন আর বলে না আমিনা। একবার একগাছা দর করে দেখবে নাকি? মনের ঝোঁকে দোকনটার
কাছাকাছি এগিয়ে যায় সে। তারপর হঠাৎ কী ভাবতে ভাবতে অন্যমনস্ক হয়ে টাল দেওয়া চাউলের
দোকানগুলির দিকে এগিয়ে যায় হাশিম। স্থির দৃষ্টিতে চেয়ে চেয়ে দেখে বড় বড় টালগুলি।
কোন রকমে এর একটাল চাউল বাড়িতে নিয়ে গোলায় তুলতে পারলে হাশিমের কি আর কিছু, ভাবনা
থাকে। ছেলেপিলেদের নিয়ে ছ’মাসের মনে নিশ্চিন্ত। চাউলের দর এখানে টাকায় সোয়াসেরঃ
তার গাঁয়ের দোকানে অনেক ঝুলাঝুলি করেও টাকায় এক সের আধপো’র উপরে মেলে না। মনে মনে
ঠিক করে—কুণ্ডু মশাই এর কাছ থেকে কেরায়ার টাকাটা চেয়ে নিয়ে হাট থেকেই
একসের চাল কিনে নিবে হাশিম। বাদবাকী পয়সা দিয়ে হামিদের জন্য একগাছা লাল তাগা নেবেই
সে আজ। তার পরেও যদি আর দু’এক আনা বাঁচে তবে চিড়ে গুড় খেয়ে পেটটা একটু ঠান্ডা করে
নেবে। পেটের ভিতরটা বিষের ব্যথার মতো কেমন যেন চিন চিন করছে এখন আর শরীরটাতেও তেমন
জোর বল পাচ্ছে না।
মাথা চুলকাতে চুলকাতে হাশিম
বলে, ‘যদি কিছু মনে না করেন কত্তা, তবে কই’—
কুণ্ডু অভয় দিলে হাশিম
সবিনয়ে বলে, ‘চাইতে তো আর পারি না, নিজের থেইক্যা খুশী হইয়া টাকাটা যদি অখন দিতেন
তবে হাটের থেইক্যা কিছু সদাই কিন্যা নিতাম’—
‘সদায়। কী সদায় কিনবি?’ হরি
সাহার গদিতে বসে ভারি গলায় প্রশ্ন করে শ্রীনাথ কুহু।
‘সদায় আর আমরা কী করতে
পারি, কত্তা—কিছু খোরাকির চাউল কিন্যা নিমু ভাবছি। এইখানে চাউলের দাম
আমাগো গ্রামের থেইক্যা সস্তা কিনা—টাকায় এই ধরেন সোয়াসের’—
‘চাউল কিনবি, সেই কথা ক’, সেইয়ার লেইগা আবার
ভাবনা কি। চাউলতো দোকানের লেইগা আমিই নিমু—বাজারে গিয়া সেইখান থেইকাই
নিতে পারবি’—এরপর ঝটপট, ব্যবসায়ের পাওনা দেনা মিটিয়ে দিয়ে শ্রীনাথ
কুণ্ডু ব্যস্ত সমস্ত হয়ে ছাতা বগলে গদি থেকে নেমে পড়ে, জুতা পায়ে দিতে দিতে
হাশিমের উদ্দেশে বলে, ‘সন্ধ্যা হইয়া আইল, চাউলের বোস্তাগুলি চটপট নৌকায় তুইল্যা
ফেল’—
শ্রীনাথ কুণ্ডুর এই ঝড়ের
মতো ব্যস্ততার সামনে আর কোন ওজর আপত্তি তুলবার সুযোগ পায় না হাশিম। মাল টানা গাধার
মতো চাউলের বস্তাগুলি পিঠে করে নৌকায় তুলতে থাকে একের পর এক নির্বিবাদে, ভারি ভারি
বোঝাগুলির চাপে শিরদাঁড়াটা যেন ভেঙ্গে আসতে চায় একেক বার, মাঝে মাঝে দাঁড়িয়ে দু’হাতে
কোমরে চাপ দিয়ে সোজা হয়ে নেয় সে, কখনো বা হুমড়ি খেয়ে পড়তে পড়তে অতিকষ্টে সামলে নেয়
নিজেকে।
বেশ একটু রাতে হাশিমের চাউল
বোঝাই নৌকা এসে বাজারের ঘাটে লাগল। রাস্তার লোক চলাচল একরকম নেই বল্লেই হয়; ঘাটে
বিদেশী মাঝির এক আধখানা ডিঙি ছাড়া আর সবই কখন গাঁয়ের উদ্দেশে ছেড়ে চলে গেছে।
বাজারের সারি সারি ঝাপবন্ধ ঘরগুলোর তলার ফাঁক দিয়ে সড়কের এখানে সেখানে একটু-আধটু
স্তিমিত আলো এসে ছিটকে পড়েছে—কোথাও বড় একটা সাড়া শব্দ
নেই: হাশিমের অবসন্ন চেতনাকে কেমন যেন একটা জমাট বাঁধা থমথমে ভাব চারদিক থেকে চেপে
ধরে।
সারাদিনের উপোসে, রোদে পোড়া
পরিশ্রমে এলিয়ে পড়া দুর্বল শরীর নিয়ে চালের বস্তাগুলি একে একে শ্রীনাথ কুণ্ডুর
দোকানে তুলে দিয়ে হাশিম যখন খালাস হলো—তখন তার এক পা চলবারও আর
সামর্থ নেই। সারাদিনের প্রবল ঝড়ে যেন তার মাথার মধ্যে, চোখের ঝাপসা দৃষ্টিতে সমস্ত
পৃথিবীটা ভেঙে চুরে একাকার করে দিয়ে গেছে, শিরা উপশিরাগুলি থেতলে শরীরের সব গরম
রক্ত বেরিয়ে গেছে। দোকান ঘরের কোণে একটা খাঁটিতে ঠেস দিয়ে বসে সে খানিকক্ষণ চোখ
বুজে থাকে। ঝা-ঝা করা মাথার মধ্যে বাড়ির দুশ্চিন্তা আবার যেন প্রবলবেগে হাতুড়ি
হানতে শুরু করে দেয়। আমিনা যদি আজ কোনখান থেকেই চাউল সংগ্রহ করতে না পেরে থাকে,
হামিদ-রাবেয়া-আজগর সারাদিন উপোসের পর এখন হয়তো অজ্ঞান হয়ে মরার মতো পড়ে আছে। আর
আমিনা—
হঠাৎ কড়, কড়, মড়, মড়, শব্দে
খুলে যায় দোকান ঘরের ভেজানো টিনের ঝাপটা। সেই দিকে দৃষ্টি যেতেই চমকে ওঠে হাশিমঃ
টিম টিমে প্রদীপের অস্পষ্ট আলোতে তার ঝাপসা চেতনায় একটা অদ্ভুত রহস্যময় মনে হয় যেন
সব কিছু।
ভারি ভারি পায়ের শব্দ
মিলিয়ে যায় কুন্ডুর গদিতে উঠে, খাটো গলার প্রশ্ন ভেসে আসে হাশিমের কানে: ‘কতমণ
চাউল খরিদ কইর্যা আইলেন?’ ‘ত্রিশ মণ চৌত্রিশ টাকা দরে-পনর বিশ মণ লগে লইয়া আইছি’—কুণ্ডু বিতং দিয়ে সবিনয়ে নিবেদন করে তার বক্তব্য।
‘চৌত্রিশ টাকা দরে খরিদ
করছেন। বেশ বেশ’—উল্লাসে লাফিয়ে ওঠে সেই
চাপা ভারি গলাটা, ‘এইখানে আইজ এক বিকালের মধ্যেই দর চল্লিশ টাকায় ওঠছে। কাইল আরো
দুই একটাকা বাড়বে আশা হয়। তা হইলে ত্রিশ মণ চাউলে লাভ একেবারে মন্দ হইব না।’ স্থূলকায় কুণ্ডুর ক্ষুদে ক্ষুদে চোখ দুটাও যেন কেমন একটা অদ্ভুত আনন্দে পিট পিট করে
নাচতে থাকে।
অসহ্য অবসন্নতায় মাথাটা
ঘুরতে থাকে হাশিমের সমস্ত শরীরটা ছেড়ে দিয়ে নিরুপায়ের মতো সে এলিয়ে পড়ে ঘরের কোণের
শক্ত খুটিটার উপর। কুণ্ডুর উদ্দেশ্যে বলা চাপা কথাগুলি আবার ভেসে আসে তার কানেঃ ‘কাইল
সন্ধ্যার মধ্যে সন্তায় পঁচিশ ত্রিশ মণ নিরস চাউলের জোগার করতে হইব আপনের—যত সম্ভার
মধ্যে পান। পচা-ভাঙা-মোটা-মিশালি মোটকথা যত খারাপ হোক কোন ক্ষেতি নাই।’
একটা জঘন্য ষড়যন্ত্র যেন
গিজ গিজ করছে দরজা ভেজানো ঘরটার অবরুদ্ধ থমথমে আবহাওয়ায়। উদগ্রীব আগ্রহে লম্বা
লম্বা দাঁতগুলি বের করে শ্রীনাথ কুণ্ডুর মুখটা কুৎসিতভাবে হা-হয়ে রয়েছে যেন।
শ্মশানের লোভী শেয়ালের মতো কান খাড়া করে শুনছে সেঃ ‘ফুড কমিটিতে পঞ্চাশ মণ খুব ভাল
সরু চাউল আইছে—হেইয়ার থেইকা পঁচিশ ত্রিশ মণ গোপনে সরাইয়া রাখছি, হেই চাউল
পূরণ কইরা দিতে হইব—ব্যাপারটা এইবার বোঝলেন তো,
কুণ্ডু মশাই।’ কথা শেষ হতেই যেন খুনী ডাকাতের একটা বিভৎস সর্বনাশা শয়তানির হাসির
শব্দে ঘরটা ছম ছম করতে থাকে।
নিজের অর্ধচেতন চোখ কানকে
কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারছে না হাশিম: সারাদিন পশুর মতো পরিশ্রম আর উপোসে তবে কি
জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছে সে? ক্ষুধিত অবসন্ন চেতনায় এক দারুণ অবিশ্বাস্য দুঃস্বপ্ন
দেখছে। হঠাৎ তার মাথার রক্তে প্রবল জেদ চেপে যায়—এই সন্দেহ
তাকে দূর করতেই হবে। একটা অদ্ভুত উত্তেজনার হেচকা টানে চাঙা হয়ে ওঠে হাশিমের
শরীরটা মুহূর্তের প্রচণ্ড ধাক্কায় ভেঙে চৌচির হয়ে যায় তার এলিয়ে পড়া অবসন্নতা।
খুটি ছেড়ে লাফিয়ে উঠে গদির কাছে ঘেঁষে দাঁড়ায় হাশিম। প্রদীপের আলোয় সত্যিই সে
দেখতে পাচ্ছে সীরাজমিয়াকে। এ তল্লাটের মুরুব্বি মাতব্বর সীরাজমিয়া, গরীবের আশ্রয়
সীরাজমিয়ার মুখ থেকে তখনো সেই শয়তানের হাসি একেবারে মিলিয়ে যায়নি।
মসজিদে-বৈঠকে-জমায়েতে যাকে দেখে শ্রদ্ধায় সাহসে রোমাঞ্চিত হয়ে উঠতো হাশিমের বুক—রাত্রির ঠাসা অন্ধকারে প্রদীপের টিম টিমে আলোয় আজ তাকে দেখে
অদ্ভুত রকম আঁতকে উঠল সে, ঘৃণায় যেন শরীরের সমস্ত রক্ত বিষিয়ে গেল তার। নিজের
বিশ্বাসের উপর নিজেই মুহুর্মুহু নির্মম কঠোর চাবুক হানতে থাকে হাশিম।
সীরাজমিয়া চমকে ওঠে। লোকটা
তাহলে ওখানে বসে বসে সব শুনে ফেলেছে। অসম্ভব বিরক্তি ফুটে ওঠে তার চোখে মুখে,
গম্ভীর হয়ে সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে কুণ্ডুর দিকে ফিরে তাকায়। শ্রীনাথ কুণ্ডুকেও দারুণ
অপ্রস্তুত দেখায় প্রথমটায়, একটু থতমত খেয়ে খানিকক্ষণ এদিকে ওদিকে তাকিয়ে গলার স্বর
স্বাভাবিক করে বলে, ‘কেরায়ার টাকা চাচ,—তা এতক্ষণ কচ নাই ক্যান?’
'টাকা চাইমু ক্যান? চাউল
দিবেন না কইছিলেন, চাউল নিমু।’ নিজেকে সামলে নিয়ে স্পষ্ট গলায় বলে হাশিম।
‘এই গদা, এক স্যার চাউল
মাইপ্যা দিয়া দেত’ ডানদিকের লোকটার দিকে মুখ ফিরিয়ে হাঁক দিয়ে বলে কুণ্ডু।
রাগে হাশিমের পা থেকে মাথা
পর্যন্ত জ্বলে ওঠে, ধৈর্য হারিয়ে ফেলে তার গলার স্বর, ‘এক স্যার চাউল ক্যান?
সোয়াস্যার দিবেন কদমপুরের হাটের দরে—হাট থেইক্যাইতো আমি কিন্যা
আনতে চাইছিলাম।’
এবার কুণ্ডু উত্তর দেবার
আগেই ক্ষ্যাপা কুকুরের মতো গলা ছেড়ে খেঁকিয়ে উঠল সীরাজমিয়া, ‘এক স্যার না—তোরে কয় স্যার দিবরে শুয়ার? ষাড়ের মতো চেচাচ্ যে খুব—কার সামনে কথা কচ্ ঠিক পাচ না? চাউল পাবি না তুই, এক ছটাক
চাউলও তোরে দিমুনা এইখান থেইক্যা’
রাগে গজ গজ করতে করতে
একটানে হাত বাক্সটা খুলে ফেলে সে তারপর একটা রূপার টাকা ক্রোধান্ধ তাচ্ছিল্যের সংগে
ছুড়ে মারে হাশিমের দিকে।
মাথার রক্ত আগুনের মতো গরম হয়ে ওঠে হাশিমের—অসহ্য ক্রোধ মুহূর্তের মধ্যে যেন ফেটে পড়ে সমস্ত শরীরে—কোটরাগত চোখ দুইটা অগ্নি স্ফুলিংগের মতো ঠিকরে বেরিয়ে আসতে চায় তার। নিজের মধ্যে প্রবল শক্তি অনুভব করে আশ্চর্য হয়ে যায় হাশিম। দোজকের শয়তান দুটোর সামনে দাঁড়িয়ে তার এতদিনের বাঁকা শিরদাঁড়াটা যেন লোহার থামের মতো সোজা হয়ে গেছে হঠাৎ। হাশিমের ইচ্ছা করে বাঘের মতো একলাফে গদিতে উঠে শয়তান দুটোর ঘাড় মটকিয়ে আজ বাড়ি ফিরে সে।
রচনা: ২১ চৈত্র ১৩৫৫

দারুণ খুব ভালো লাগলো
ReplyDelete