লতিফ জোয়ার্দার:: একজন কবিতা বৈচিত্রের রূপকারের নাম

লতিফ জোয়ার্দার:: একজন কবিতা বৈচিত্রের রূপকারের নাম

ইয়াসিন আযীয

 

ছবি: আর. করিম এর স্কেচ অবলম্বনে

নিয়মিত পত্র-পত্রিকা পড়ার সুবাদে আমার পরিচিতই ছিল নামটা। ফেসবুকের কল্যাণে একদিন তিনি আমার বন্ধু হয়ে গেলেন। তবে সেটা ভার্চুয়াল ফ্রেন্ড। তাঁর বন্ধু হওয়ার মতো যোগ্য বা বয়সী আমি নই।

 

এ বছরের শুরুর দিকে (মার্চ ২০১৯) রাজশাহীতে অনুষ্ঠিত একটি বইমেলায় তিনি তাঁর কিছু বই নিয়ে অংশগ্রহণ করেছিলেন। সেখান থেকে ফেরার পর তাঁর অবিক্রিত কিছু বই সম্পর্কে ফেসবুকে তিনি একটি পোস্ট দেন। জানতে চান ‘নির্বাচিত ১০০ কবিতা’ বইটি কেউ কিনতে আগ্রহী কিনা। যার মূল্য ১৫০ টাকা। আমি কিনতে আগ্রহ প্রকাশ করি। মাত্র দেড় টাকার বিনিময়ে একেকটি কবিতা আর একজন কবির বাছাই করা সেরা কবিতা পড়ার সুযোগ পাবো ভাবতেই রোমাঞ্চিত হই। সাথে সাথে অর্ডার করে বিকাশে টাকা পাঠিয়ে দিলাম। অনেক দিন হয়ে গেল বইটা হাতে পেলাম না তাই কবির সাথে যোগাযোগ করে জানতে পারলাম তিনি অসুস্থ। তাই আর তাড়া দিলাম না। বললাম ‘আপনি আগে সুস্থ হন তারপর ধীরে-সুস্থে বইটা পাঠান’ সমস্যা নেই। এর কিছুদিন পরেই কাঙ্ক্ষিত বইটি পৌঁছালো আমার ঠিকানায়। প্যাকেট খুলে দেখি দুটো বই। একটি আমার অর্ডার করা। আরেকটি কবির লেখা একটি গল্পের বই নাম ‘প্যারিস রোড’। আমি খুশিতে আটখানা একটির সাথে আরেকটি ফ্রি পেয়ে। আসলে কবিরা এরকমই হন। একেবারে অন্যরকম মনের মানুষ। তাঁদের কাছে টাকা-পয়সা বড় কোনো ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায় না কখনো।

 

হাতে পেয়েই পড়তে শুরু করলাম ‘নির্বাচিত ১০০ কবিতা’ লতিফ জোয়ার্দার। ভাসা ভাসা কয়েকটি কবিতা পড়ে আর পড়া হল না বিভিন্ন কারণে। যতটুকু পড়েছি তাতে করে কবিতাগুলোর মান সম্পর্কে: ভালো-মন্দ কোনোটাই মনে হয়নি। বা মনে হয়নি বইটি কিনে অযথাই পয়সা খরচ করেছি। কিন্তু দীর্ঘদিন পর আবার আমার স্বভাবসুলভ পড়া পড়তে শুরু করলাম। এখানে বলে রাখছি আমার স্বভাবসুলভ পড়া মানে, আমি কোনো বই পড়া শুরু করি শেষ পৃষ্ঠা হতে। সেটা কেন করি আমি জানি না। ১০০ তম কবিতাটি দিয়ে নতুন পাঠ শুরু করলাম। মনোযোগ সহকারে ১০০, ৯৯, ৯৮... এভাবে এক একটি কবিতা একাধিকবার পড়ে ৯২ তম কবিতায় এসে প্রথম থামলাম। কেন থামলাম সে কথায় পরে আসি। আমার পড়া প্রথম তথা ১০০ তম কবিতা পড়েই মনে হয়েছিল আমি পুরো বইটি না কিনে এই একটি কবিতাই যদি ১৫০ টাকার বিনিময়ে কিনতাম তাহলেও আমার কোনো লস হতো না। মাত্র একটি কবিতাতেই আমার পয়সা উসুল হয়ে যেত।

 

এবার আসি ‘মৃত্যু’ কবিতায়, যেখানে আমি প্রথম থেমেছিলাম এই কবিতার শেষ চার লাইনে কবি বলেছেন:

‘যেদিন আমার মৃত্যু হবে

আমাকে দেখার সব আয়োজন শেষে

তুমি জানবে

আমি নই, মরে গেছে আমার ছায়া।’

 

আসলেই তাই; কবির মৃত্যু নেই। মৃত্যু হয় তার বাহ্যিক অবয়বের। কর্মই কবিকে বাঁচিয়ে রাখে শত সহস্র বছর। ‘পদভারে পিষ্ট ঘাসের মত কোনো স্মৃতিতে নেই কোনো বিস্মৃতিতে নেই। কিংবা তীব্র যন্ত্রণার আগুনে পোড়া ক্ষত চিহ্নগুলো রক্তশূন্য করে চলছে ধমনীকে। গভীর দুঃখগুলো সমান্তরাল রেললাইনের মতো চলে গেছে দূরের কোনো এক নগর ছুঁয়ে। অথবা সবকিছুই যেন পরিত্যক্ত উঠোন, দূর্বাঘাসে ছেয়ে গেছে।’ এরকম চমৎকার সব উপমায় গ্রথিত কবিতার বুননের খাড়া ঢাল বেয়ে, সাবধানে উপর থেকে নিচে নামতে থাকি আমি। কিছু কিছু কবিতা কিংবা লাইন দুই থেকে তিনবারও পড়েছি কখনো কখনো। প্রতিটি কবিতা একটি থেকে আরেকটি আলাদা বিষয়ে ও স্বাদে।

 

তাঁর কবিতায় পরিলক্ষিত হয় প্রেম-ভালোবাসা, হতাশা-দ্রোহ, স্বপ্নের ভাঙাগড়া অসাধারণ চিত্রকল্প। আছে যাপিত জীবনের প্রতিচ্ছবি। দিনবদলের যে পালা আমাদের সমাজে, দেশে। যে পরিবর্তন প্রকৃতিতে ‘একা থাকা পাখিদের গল্প’ কবিতায় আমরা সে ছবিই দেখতে পাই।

 

তার কবিতাগুলির অনেকটা জুড়ে হতাশার দীর্ঘশ্বাস বারবার কষ্টের কাজল হয়ে লেপ্টে রয়েছে বা ফিরে এসেছে পাওয়া না পাওয়ার দোলাচলে। ‘কোনো এক সোমবার আসবে বলেছিলে অথচ এলে এই বৃহস্পতিবারে। ... শুধুমাত্র তোমার হাত ছুঁয়ে দেবার জন্যই আজও আমি হস্তরেখাবিদ।’ অথবা ‘দিন শেষে রাত্রি আসে বেদনা কুড়াতে। দিনলিপির উপর কিছু ময়লার আস্তরণ পড়ে আছে অজান্তে একাকী একা প্রতিনিয়ত সর্বগ্রাসী নদীর মত আমাকে ভেঙে চলছে সহায়-সম্বলহীন উদ্বাস্তুর মত। একটু ভালোবাসার জন্য একদিন চুপিচুপি তোমার হাতে সঁপে দিয়েছি ভবিষ্যৎ।’ তাঁর কাছে মন এক বেদনার কারখানা যেখানে থাকে ব্যাকুল দীর্ঘশ্বাসের অদ্ভুত তন্ময়তার ঘোর। তাইতো শাশ্বত ভালোবাসার জন্য সব আকুলতা ধরে রেখে প্রতিদিন ছুটে চলা অনাগত দীর্ঘশ্বাসের কাছে। যেখানে গাঢ় গভীর অন্ধকার প্রতিদিন যন্ত্রণার তীব্র আঘাত আর প্রতিদিন আহত কান্নার ধ্বনিতে জেগে ওঠে। পাশাপাশি আছে দ্রোহের অভিমান। যে পুঞ্জীভূত অভিমান নিয়ে নদীর স্রোতগুলো সমুদ্রে গড়ায়।

 

আমাদের সকল সম্ভাবনা যখন পতিত ও মিথ্যা প্রলোভনের। রাজনীতির করালগ্রাসে তলিয়ে যায়। সেই তলিয়ে যাওয়ার মাঝেও 'যেখানে ঈশ্বর ছিল' কবিতায় একজন গুলিবিদ্ধ ব্যক্তিকে রেখে সবাই পালিয়ে গেলেও তাকে গামছা পেঁচিয়ে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া দুইজন ব্যক্তির চারটি হাতের মাঝে কবি ঈশ্বরকে দেখতে পান। যা আমাদের আশান্বিত করে। আরও আশান্বিত করে ‘জলের মজুদদারি’ কবিতা: নদীর জল তারও মজুদদারি হয়, বাঁধ হয় নদীর গতিপথে। কাঁটাতারের বেড়ার জালে বন্দি হয় উড়ার স্বাধীনতা। আমি লাল নিশান উড়িয়েছি চৌচির মাটির জন্য জল আনবো বলে। তৃষ্ণায় বুক ভাঙবে না আর জলপাখি আসবেই ভিজবে আনন্দধারায়। তবুও ‘বৃক্ষের চোখ’ কবিতায় যখন উঠে আসে পৃথিবী জুড়ে ক্ষমতাধরদের দুর্বলের উপর বীভৎস বর্বরতা, অদ্ভুত আগ্রাসন-নিপীড়ন এবং ক্ষুধার্ত শিশুর জলের বদলে আঙুল চুষে রক্ত পানের বিভীষিকাময়তার কথা। তখন স্থির থাকা বড় কষ্টের হয়ে দাঁড়ায়! তাই এর পরই পড়ে নিতে হবে একদিন চৈতন্যে যারা এঁকেছিলো করতালি:

 

চড়া সুদের কারবারিদের সামনে দাঁড়িয়ে বলতে পারি। এখনো ‘তবুও আজ এই উচ্চমূল্যের বাজারে দাঁড়িয়ে বলতে পারি। এই আমাদের রক্তমাখা সততা আছে। এখনো আমাদের আলিঙ্গনের আঁধার চিরে আলোর পাহাড় জেগে ওঠে। আমি আমাদের জাতিসত্তার নরম কাদার ভেতর দিয়ে হেঁটে চলি রোজ আর সাগরের জরায়ুর মুখে ছড়িয়ে দেই আমাদের সবুজ বিশ্বাস’ এই সবুজ বিশ্বাস আমাদের সবুজ পৃথিবী গড়ার আশা জাগায়।

 

পুরনো খবরের কাগজের মত যত্নে রাখা ভালোবাসা দেবার জন্য উদাসী আকাশ ভেঙ্গে নীল সীমানার ওপার থেকে নিয়ে আসতে পারেন তিনি রাশি রাশি প্রেম। তাইতো "এখন আমি বিপ্লবী নই" কবিতায় এমনি সাহসী উচ্চারণ:

‘যদি বলো তোমার সামনে নতজানু হবো

এই বুক পেতে দেবো সব সৌন্দর্যের কাছে

চুপিচুপি মুখ রেখে বলবো, এই এখানেই প্রেম

এখানেই ভালোবাসা। বাদবাকি সব মিছে, সব

কেবলি চিরন্তন দহন আর ধোঁয়াশা।

যদি সাজা দাও তবুও বলবো আমি। কোন

কিছু চাই না তোমাকে ছাড়া। ভালোবাসা অনন্ত

আকাশের মত চির জাগানিয়া। যদি বলো...’

 

কিংবা বলতে পারেন ‘তোমার জন্যই বিশ্বসংসারের সব প্রলোভন ফিরিয়ে দিতে পারি’র মতো অসংখ্য এমনি চিরায়ত প্রেম-ভালোবাসামাখা প্রণয়ী চরণগুচ্ছ।

 

জোয়ার্দারের অনেক কবিতায় আমরা গল্পের মত বাঁক বদলও দেখতে পাই। ‘দীর্ঘ সময়ের আগুন’ কবিতার প্রথম স্তবকে শিশু আগুন-পানি-ফুলের মাঝে যেমন পার্থক্য বোঝে না দেখলেই খুশিতে ঝাঁপিয়ে পড়তে চায়। একই কবিতার পরবর্তী স্তবকে কবি অন্য এক আগুনের কথা বলেছেন যা প্রথম স্তাবক থেকে একেবারে বিপরীতধর্মী।

 

পাশাপাশি তাঁর কবিতার মাঝে নিজস্বতা খুঁজে পাওয়া যায়। পুরোপুরি না হলেও অনেকটাই নিজস্ব একটি স্টাইল দাঁড় করানোর প্রচেষ্টা দেখতে পাই। দেখতে পাই স্বপ্নের ভাঙাগড়ার অসাধারণ চিত্রকল্পের দৃশ্য। স্বপ্ন ভাঙার গান, এই নিসর্গে বেঁচে আছি এবং ঘুমসেতু কবিতায় যা দেখতে পাই। তাইতো কবি লেখেন: ‘পুরাতন কাগজের মত ছিঁড়ে ছিঁড়ে স্বপ্ন হারিয়ে যায় প্রতিদিন/ঝরে পড়া সজিনাপাতার মতো আমার চারপাশ থেকে।’ কিংবা ‘ভেজা মেঘের মতো আর নিজেকে সামলাতে পারি না। বৃষ্টির মতো ঝরে পড়ি, হয়তো কিছুটা হালকা হব বলে।’ এই ভাঙাগড়া খেলার মাঝে ‘জুলফিকার’ কবিতার মতো কিছু কবিতায় যাপিত জীবনের গল্পের প্রতিচ্ছবি দেখতে পাই। যে গল্পের মানুষগুলো বিষণ্ণতার তাবুর ভেতর দীর্ঘশ্বাস ছুঁয়ে ছুঁয়ে মোমের পুতুল হয়ে দ্রোহের আগুনে পুড়ে বিবর্ণ বর্ণহীন অনিশ্চয়তার পথে ক্রমশ অস্পষ্টতার দিকে ধাবিত হয়। এর পাশাপাশি আছে বিশ্বাস আঁকড়ে ধরে বেঁচে থাকার প্রয়াসও।

 

এভাবে ‘বাংলাদেশ’ কবিতাটি পাঠের মধ্য দিয়ে নির্বাচিত ১০০ কবিতার প্রথম কবিতাটি তথা এ-যাত্রায় আমার পঠিত শেষ কবিতাটি পাঠ সম্পন্ন করলাম। পড়া শেষে মনে হলো অনেক কিছু পেয়েছি। তারপরেও কী যেন পাইনি। কিসের অভাব যেন টের পেয়েছি ক্ষণে ক্ষণে। হয়তো আমি যা খুঁজেছি, তা আছে। যা খুঁজে পেতে হলে সচেতন ভাবে কবিতার আরও গভীরে যেতে হবে। তবেই হয়তো খুঁজে পাবো কাঙ্ক্ষিত বা অধরা বস্তুটি। তবে আমার মতো পাঠককে সেই না পাওয়া বস্তুটির খোঁজে বার বার ডুব দিতে হবে জোয়ার্দারের কবিতায়। কানে কানে বলি আমাকে ঠিকই পুনরায় আরও একবার ফিরতে হয়েছিল জোয়ার্দারের কবিতায়। এটাই তাঁর কবিতার বড় সার্থকতা।

 

শেষে আবার সেই ফেসবুকে ফিরে আসি। যেখানে কবির সাথে আমার প্রথম পরিচয় হয়েছিল। প্রায়ই তার ফেসবুক পেইজে আমি হতাশাজনক লেখা দেখতে পাই। আমার ধারণা এর মূল কারণ আমরাই। কারণ তাঁর মত একজন বহুমাত্রিক লেখককে সেভাবে মূল্যায়ন করতে পারিনি। যদি আমার ধারণা ভুল না হয় তবে তার দায় আমাদেরই। ভবিষ্যতে আমরা তাঁর সঠিক মূল্যায়ন করতে পারবো এ-ব্যাপারে আমি আশাবাদী। কারণ কবিদের চাওয়া তো খুব বেশি নয় যৎসামান্য! ‘বৃক্ষের ছায়া’ কবিতায় যেমনটি দেখি আমরা: ‘আমার সকল আকুলতা আমার সকল প্রার্থনায় কোন চাওয়া নেই কেবলই একটা বৃক্ষের ছায়া হতে চাই। সমুদ্রের পাড়ের শীতল বাতাস হতে চাই। আর মৃত মাছ হতে চাই। অথবা ‘নিরন্তর ভাসতে ভাসতে অবেলায় হারাতে চাই। যেমন করে আকাশে মেঘ হারায়।’

 

আর আমরা যদি কবিকে সঠিক মূল্যায়নে ব্যর্থ হইও তাতে কবির কিছু যাবে আসবে না। তিনি একজন কবি ও কথা সাহিত্যিক। সমাজের একজন অনন্য উচ্চতার মানুষ হিসাবে তাঁর অবস্থান অটুট থাকবে। ‘একদিন জাত কৃষকেরা কাকতাড়ুয়ার হাতে যেভাবে তুলে দিয়েছিল বিশ্বাসের দূরবীন।’ তেমনি তিনি পাঠকের হতে তুলে দিয়েছেন কাব্য সুরভী। ঐশী বাণীর মতো যার কাছে সকাল সন্ধ্যা কবিতা নাযিল হয়। তাইতো তিনি বলে ওঠেন, ‘জলের প্রবাহের মতো আমি ডানাওয়ালা মেঘের কাছে যাই। আমার বুক ভিজে যায়। হৃদয় শীতল হয়। আর মনে হয় আমি কেবলমাত্র কবিতায় যেন বাঁচি, কবিতায় যেন মরি।’


Post a Comment (0)
Previous Post Next Post