হাফ ডজন কবিতা :: খান নজরুল ইসলাম
ইদানীং
ইদানীং নিতে পারি না
মেঘ দেখলেই মন খারাপ
নির্মল বায়ুকেও ঝড় মনে হয়
ধারালো ছুরির মতো সোনা রোদ!
অঝোরে বৃষ্টি যেনো চোখের বারুদ!
কী হলো আমার!?
মিছিল দেখলেই আৎকে উঠি
এই বুঝি গভীর ষড়যন্ত্রের ঢেউ
এই বুঝি ঝরে যাবে গোটা কয়েক প্রাণ
এই বুঝি গন্ধ ছড়াবে নিথর মাংসপেশি
ইদানীং নিতে পারি না
হাতের তালুতে থাকা স্তন যুগল
ভূমিকম্পের মতো কেঁপে ওঠে
থরথরে কেঁপে ওঠে শ্রাবণী ঠোঁট
বিষাদভয়ে আৎকে ওঠে স্ব-প্রাণ
একি হলো আমার!?
বিজ্ঞান বিশ্বাসে যুদ্ধের দামামা
বারুদের গন্ধ শুষে দুষিত বায়ু
ধর্মের পতাকাজুড়ে লোভের বেসাত
শিশু বুকে প্রতিদিনই মৃত্যু কাঁপে!
ইদানীং মনে হয়...
মধ্যযুগের সভ্যতায় ফিরে যাচ্ছে মানব
সৃষ্টির সেরা জীব আজ শ্রেষ্ঠ দানব!!
নদী ও জীবন
নদীর জোয়ার-ভাটার মতোই জীবনের রূপ
উত্তাল জীবনজোয়ারে আসে জীবনের সুখ!
ভেসে আসে রঙ, রস—উন্মাদনা বৈশ্বিক দাপট
প্রবল উত্তেজনা, প্রাণ আনচান, করে ছটফট!
দু’কূলে থেমে থাকা জড়বস্ত, পায় যে জীবন
উল্লাসে গতি পায় দামিনীদাপটে চপল চরণ।
অরোধ্য হয়ে ওঠে দুর্বার নদীর স্রোতের বেগ
ভুলে যায় ক্ষণিকের উত্থান, নিমিষে নিঃশেষ!
পরন্ত বিকেলে চুপিসারে, উল্টো পথের টান
হুতাশনে ঘিরে ধরে তড়িৎ... জীবনের গান।
চেনা-অচেনা জুটেছিল যা ক্ষণজোয়ার ক্ষণে
ব্যাথিতবেদনে সুধায় ইতিকথা পরিচিত জনে।
উন্মাদনায় ঘোলা করা জলে, রসালো জীবন
ধনুকের মতো আঘাত হানিয়া, করিবে পতন!
জোয়ার বেগে চারিপাশ থেকে যতটা অর্জন
হারাবে দ্বিগুণ তার, দ্বিগুণ গতিতে, শত গর্জন!
জোয়ারশেষে ভাটা আসিবে উপলব্ধি যার নেই
জীবনযুদ্ধে করুণ পরিনতি আসিবে অচিরেই!
গ্রাম বনাম শহর
খরস্রোতা নদীর কলকল ধ্বনি
কাদামাটির সুমিষ্ট গন্ধ নিয়ে বুকে
আমি বাতায়নে চেয়ে দেখি
জলের সাথে সমীরণের প্রেম।
এখানে প্রতিদিন সকাল আসে
আসে তপ্ত দুপুর, সন্ধ্যা ও রজনী
ভোরের শিশিরে প্রতিদিন
ঘাসের মাদুলে পা ভেজাই...!
পা থেকে মাথায় ওঠে শীতলতা
আপাদমস্তকে শীতল শিহরণ!
দুপুরে সোনালি রোদ ধানের শীষে
প্রাণ জেগে ওঠে ভরসায়!
রাতের আড়াল ভেঙে দেয় জোছনা
উঠানে দাঁড়িয়ে দেখি তারাদের মিতালি।
আমার পাগলামি সুখে চাঁদ হাসে!
হা, আমি গ্রামেই থাকি
প্রেম, মায়ার নিপুণ বন্ধনে!
তুমি থাকো ইট পাথরের নগরে
দানব যন্ত্রের রাক্ষসী কাঁপনে...
কৃত্রিম সমীরণে শীতল করা মনে
সারাক্ষণ অস্থিরতার বিশ্রী মেজাজে!
নিয়নবাতিতে প্রতিদিন জোছনা রাত
যেখানে চাঁদ আর তারার খেলা নেই
শিশিরে ভিজবে না পা কোনোদিনই
চারিদিকে গিজগিজ দানব দোহাই!
তোমরা ধুলিকনাকেই সমীরণ বলো!
সবুজের আবরণ নেই সেখানে
নেই নদীর কলকলে ধ্বনি...
মাটিহীণ নগরজুড়ে পেট্রোলের গন্ধ।
কৃত্রিম বাহাদুরি, তোমাদের দিয়ে যায়
প্রেম, মায়ার খুনসুটি সারাক্ষণ
কোমলতা তোমাকে স্পর্শ করে না
তুমি যে কেবলই রক্তে মাংসে গড়ে ওঠা
তরতরে মানুষ!
মায়া
যদি ভালোবেসেই থাকো
জড়িয়ে রেখো গুল্মলতার মতো
সকাল বিকাল শূন্যলতা যেমন...
বালাই থেকে মুক্ত রাখে মায়ায়।
যদি ভালোবেসেই থাকো
জড়িয়ে রেখো ভোরের শিশির হয়ে
আকাশটাকে বিন্দু বিন্দু মেঘ...
গভীর তাপে ঢেকে রাখে ছায়ায়!
যদি ভালোবেসেই থাকো
রাখবো তোমায় গভীর নিরাপদে
তোমার বুকের ঝড়, বৃষ্টি, রোদ...
ভয়ানক সব আপদ, বিপদ, শোক
সে আমারই, সে আমারই হোক!!
আত্মসমর্পণ
আত্মসমর্পণ করে যাই বারবার
কখনো বিধাতার কাছে
কখনো ক্ষমতার কাছে
কখনো মমতার কাছে!
কখনো অপারগ হয়ে!
বেঁচে থাকতে এই আত্মসমর্পণ
ভালো থাকতে এই আত্মসমর্পণ!
আমার বেঁচে থাকার লোভ খসে পড়ে
আমার উচ্চ বিলাসী জীবন মাস্তুলে ঘোরে
আমার স্বপ্নগুলো আকাশ ছুঁয়ে বেড়ায়...
কৌশলে তুমি, তোমরা জিম্মি করে রাখো!!
আত্মসমর্পণ ভীষণ লজ্জার
আত্মসমর্পণ ভীষণ কষ্টের
আত্মসমর্পণ ভীষণ দোষের
আমি এই অপরাধ তবুও মাথা পেতে নেই!
আমি হেরে গিয়ে তোমাকে খুশি করি
তোমাদের খুশি করি!!
শূন্যতা
আকাশটা ছুঁতে চেয়েছিলাম
মেঘের পর্দা ভেদ করে হয়ে ওঠেনি
চোখের পর্দা সরিয়ে নির্লজ্জ হলেই
আকাশের আত্মচিৎকারে বজ্রপাত ঘটে!
আমি আবার ফিরে আসি আপন আস্তানায়!
দেহের সমুদ্রে রাখা গুপ্তধন
সবটুকু লুটেপুটে নিমিষেই শেষ
প্রতিঘাতে অরক্ষিত আপন আলয়
কেবলই রক্তক্ষরণ বিষাদের ঠোঁটে
বারবার দ্রোহের কাঁপন বিশাল শুন্যতায়!!
তোমার সমুদ্রচোখে মুক্ত ছিল
জল খসে খসে সে পাথর মূল্যহীন
তোমাকে ছুঁতে গেলে বুঝি তার দাম
জানি সবই, এ গৃহে কেনো অঘটন ঘটে
বিলাসী জীবন কেনো বিষাদের অশ্রুধারায়!

অসংখ্য ধন্যবাদ আমার অর্ধডজন কবিতা প্রকাশের জন্য।
ReplyDelete