মুক্তি ও বিজয়ের কবিতা

মুক্তি ও বিজয়ের কবিতা

মুক্তি ও বিজয়ের কবিতা

    ছবি:: নাদিরা নূর

মুক্তি ও বিজয় বিষয়ক কবিতা

খান মেহেদী মিজান

 

১.

১৯৭১ সাল ২৬ মার্চ হতে মুক্তির ডাক

বর্বর সেনা হানাদার পাক নিপাত যাক।

শহর নগর অলি গলি হাট বাজার গ্রাম

যার যা আছে তাই নিয়ে করে মুক্তির সংগ্রাম।

৯ মাস বাঙালির লড়াই; পাকিদের 

বড়াই পর্যদস্তু হয় ১৬ ডিসেম্বর 

রক্তে নির্মিত হয় বিজয়ের মিনার-মিম্বরে

জীবন সম্ভ্রম রক্ত অনেক উৎরাই চড়াই।

 

২.

মুক্তিযোদ্ধা তুমি মহাকালের অগ্নিপুরুষ

তুমি বর্ষিয়ান নেতা ইতিহাসের জৌলুস

তুমি নব প্রজন্মের দিশারী সূর্য সন্তান

নতুন সূর্যের কারুকাজ

তুমি দুঃসাহসিক সংশপ্তক অনির্বাণ  

তুমি গৌরবগাথা এ জাতির তাজ।

 

৩.

আমার বিজয় আমার স্বাধীনতা

উড়ে লাল সবুজের পতাকায়

দোয়েলের ডাকে ভাঙে ঘুম

প্রজন্ম গেয়ে ওঠে আমার সোনার বাংলা

চিরদিন ভালোবাসি তোমায়।

আমার বিজয় আমার স্বাধীনতা

অসাম্প্রদায়িক অহিংস সমাজ

উৎসব পার্বণে যেন এক কার্বণে

মাটির গন্ধ মেখে সাজে এক সাজ।

 

৪.

স্বাধীনতা আমার মুক্তিযোদ্ধা পিতা সম্ভ্রম হারা মাতা 

স্বাধীনতা আমার স্বামীহারা ভগ্নি বীর সাহসী ভ্রাতা

স্বাধীনতা আমার অগ্নিঝরা কলম মুক্ত কবিতার খাতা

স্বাধীনতা আমার লাখো শহীদের রক্তে এ মাটির উর্বরতা

স্বাধীনতা আমার কৃষক শ্রমিকের ফসল ও শ্রমের দাম

স্বাধীনতা আমার বাংলাদেশ নামক স্বপ্ন ম্যাপের নাম।

 

বাংলাদেশ

শারদুল সজল

 

দেখলেই চিনবেন

শরীরের রঙ ধূসর তামাটে 

খুব কালো বা ফর্সা নয়

বুকের খাঁচা সোনালি ধানে উর্বর

রক্ত বিলিয়ে জন্ম নিয়েছি আমি 

সাহসের দুরন্ত হুইসেলে 

সন্তানেরা আমার নক্ষত্রজন্মের 

আদিপিপাসা

 

দেখলেই চিনবেন

দূর নীলিমার চাঁদ আমার মুখের ভাষা

সমুদ্রের গভীর গন্তব্যে আমার চোখ 

বিস্তীর্ণ সজীবতা

 

আমি নরম রোদশোভিত জলের কুসুম

বুক দীর্ঘ বয়ে গেছে নদী

মৃত্যু-মহত্ত্বে গড়ে উঠেছি মজ্জাগত

 

দেখলেই চিনবেন

আমি ৭১, আমি বাংলাদেশ

 

ক্ষমা

খান নজরুল ইসলাম

 

মানুষের মন,

কতোটা উদার হওয়া যায়!?

তুমি ক্ষমার কথা কেনো বলো বারেবার!?

যে পোয়াতি নারী তার স্বামীকে হারালো

যে ভাইয়ের সামনেই ধর্ষিতা হলো বোন,

যে বোনের সামনে ভাইয়ের বিকৃত লাস।

উপড়ে ফেলা চোখ হাতে বাবার আকুতি!

মুক্তিযোদ্ধার অপরাধে মালেক বয়াতির

ঘর পুড়ে ছারখার! 

 

মানুষের মন

কতোটা উদার হয়? কেনো তাকে...

কেনো, ক্ষমার কথা বলো বারেবার!?

 

বিজয়

ইব্রাহিম খলিল

 

বুক পেতেছি বুলেট বোমায়

বিজয় আনার তরে,

রক্তে কেনা বিজয় আমার

সাধ্য যে কার ধরে।

 

শক্ত হাতে রুখতে জানি

ঐ শোষনের হাত,

ভাঙতে জানি হানাদারের

হিংস্র বিষের দাঁত।

 

তরুণ মনের ভালোবাসা

যুদ্ধ করে শেষ,

মা হারিয়ে ভাই হারিয়ে 

পেলাম স্বাধীন দেশ।

 

নয়টা মাসের যুদ্ধ শেষে

আসলো ফিরে জয়,

বিজয় আমার রক্তে কেনা

অন্য কারো নয়।

 

বাংলাদেশের অভ্যুদয়

ইয়াসিন আযীয

 

শত প্রতিকূলতা, অনিশ্চয়তা ছুঁয়ে মানুষের জন্ম হয়

নদীর জন্ম আছে, দেশেরও আছে জন্মবৃত্তান্ত...

এই মহাবিশ্ব... পৃথিবী: তারও আছে জন্ম, আছে শুরুর কথা।

আমাদের এই দেশ-মাতৃভূমি বাংলার কথা যদি বলি

বায়ান্নর ভাষাশহিদদের বুকের তাজা রক্ত আর

রাজপথের কালো পিচের মিলন-ভ্রূণের রূপ দিয়েছিল...

মা তার গর্ভের ভ্রূণটাকে প্রথমেই টের পান না

যখন একটু একটু করে কিছুটা বড় হয়ে ওঠে

তখনি অনাগত সন্তানের অস্তিত্ব টের পান মা।

একটু ভয়, একটু দ্বিধা আচ্ছন্ন করে রাখে মাকে-

তবুও কষ্টে মোড়া আনন্দের দিনটার জন্য তৈরি হন।

১৯৫২ সালে ভ্রূণ হিসেবে রূপ নেওয়া এই দেশটাকে

৫৪ থেকে ৬৯-এর পথ ধরে চূড়ান্ত টের পান পূর্বপুরুষেরা

তখনই কিছুটা ক্ষোভ, পরাধীনতার গ্লানি আর অনিশ্চয়তা 

ঘুরপাক খেতে থাকে তাদের মনে সাইক্লোন সিডরের মতো। 

মা যেমনি দশ মাস পর জন্ম দেন একটি নিষ্পাপ শিশু 

অনেক ব্যথা-বেদনা, অনেক কষ্ট, অনেক রক্তক্ষরণ শেষে; 

তেমনি বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের জন্য দীর্ঘ ৯ মাস

শহুরে গলি, মেঠোপথের ধূলি, নদীর পানি হয়েছে রক্তাক্ত 

হানাদারের পদধ্বনি আর বুলেটের শব্দে বাতাস হয়েছে দূষিত

সবুজ পাতা হয়েছে ছাই, জীবন্ত ডাল হয়েছে কয়লা

ঘরবাড়ি, বাজার, দোকানপাটে জ্বলেছে দাউদাউ আগুন 

বাংলার সবুজ শাড়িতে লেগেছে রক্তের ছোপ ছোপ দাগ 

হোক মৃত্যু তবুও স্বাধীনতা... এই শপথে বীর সন্তানেরা

একটি ফুল, একটি লাল সূর্যকে ছিনিয়ে আনতে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল।

অবশেষে আমার বাংলা তিরিশ লক্ষ শহিদের তাজা রক্ত

দুই লাখ মা-বোনের সম্ভ্রম, কোটি মানুষের হাহাকার নিয়ে

অশ্রুহীন বাবার, ভাষাহীন মায়ের, স্বামীহারা বধূর আঁচলজুড়ে

সবুজের মাঝে লাল টকটকে সূর্যের উদয় হয়েছিল...

জন্ম হয়েছিল স্বাধীন ভূখণ্ডটেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়ার;

পদ্মার বুকে গড়ে ওঠা সোনালি স্বপ্নের সেতুর মতো

পৃথিবীর মানচিত্রে অভ্যুদয় হয়েছিল, বাংলাদেশের! 

 

আবার আমরা যুদ্ধে যাবো

টোটন চন্দ্র দাস

 

লাখো শহীদের রক্তে ভেজা পবিত্র বাংলার মাটি

আজো কেন সেই মাটিতে নরপিশাচের ঘাঁটি?

 

রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে কেনা প্রিয় স্বাধীনতা

স্বাধীনদেশে আমরা কেন পাইনা স্বাধীনতা?

 

অকাতরে ঝড়েছে কত তাঁজা তাঁজা প্রাণ

কোনদিনও শোধ হবে না শহীদের অবদান।

 

মা-বোন হারালো সম্ভ্রম আর বাবা হারালো ছেলে

সেই পুরোনো হায়না আজ দেশটা খেতে চায় গিলে।

আবার আমরা যুদ্ধে যাবো হবো অবসান

জীবন দিয়ে রাখবো দেশের স্বাধীনতার মান।

 

১৬ ই ডিসেম্বর

সানজিদা মিম

 

১৬ ই ডিসেম্বর, লাল-সবুজের ভোর,

শহীদের রক্তে লেখা স্বাধীনতার জোর।

নয় মাসের কান্না, নয় মাসের ব্যথা,

শেষমেশ জেগে উঠল বিজয়ের কথা।

 

ভাঙা ঘর, পোড়া গ্রাম, মায়ের নীরব চোখ,

বুকে জমে ছিল অজস্র শোক।

তবু হার মানেনি বাংলার প্রাণ,

অস্ত্র ধরেছিল কৃষক, ছাত্র, মহান।

 

গর্জে উঠেছিল স্বাধীনতার ডাক,

শত্রুর বুকে নেমে এসেছিল কাঁপাকাঁপ।

১৬-ই ডিসেম্বর, সূর্য উঠল নতুন,

পরাধীনতার শৃঙ্খল হলো ছিন্নভিন্ন।

 

এই দিন শেখায় মাথা উঁচু করে চলা,

অন্যায়ের সামনে কখনো না থামা।

লাল-সবুজ পতাকা রাখি হৃদয় জুড়ে,

বিজয়ের গল্প বয়ে চলি প্রজন্ম জুড়ে।

 

যার নাম বাংলাদেশ 

মোঃ আব্দুল আলী

 

এই বিজয় শুধু আমার নয়, 

                  আমার বংশের নয়, 

আমার গ্রামের নয়। 

এই বিজয় আমার জাতির 

                   আমার মাতৃভূমির। 

এই বিজয় আমার শহীদ ভাইয়ের, 

      যার রক্তে লাল হয়েছে 

এদেশের মানচিত্র। 

এই বিজয় আমার মা বোনের, 

যার ইজ্জতের বিনিময় 

আমরা পেয়েছি এই স্বাধীন দেশ। 

এ বিজয় আমার দামাল ভাইয়ের 

যার অস্ত্র চালনায়, 

আর তীক্ষ্ণ কৌশলে 

ঘায়েল করে শত্রু বাহিনীকে। 

এ বিজয় আমার মুক্তিবাহিনীর

যারা যুদ্ধ করে ছিনিয়ে এনেছিল, 

একটি স্বাধীন দেশ 

যার নাম বাংলাদেশ।

 

বিজয়ের মহাকাব্য

মোঃ বিল্লাল হোসেন ইমন 

 

১৬ ই ডিসেম্বর, রক্ত-রাঙা ভোর,

ইতিহাস ডাকেএই দিনটা অমর।

লাল-সবুজ পতাকা উড়ে নীল আকাশে,

বিজয়ের গান বাজে বাংলার বাতাসে।

 

কত শত মা কেঁদেছে নিঃশব্দ রাতে,

কত শিশুর স্বপ্ন ভেঙেছে কালো প্রভাতে।

গ্রাম থেকে শহর, নদী থেকে মাঠ,

বুলেটের আগুনে জ্বলেছিল প্রতিটি পথঘাট।

 

বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়েছিল বাংলার দামাল,

হাতে ছিল না অস্ত্র, তবু মন ছিল বিশাল।

‘জয় বাংলা’ ধ্বনিতে কেঁপেছিল শত্রু,

মৃত্যুর চোখে চোখ রেখে বলেছিলযাব না পিছু।

 

মাটির গন্ধে মিশে আছে শহীদের রক্ত,

তাই এ দেশ এত পবিত্র, এত অমৃত শক্ত।

একটি মানচিত্র নয়এটি আত্মার পরিচয়,

বাংলাদেশ মানে ত্যাগ, সাহস আর নির্ভয়।

 

নয় মাসের ঝড়ে ভেঙে গেল শিকল,

পাক হানাদারের হল পরাজয় নিশ্চিত ও বিকল।

অস্ত গেল অন্ধকার, উঠল স্বাধীন সূর্য,

বিজয়ের আলোয় হাসল শস্য, নদী আর দূর্য।

 

আজকের এই দিনে শপথ নিলাম আবার,

ভুলব না ইতিহাস, করব না অবহেলার ভার।

ভাষা, দেশ, পতাকাসব রক্ষা করব প্রাণে,

বিজয়ের চেতনা রাখব হৃদয়ের জানে।

 

ও বিজয়, তুমি শুধু অতীতের কথা নও,

তুমি ভবিষ্যতের পথ, সাহসের আলোছাও।

 

চিরজীবী থাকুক বাংলার স্বাধীন গান,

চির অম্লান হোক আমাদের বিজয় দিবস মহান। 


মুক্তিযুদ্ধের এক অনন্য স্মৃতি: নড়িয়ার পদ্মার পাড়ে তিন সাহসী যুবক

জাহাঙ্গীর কবির

 

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের এক গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত ধারণ করে এই ঐতিহাসিক ছবি। কালো শার্ট ও সাদা লুঙ্গি পরিহিত নড়িয়ার পাইকপাড়া গ্রামের আলোচিত মুক্তিযোদ্ধা জেমস বাবুল ছিলেন সাহস ও প্রতিরোধের প্রতীক। মুক্তিযুদ্ধের সময় এই টগবগে যুবক প্রাচ্যের অক্সফোর্ড খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃতি ছাত্র ছিলেন। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর ঘুম হারাম করা এই যোদ্ধা ছিলেন ভয়হীন ও দৃঢ়চেতা। বর্তমানে তিনি জার্মান প্রবাসী। 

 

যুদ্ধকালীন সময়ে চরআত্রার পদ্মার পাড়ে তোলা ছবিটি সেই উত্তাল সময়ের নীরব সাক্ষী। ছবিতে বাম দিক থেকে রয়েছেন স্বপন মজুমদার, অনিল মজুমদার ও জেমস বাবুল। ছবির উপরের দু’জন লঞ্চের স্টাফ হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তাদের নাম এবং পরিচয় জানা যায়নি। 

 

স্বপন মজুমদারের বাড়ি নড়িয়া উপজেলার কেদারপুর গ্রামে। তিনি মূলকতগঞ্জ বাজারে একটি ওষুধের ফার্মেসি পরিচালনা করতেন।

অনিল মজুমদার-এর বাড়িও নড়িয়া উপজেলার কেদারপুর গ্রামে। অনিল মজুমদার ও স্বপন মজুমদার একই বাড়ির সন্তান। তাদের বাড়িটি সরত ডাক্তারের বাড়ি হিসেবে পরিচিত। অনিল মজুমদার বিএসসি সম্পন্ন করে প্রথমে রক্ষী বাহিনীতে যোগ দেন। পরবর্তী জীবনে তিনি ঢাকা হাইকোর্টের একজন সম্মানিত আইনজীবী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন।

 

ভিন্ন পরিচয় ও পেশায় হলেও তিনজনই ছিলেন দেশপ্রেমে একাত্ম। তাদের সাহস, ত্যাগ ও স্মৃতি মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে চিরদিন শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

 

তথ্যসূত্র: মুক্তিযোদ্ধা জেমস বাবুল।

Post a Comment (0)
Previous Post Next Post