কবি ও ছড়াকার ‘সুপান্থ মিজান’ সংখ্যা
জীবনের
মুখগুলি ১৬০ :: সুপান্থ মিজান
কামরুল হাসান
সুপান্থ মিজান একজন ছড়াকার। যারা ছড়া
লেখেন তাদের ভেতর দুটি বিষয় কাজ করে। এক, তারা ছন্দ ভালোবাসেন; দুই, তারা শিশুদের
ভালোবাসেন। দুটোই অকৃত্রিম আনন্দের ধারা বয়ে আনে। সুপান্থ মিজান ফুল, পাখি, নদী—প্রকৃতির
নানা অনুষঙ্গকে ছন্দোবদ্ধ রূপে শিশুদের জন্য জড়ো করতেন।
ছড়া লেখার বাইরে তিনি ছিলেন একজন
পরিশ্রমী ও দক্ষ সংগঠক। নিজ জেলা শরীয়তপুর ও সাহিত্যের প্রতি প্রচণ্ড ভালোবাসা
থেকে সে গঠন করেছিল ‘শরীয়তপুর সাহিত্য সংসদ’। তার আপ্রাণ ইচ্ছে ছিল অবহেলিত জনপদ
শরীয়তপুরকে সাহিত্যের মানচিত্রে তুলে আনা, এ জেলার কবি-লেখক-শিল্পীদের
ঐক্যবদ্ধ করা, তাদেরকে এক মঞ্চে সংঘবদ্ধ রাখা।
শরীয়তপুর সাহিত্য সংসদ গঠনের সূত্রেই
তার সাথে আমার প্রথম পরিচয় ঘটেছিল, যদিও আমরা দুজন একই ভূগোলের মানুষ, কিন্তু
আশ্চর্য তার সাথে আমার আগে কখনো দেখা হয়নি। গ্রামের সাথে তার যোগাযোগ ছিল প্রগাঢ়,
বিপরীতে আমার সংযোগ ক্ষীণই বলা যায়। সাহিত্য সংসদের সভাপতি হতে আমাকে আহবান জানায়
সুপান্থ মিজান ও খাদিজা বেগম কান্তা। ওই আহবান আমাকে বিস্মিত করেছিল। আমি জিজ্ঞেস
করেছিলাম, আমি কেন? সুপান্থ মিজান বলেছিল, অগ্রজদের ভেতর আপনার সমকক্ষ মেধাবী লেখক
বিরল। ওই প্রশংসাবাক্য আমাকে খুশি করলেও আমি প্রথমটায় রাজী হইনি এ যুক্তিতে যে
সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড আমার লেখালেখির সময় হরণ করবে। সুপান্থ মিজান আমাকে
আশ্বস্ত করে বলে সাংগঠনিক কাজগুলো সে এবং তার টিমই করবে, আমি থাকব আলঙ্কারিক পদে।
আমাকে অভয় দিয়েছিল মজিবর রহমান ভাই।
শরীয়তপুর সাহিত্য সংসদ গড়ে তোলার
পেছনে সবচেয়ে বড়ো ভূমিকা সুপান্থ মিজানের, সে জেলাটির এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে
ছুটে বেরিয়েছে প্রতিটি থানায় সাংগঠনিক কমিটি দাঁড় করানোর জন্য। তার সাংগঠনিক
দক্ষতা আমাকে রীতিমতো বিস্মিত করে। দেখেছি সে নিজের কারিশমা দিয়ে বেশ কিছু ভক্ত
তৈরি করেছে, যারা তাকে ভালোবাসে ও তার সঙ্গে ঢাকা-শরীয়তপুর এবং শরীয়তপুরের এ
প্রান্ত থেকে ওপ্রান্তে ছোটাছুটি করে। এদের মাঝে রয়েছেন নাজমুল আহসান, খান নজরুল
ইসলাম, স্বপন মাঝি, ইয়াসিন আযীয প্রমুখ কবি-সাহিত্যিকেরা।
সুপান্থ মিজানের সাথে আমার যা কিছু
সংযোগ, যতটুকু ঘনিষ্ঠতা—তা গড়ে উঠেছিল শরীয়তপুর সাহিত্য সংসদ আয়োজিত বিভিন্ন সভা,
অনুষ্ঠান ও উৎসবকে ঘিরে। সশরীরে উপস্থিত হওয়া ছাড়া আমাকে আর কিছুই করতে হতো না।
সভা বা উৎসব মঞ্চে গিয়ে দেখতাম সুপান্থ মিজান ও তার বিশ্বস্ত টিম সবকিছু
চমৎকারভাবে সাজিয়ে রেখেছে। সভা হতো চারিদিকে আঁটকানো মালিবাগের এক ছোট্ট অফিসঘরে,
নয়াপল্টনের এক প্রকাশনা সংস্থার অফিসে। উৎসবের আয়োজন হতো শরীয়তপুর সদরে। মনে পড়ছে
মালিবাগ চৌধুরী পাড়ায় আমরা একটি ইফতারসন্ধ্যায় একত্রিত হয়েছিলাম। আমাদের দুজনের
একজন প্রিয় মানুষ হলেন ছড়াসাহিত্যিক রহীম শাহ। সুপান্থ ছিল তার একনিষ্ঠ ভক্ত।
সুপান্থ মিজানের মাঝে ছন্দের প্রতিভা ও পরোপকারের মানবিক গুণ এসে মিশেছিল।
মাঝে মাঝে শুনতাম সুপান্থ মিজান
চিকিৎসার জন্য চেন্নাই যায়। একবার আমায় বলেছিল রেগুলার চেকআপ করাতে যাচ্ছে। এ বছর
আমি নিজে কয়েকবার বিদেশ গিয়েছি ভ্রমণে, সুপান্থর সাথে যোগাযোগ কমে এসেছিল। তার
একটি ইচ্ছে ছিল, সে বহুবার বলেছেও কথাটা, শরীয়তপুর সাহিত্য সংসদের পক্ষ থেকে
শরীয়তপুর জেলার জীবিত কবি-লেখকদের মাঝে যারা অগ্রগণ্য তাদের সাহিত্য পুরস্কার
দিবে। একই ভূখণ্ডের কিংবদন্তি কবি-লেখকদের নামাঙ্কৃত পুরস্কার। তার ইচ্ছা ছিল
আমাকে পুরস্কৃত করার। সংগঠনের পদে থেকে পুরস্কার নেওয়া শোভন দেখায় না বলে
তার অনুরোধে আমি সভাপতির পদ থেকে সরে যাই। এই সরে যাওয়াটা তার সাথে আমার যোগাযোগ
কমে হওয়ার একটি কারণ। হঠাৎ শুনলাম সে চেন্নাই থেকে চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে দেশে
ফিরেছে। আমাদের সকলের প্রাণে আনন্দ বয়ে গিয়েছিল। সকলের প্রার্থনা ছিল তার আশু
রোগমুক্তির।
আজ দুপুরে (২৯ ডিসেম্বর ২০২৫) সকলকে
শোকগ্রস্ত ও বিমূঢ় করে কবি ও ছড়াকার, সংগঠক ও নেতা, এক অদম্য মনোবল ও প্রাণশক্তির
মানুষ সুপান্থ মিজান অনন্তলোকে পাড়ি জমাল। তার সাথে আর দেখা হবে না ভাবতেই বুকটা
দুমড়ে মুচড়ে যাচ্ছে। অনন্তলোকে ভালো থাকুন, সুপান্থ মিজান। আমার অবহেলাগুলো ক্ষমা
করে দিন।
:::::::
সুপান্থ
মিজানের দৌড়...আমি সময়ের সারথি!!
খান নজরুল ইসলাম
১৮-ই ফেব্রুয়ারি ২০২১ অচেনা নম্বর
থেকে ফোন। আমি ব্যবসায়ী মানুষ ফোন ধরতে না পারলেও পরবর্তীতে কলব্যাক করার অভ্যেস। আমি
কলব্যাক করতেই ওপাশ থেকে ‘সালামালাইকুম ভাই আমি সুপান্থ মিজান ওরফে মিজান মাদবর।’
আমি চিনেছি ভাই, বলুন কী খেদমত করতে পারি? ভাইতো ভালো লিখেন আমাদের শরীয়তপুর
সাহিত্যমনাদের নিয়ে একটি প্লাটফর্ম করলে কেমন হয়? আমি বললাম, মন্দ না! কিন্তু
ইতিমধ্যে শরীয়তপুরে বেশ কিছু সাহিত্য সংগঠন গড়ে উঠেছে আপনি কী ওয়াকিবহাল? ভাই
সবগুলো সংগঠন সম্পর্কে আমি জানি তাদের কার্যক্রমে গতি নেই। আমরা গতিশীল একটা সংগঠন
করতে চাই এবং শরীয়তপুরের সকল সাহিত্যিকদের একটি প্লাটফর্মে নিয়ে এসে আমাদের
আঞ্চলিক সাহিত্যকে সমৃদ্ধি করতে চাই। আমাকে সাক্ষাৎ সিডিউল দিলেন। একদিন পরেই আমি
মৌচাক টাওয়ারে তার অফিসে গেলাম। তার চিন্তা-ভাবনা এবং উদ্দেশ্য ভালো লাগলো।
প্রাণবন্ত এবং উচ্চাকাঙ্খা দেখে মনে হলো তার আন্তরিকতা প্রবল। তিনি থেমে
যাবেন না! সাহস পেলাম! হাতে হাত রাখলাম সাহস দিলাম।
২৬ শে ফেব্রুয়ারি বিকেল চার ঘটিকার
সময় আমরা কয়েকজন একত্রিত হলাম ‘শরীয়তপুর সাহিত্য সংসদ’ নামে আমাদের সংগঠনের যাত্রা
শুরু হলো। খাদিজা বেগম কান্তা আপার প্রস্তাবে সব্যসাচী লেখক কামরুল হাসান ভাইকে
সভাপতি, মজিবুর রহমান ভাই সহ-সভাপতি, সুপান্থ মিজান সাধারণ সম্পাদক, আমাকে সহ-সাধারণ
সম্পাদক দিয়ে কমিটি করা হলো। যদিও আমার ব্যবসা গাজীপুর এবং বাসা উত্তরা (অনেক
দূর) তারপরও আমি না করতে পারালাম না। সাংগঠনিক মানুষ হওয়ার কারণে আমার মনে
হলো আমাদের এই সংগঠন বহুদূর এগুবে। একঝাঁক তরুণ সাহিত্যিক যে মনোবল নিয়ে সংগঠনের
শর্তে শপথ নিয়েছে এদেরকে থামায় কে!?
‘একাই একশো’ শব্দটা শুধু শুনেই এসেছি
সুপান্থকে না পেলে এর বাস্তবতা দেখা হতো না! আমরা একহাত এগুলে তিনি দুই হাত এগিয়ে
থাকতেন। মনবলে, অর্থে, সাহসে, দৃঢ়তায় এবং বিচক্ষণতায় তিনি সেরাদের সেরা! তার
দূরদান্তপণা, নিখুঁত ভাবনা এবং সুস্পষ্ট পদক্ষেপে কখনোই দ্বিমত পোষণ করতে পারিনি।
দারুণ যুক্তিতে আদায় করে নিতেন প্রস্তাবিত কর্মসূচি। সাহিত্যে এতোটা দরদ আমি আগে
কারও দেখিনি। শরীয়তপুর সাহিত্য সংসদকে এগিয়ে নেওয়ার পেছনে সবটুকু অবদান আমি তাকেই
দেবো। আমরা যারা সময়ের সারথি ছিলাম তাদের যতটুকু অবদান সেটাও ওনারই স্পর্শে।
সভাপতি হিসেবে আমরা কবি কামরুল হাসান ভাইকে পেয়ে ধন্য ছিলাম। তার লেবেল অনেক
উচ্চমান, তিনি যথাযথ মোটিভেশান দিতে না পারলেও আমাদের সাথে থেকে সমৃদ্ধ করার
চেষ্টা করেছেন। শরীয়তপুর সাহিত্য সংসদের আজ এক হাজার একশো সদস্য যার ৯০% সুপান্থ
মিজানের সংগৃহীত। কবি অতুল প্রসাদ সেন বিখ্যাত, লেখক আবু ইসহাক আমাদের গর্ব। তাদের
জন্ম এবং মৃত্যুবার্ষিকীর আয়োজন নিয়ে সংগঠনের নিয়মিত প্রোগ্রাম;
বিভিন্ন দিবস আয়োজন কখন কোথায় এবং কীভাবে সবটাই ছিলো তার পরিকল্পনায়। ‘কাব্য মিতালি’, ‘ঢেউ’ পত্রিকা এবং প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীর আয়োজনে তার সাহসী
পদক্ষেপ, দৃঢ়তা এবং বিচক্ষণতায় সফল হয়েছিল।
কবি সুপান্থ মিজান শরীয়তপুরের কবি-সাহিত্যিকদের
এক কাতারে আনার যে প্রচেষ্টা চালিয়েছিলেন কিছুটা হলেও তার সফলতা আমরা স্বচক্ষে
দেখেছি। সুপান্থের মহা পরিকল্পনা ছিলো শরীয়তপুর নিয়ে,যার কিছুটা প্রকাশ আমাদের
সাথে শেয়ার করেছিলো। আমার বিশ্বাস, আল্লাহ তাকে দু’তিন বছর সময় দিলে নিশ্চয়ই তার
প্রতিফলন আমরা দেখতে পারতাম। পিতা মাতা হারানোর কষ্ট নিয়ে তাকে হারানোর কষ্ট সহ্য
করছি!
এই ভীষণ যন্ত্রণা থেকে শপথ নিয়েছি
আমাদের সুপান্থ মিজানকে চিরস্থায়ী করতে যা যা করার প্রয়োজন আমি তা করবো। সুপান্থ
কেবলই বন্ধু নয়, আমাদের প্রেরণা! আমাদের ঐক্য! আমাদের স্বপ্ন!!
০৪/০১/২০২৬
:::::::::
কবি
সুপান্থ মিজানকে নিয়ে স্মৃতিচারণ
সুলতান মাহমুদ
সুপান্থ মিজান ভাইয়ের সাথে পরিচয় আমার
কলিগ জুয়েল ভাইয়ের মাধ্যমে। জুয়েল ভাই তার বাল্য বন্ধু। প্রথম দেখায় সে
জানালো সে ঢাকায় থাকে। দেশের লেখকদের তেমন চিনেন না। কিনি শরীয়তপুর সাহিত্য
সংসদ নামে একটা সংগঠন গড়তে চান যেখানে ঢাকায় অবস্থানরত ও গ্রামে বসবাসরত
শরীয়তপুরের সাহিত্যিকরা থাকবেন। আমি তাৎক্ষণিক কয়েকজন কবির সাথে তাকে পরিচয় করিয়ে
দিলাম। এরপর তিনি তার অসাধারণ সাংগঠনিক দক্ষতায় অতি অল্প সময়ের মধ্যেই শরীয়তপুরের
সকল সাহিত্যিকদের সাথে পরিচিত হয়ে গেলেন। তাদের নিয়ে গড়ে তোলেন ‘শরীয়তপুর সাহিত্য
সংসদ’ নামের একটি সংগঠন। আমাকে তিনি এ সংগঠনের সাংগঠনিক সম্পাদকের দায়িত্ব প্রদান
করেন। যদিও চাকরির ব্যস্ততায় সে দায়িত্ব আমি সঠিকভাবে পালন করতে পারিনি। তিনি খুব
সহজেই মানুষের সাথে মিশতে পারতেন। বাঙালীরা সংগঠন প্রিয় না। তার মধ্যে কবিরা
আরও সংগঠন বিমুখ। কিন্তু কবি সুপান্থ মিজান এ কথাটি মিথ্যা প্রমাণ
করেছিলেন। সংগঠন নিয়ে লেগে থাকার মানসিকতা আমাকে বিস্মিত করতো। শরীয়তপুরে এলে
আমার সাথে দেখা করতো। নানা বিষয়ে পরামর্শ করতো। আমি ঢাকার মগবাজারে কয়েকটি
প্রোগ্রামে অংশগ্রহণ করেছিলাম। তিনি শরীয়তপুরের সাহিত্যাঙ্গনে একটা প্রবল ঝাঁকুনি
দিয়েছিলেন। একটা জনপদের ঘুমিয়ে পড়া কবি সাহিত্যিকদের জাগিয়ে তুলেছিলেন। সবাই
জানত শরীয়তপুরে কবি-সাহিত্যিক কম। এখানে তেমন সাহিত্যচর্চা হয় না। এ ধারণাকে তিনি
ভুল প্রমাণ করেছিলেন। তার সম্পাদিত ‘কাব্য মিতালী’ শরীয়তপুরের লেখকদের একটি
অনন্য স্মারক। তিনি ‘ঢেউ’ পত্রিকার মাধ্যমে অনেক নতুন নতুন লেখক তৈরির
প্রকল্প হাতে নিয়েছিলেন। স্কুল ও কলেজ পর্যায়ের শিক্ষার্থীরা লেখালেখিতে
উৎসাহিত হচ্ছিল। সাংগঠনিক সত্ত্বা ছাপিয়ে তিনি ছিলেন একজন সফল ছড়াকার।
বাংলাদেশের বিভিন্ন পত্রিকায় তার অসংখ্য ছড়া প্রকাশিত হয়েছে। তার ছড়ার গাঁথুনি
ছিলো অত্যন্ত চমৎকার। তার এ আকস্মিক প্রস্থান শরীয়তপুরের সাহিত্যের জন্য এক
অপূরণীয় ক্ষতি। এমন সংগঠক কালেভদ্রে জন্মায়। তার নাজাতের জন্য মহান প্রভুর
দরবারে প্রার্থনা করছি। যেখানেই থাকুন ভালো থাকুন।
:::::::::::
হারিয়ে গেলো
ভাইটি আমার
নজরুল ইসলাম শান্তু
(শিশুসাহিত্যিক, ছড়াকার সুপান্থ মিজান
স্মরণে)
মিজান নামে আমার একটা হাসিখুশি ভাই ছিল
ভাইটি আমার কাব্য ছড়ায় দেশ সাজাতে চাইছিল।
পত্রিকার ঐ শিশু পাতায় ভাইটি আমার মাতছিল
লেখালেখির সরল পথে তার যে দারুণ হাত ছিল।
বক্তৃতা আর গল্প বলায় বুদ্ধিদীপ্ত সাজ
ছিল
শরীয়তপুরকে ফ্লাশ ঘটানোই তার যে মহৎ কাজ
ছিল।
মাঝে মাঝে আমার সাথে অভিমানের সুর ছিল
অভিমানটা কেটে গেলেই দুষ্টুমী ভরপুর ছিল।
সে ভাই আমার হারিয়ে গেলো দাঁড়িয়ে গেলো
লেখায়
অভিমানী ভাইটি আমার ফিরবে না আর দেখায়।
করবে না ফোন রাখবে না খোঁজ শান্তু ভাইয়া
ডাকে...
দোয়া করি আল্লাহ যেন বেহেস্ত দেন তাঁকে।
::::::
তোমার চলে
যাওয়ার বিরুদ্ধে
স্বপন মাঝি
তুমি চলে গেলে—
কিন্তু মৃত্যুটা একা যায়নি,
সে আমার বুকের ভেতর
একটা অচেনা দেশ রেখে গেছে
যেখানে প্রার্থনা আর প্রতিবাদ
একই ভাষায় কথা বলে।
বন্ধু,
তোমার শরীরকে যে ক্যান্সার গ্রাস
করেছিল
সে কি জানত
তোমার ভেতর বাস করত
একটি আকাশ—
যে আকাশকে কোনো কোষ
পরাজিত করতে পারে না?
আমি ঈশ্বরের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন
ছুঁড়েছি,
কিন্তু প্রশ্নগুলো ফিরে এসেছে
ফুলের মতো নীরব হয়ে।
আজ আমি বুঝি—
নীরবতাও এক ধরনের উত্তর,
আর উত্তরও কখনো কখনো
অসহ্য পরিমাণ সত্য।
তোমার মৃত্যুর দিন
আমি মানুষ হওয়া থেকে পদত্যাগ
করেছিলাম।
কারণ মানুষ হলে কাঁদতে হয়,
আমি কাঁদতে চাইনি—
আমি বিদ্রোহ করতে চেয়েছিলাম।
আমি বলেছিলাম—
যে পৃথিবী ভালো মানুষকে
এত তাড়াতাড়ি তুলে নেয়,
সে পৃথিবী আমার নয়।
কিন্তু পৃথিবী হেসে বলল,
তবুও তুমিই আমার সন্তান,
কারণ তুমি প্রশ্ন করো।
বন্ধু,
তুমি এখন যেখানে আছ
সেখানে কি ব্যথা আছে?
নাকি ব্যথারও মৃত্যু হয়
একটি দীর্ঘশ্বাসে?
তোমার না থাকা আমাকে শিখিয়েছে—
শোক মানে দুর্বলতা নয়,
শোক মানে ভালোবাসার
সবচেয়ে সাহসী রূপ।
আজ আমি তোমার কবরকে
ফুল দিই না,
আমি সেখানে রেখে আসি
আমার অহংকার,
আমার নিশ্চিন্ত বিশ্বাস,
আর সেই পুরোনো ধারণা—
যে জীবন প্রাপ্য।
যদি আবার দেখা হয়, বন্ধু,
আমি তোমাকে জড়িয়ে ধরব না।
আমি শুধু বলব—
দেখো, তোমার মৃত্যুর পর
আমি ভেঙে পড়েছিলাম,
সেই ভাঙনের ভেতর দিয়েই
আমি মানুষ হতে শিখেছি।
আর যদি দেখা না হয়—
তবু জেনো,
আমার প্রতিটি দ্রোহী শ্বাসে
তোমার নাম উচ্চারিত হয়
নীরবে, প্রার্থনার মতো।
::::::::
শরীয়তপুর
সাহিত্যের প্রাণকেন্দ্র (সুপান্থ মিজান)
জান্নাতুল ফেরদৌস মুক্তা
সুপান্থ—‘সু’
ভালো, ‘পান্ত’ পথ,
দেখাতেন সাহিত্যের দীপ্তি, জীবনকে
দিয়ে নতুন দিশা।
যার ছড়ায় শিশুর মুখে ফুটত হাসি,
আজ সেই ছড়াকার নেই, নিঃশব্দে কাঁদে
মনবাসি।
যার মাধ্যমে পরিচিত হলাম গুণীজনের
সঙ্গে,
শিখেছি সাহিত্যের সু-পথ,
জ্ঞান-বিজ্ঞানের রঙ্গে।
লেখকদের একত্রিত করার কারিগর ছিলেন
তিনি,
তরুণদের দেখাতেন পথ, সাহসের আলো ছড়িয়ে
যিনি।
প্রতিবছর মেতে উঠতেন সাহিত্য
প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী আয়োজনে,
সাহিত্যচর্চার অনুপ্রেরণা জাগিয়ে
তুলতেন সবার মনে।
‘কাব্য মিতালী’র মাধ্যমে রেখে গেছেন
কত শত স্মৃতি,
শব্দের আসর, গল্পের সন্ধ্যা—সবই
রয়ে গেছে—নিতি।
তার নামের মতোই দেখাতেন সাহিত্যের
সঠিক পথ,
সকলকে শিখিয়েছেন, নেতৃত্ব দিয়েছেন,
ছড়িয়ে দিয়েছেন ভালোবাসার আলো।
শব্দের মানুষ কখনো মরে না,
তারা বেঁচে থাকে সকলের হৃদয়ে।
যে মানুষটি দেখিয়েছে পথ, দাওয়াত
দিয়েছে লিখতে,
তার ভালোবাসা ও জ্ঞান চিরকাল আমাদের
সাথে থাকবে সত্যে।
তাঁর স্মৃতি, তার আদর্শ, প্রেরণা
আমাদের পথপ্রদর্শক,
সুপান্থ মিজান—শরীয়তপুর
সাহিত্যের চিরন্তন জাদুকর।
স্মৃতিচারণে আজ ভেসে আসে তার স্মৃতি,
শরীয়তপুর সাহিত্য সংসদের অমলিন প্রাণ।
লেখকদের মনে থাকবেন চিরকাল প্রেরণার
আলো হয়ে,
পথ দেখাবেন সবার জন্য, স্মৃতিতে বেঁচে
থাকবেন অনন্তকাল।
(২ জানুয়ারী, ২০২৬)
:::::::
একটা মানুষ
ইব্রাহিম খলিল
একটা মানুষ ভোরের আলো গায়ে মেখে চলে
আশার কথা, আলোর কথা কাব্য ছড়ায় বলে।
কষ্ট বুকে চেপে রেখে সব মানুষকে হাসায়
একটা মানুষ ছন্দ স্রোতে ছড়ার জগৎ ভাসায়।
একটা মানুষ শব্দ শ্রমিক, শব্দ নিয়েই খেলা
অন্ত্যমিলে শব্দ গেঁথে কাটায় সারা বেলা।
বাংলা ভাষার বিশ্বায়নে ঢালে মেধার শ্রম
সেই মানুষটার বুকের ভেতর তিব্র কঠিন দম।
একটা মানুষ আসর গড়েন কাব্য যেথায় মূল
সেই আসরে ছড়ার পাখির নিত্য হুলস্থুল।
নিত্য নতুন কাব্য রচেন আসর জুড়ে তার,
নবীন প্রবীণ লিখিয়েদের নিত্য সমাহার।
সাংগঠনিক দক্ষতাতে ভীষণ রকম পাকা
নিপুণ হাতে যায় চালিয়ে সংগঠনের চাকা।
দেশের প্রতি জেলার প্রতি বুকের ভেতর টান
ডামুড্যাতে জন্ম নেয়া সুপান্থ মিজান।
::::::::::
স্মরণে
সুপান্থ মিজান
সানজিদা মিম
শরীয়তপুরের মাটিতে আজ নেমেছে নীরবতা,
একটি কলম থেমে গেল, স্তব্ধ হলো কবিতা।
যে কণ্ঠে জেগে উঠত গ্রাম, মানুষ আর
স্বপ্ন,
সে কণ্ঠ আজ মিশে গেছে মাটির গভীর অন্তরে।
হিজলফুলের ঘ্রাণে ঘ্রাণে লিখেছিলে
জীবন,
ছড়ার ভেতর লুকিয়ে ছিল মানুষের আপনজন।
সহজ কথায় বলেছিলে জটিল সব ব্যথা,
নরম শব্দেই ফুটিয়ে তুলতেন কঠিন
সত্যতা।
আজ ছড়াগুলো পড়ে থাকে চোখের জলে ভিজে,
পাতার কোণে কাঁপে তারা—কবি
কোথায় গেছে?
কলম ডাকে, খাতা ডাকে, উত্তর আসে না,
শব্দগুলো অনাথ হয়ে তাকিয়ে থাকে
চুপচাপ।
তুমি ছিলে মাটির কবি, মানুষের পাশে,
শব্দে শব্দে গড়েছিলে আলোর আবাসে।
আজ তুমি নেই—তবু
আছো প্রতিটি পঙ্ক্তিতে,
শ্বাস হয়ে বেঁচে থাকো বাংলা কবিতাতে।
মরোনি তুমি, কবি—মরে
না সৃষ্টির প্রাণ,
নাম হয়ে বেঁচে থাকবে ‘সুপান্থ মিজান’।
:::::::::
:::::::::::
সুপান্থ
মিজান এর সাথে আমার যেভাবে পরিচয়
ইয়াসিন আযীয
বর্তমানে কবি সাহিত্যিকদের মধ্যে কম
করে হলেও প্রায় নব্বই শতাংশ অনলাইনের সাথে যুক্ত বলে আমি মনে করি। কিংবা তাদের
প্রকাশিত সাহিত্যকর্ম যে সকল পত্র পত্রিকায় প্রকাশিত হয় সে সব প্রতিষ্ঠানও। ফলে
সবার লেখা, সবাই দেখার এবং পড়ার সুযোগ আমরা সহজেই পাচ্ছি। ছড়াকার ও কবি সুপান্থ
মিজান এর ছড়া-কবিতা প্রায় নিয়মিতই প্রকাশিত হতো বিভিন্ন পত্রিকায়। ফলে সুপান্থ
মিজান নামের একজন ভালো ছড়াকারকে আমি চিনতাম এবং সে আমার ফেসবুক ফ্রেন্ডও ছিল।
একদিন সুপন্থ নিজান আমাকে মেসেঞ্জারে মেসেজ করে বলেন ‘সে আমার সাথে কথা বলতে চান।’
আমি সম্মতি জানালে কল করে সে। ব্যক্তিগত পরিচয়ে সুপান্থ মিজান আমাদের শরীয়তপুর
জেলার মানুষ জানালে আমি অনেকটাই বিস্মিত হই। কারণ যার লেখা নিয়মিত পড়ি এবং আমার
ফেসবুক ফ্রেন্ড লিস্টে আছে অথচ আমি জানি না সে আমার জেলাই সন্তান। যাই হোক প্রথম
দিনেই তিনি তার প্রাণের সংগঠন ‘শরীয়তপুর সাহিত্য সংসদ’ গড়ার বিষয়ে ইচ্ছের কথা
ব্যক্ত করেন এবং এই ক্ষেত্রে শরীয়তপুরের কবি সাহিত্যিকদের নামের তালিকা এবং ফোন
নম্বর চান। শরীয়তপুরের যে সকল কবি সাহিত্যিক আমার পরিচিত ছিল তখন আমি তাদের
সম্পর্কে বলি, যাদের ফোন নম্বর ছিল তাদের নম্বর দেই এবং অনেকের ফেসবুক লিংক পাঠাই
যেন সে যোগাযোগ করতে পারে। পরিশেষে তাকে আমি লোকজ গবেষক শ্যামসুন্দর দেবনাথ স্যারের
কথা বলি—যার কাছে শরীয়তপুর
জেলার অধিকাংশ কবি সাহিত্যিকদের নাম ঠিকানা এবং মোবাইল ফোন নম্বর রয়েছে।
সম্ভবত শ্যামসুন্দর দেবনাথ স্যারের
বাসায় সুপান্থ মিজানের সাথে আমার প্রথম সাক্ষাৎ হয়। সেখানেও সংগঠন এবং শরীয়তপুরের
কবিদের নিয়ে একটি কবিতা গ্রন্থ প্রকাশের ইচ্ছা ব্যক্ত করে সে। এরপর থেকে তার সাথে
বিভিন্ন বিষয়ে মৃত্যুর কিছুদিন পূর্ব পর্যন্ত নিয়মিত যোগাযোগ হতে থাকে—ফোনে, ম্যাসেঞ্জারে এবং ম্যাসেঞ্জার
গ্রুপে। তার সংগঠনের গুরুত্বপূর্ণ পদেও রেখেছিলেন আমাকে। কিন্তু আমি আমার দায়িত্ব ঠিক মতো পালন করতে পারিনি কখনো! আমি তার সংগঠন কতৃক
আয়োজিত অনুষ্ঠানে এবং ‘ঢেউ’ এর প্রকাশনা উৎসবের শরীয়তপুর কেন্দ্রিক সকল অনুষ্ঠানে
যোগদান করার চেষ্টা করেছি। ‘ঢেউ’ এর সবগুলো সংখ্যায় আমার লেখা সে রেখেছিল।
কাব্য মিতালি ছিল সুপান্থ মিজানের
অন্যতম সেরা কাজ। কাব্য মিতালির আগে শ্যামসুন্দর দেবনাথ স্যার একটি গ্রন্থ প্রকাশ
করেন শরীয়তপুরের কবি সাহিত্যিকদের নিয়ে। সেটার থেকেও শরীয়তপুর জেলার বেশি সংখ্যক
কবি সাহিত্যিকদের একত্রিত করতে পেরেছিল সুপান্থ মিজান। যা শ্যামসুন্দর দেবনাথের
গ্রন্থের সাথে সমানভাবে শরীয়তপুরের কবিতার ইতিহাসে সমাদৃত হবে।
যাই হোক কবি সুপান্থ মিজান আমাকে সব
থেকে বেশি অবাক করে দিয়েছিল গত বছর। ১০ জানুয়ারি আমার সার্টিফিকেট অনুযায়ী জন্ম
তারিখ। গত বছর ১০ জানুয়ারি সকালে সে আমাকে ফোন দিয়ে জানতে চাইল আমি বাসায় আছি
কিনা। আমি বাসায় ছিলাম। কিছুক্ষণ পর ফোন করে বলল একটু দুবাই প্লাজার সামনে আসুন।
দুবাই প্লাজার সামনে গিয়ে আমি বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেলাম! কবি সুপান্থ মিজান, কবি
স্বপন মাঝি, কবি খান নজরুল ইসলাম, আমার বন্ধু কবি পি. এম. ওয়ালিদ এবং কবি সুপান্থ
মিজানের বন্ধু ও শরীয়তপুর ডিসি অফিসের স্টাফ জুয়েল ভাই আমার জন্মদিনের শুভেচ্ছা
জানাতে ফুল হাতে দাঁড়িয়ে আছে...। আরো অনেক স্মৃতি, অনেক কথা রয়েছে যা হয়তো মনে
পড়ছে না এই মুহূর্তে; কিংবা লেখার মতো না, বলার মতো না। পরিশেষে বলব—যেখানে থাকুক ভালো থাকুক, তার বিদেহী
আত্মা।
এবারের কনকনে শীতে ফুল হাতে
আসবে না আর কবি সুপান্থ মিজান
আমার জন্ম তারিখ আসবে যাবে
থাকবে সেই দিনটা স্মৃতিতে অম্লান
কত কবি লিখবে কবিতা পত্রিকার পাতায়
...ধুলো জমেছে আপনার কবিতার খাতায়
আপনার মতো করে কবি, কেউ পারেনি
কবি-সাহিত্যিকদের গাঁথতে এক সুতায়
শরীয়তপুর জেলার সাহিত্য জগত তাইতো
আপনাকে স্মরণ করে প্রতি সাহিত্য আড্ডায়...
