কীর্তিনাশা :: শৈশবের নদী
কীর্তিনাশার খোঁজে
ইয়াসিন আযীয
আমাদের
বাড়ির পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া নদীটির নাম ‘কীর্তিনাশা’। পদ্মার অপর নামও কীর্তিনাশা।
রাজা রাজবল্লভের একুশরত্ন বা একুশচূড়াযুক্ত রাজপ্রাসাদসহ রাজনগরের সমস্ত কীর্তি
পদ্মা তার প্রলয়ঙ্করী ভাঙ্গনে ধ্বংস করে বলে
পদ্মা আরেক নাম পায় কীর্তিনাশা। জীবনানন্দের কবিতায়—
‘তবু তাহা ভুল জানি—রাজবল্লভের কীর্তি ভাঙে কীর্তিনাশা:
তবুও পদ্মার রূপ একুশরত্নের
চেয়ে আরো ঢের গাঢ়—
আরো ঢের প্রাণ তার, বেগ তার,
আরো ঢের জল, জল আরো।’
এছাড়াও
বাংলাপিডিয়ার তথ্যে শীতলক্ষ্যার আরেক নাম কীর্তিনাশা পাওয়া যায়। এখানে একটি কথা
বলে রাখা ভালো—পদ্মার গর্ভে বিলীন হওয়া
রাজনগর অনেক পূর্বেই চর হিসেবে জেগেছে এবং অনেক বছর ধরে লোকবসতি গড়ে উঠেছে। তবে
আমি যে কীর্তিনাশার কথা বলতে এসেছি সেটা পদ্মারই একটি শাখা নদী। দৈর্ঘ্য প্রায় ৩৫
কিলোমিটার। (সম্প্রতি কয়েক বছরের পদ্মা নদী ভেঙে দক্ষিণ দিকে প্রবেশ করারয় ওয়াবদা
থেকে নড়িয়া বাজার পর্যন্ত কীর্তিনাশা নদীর চলার শুরুর পথ প্রায় দুই কিলোমিটার
হ্রাস পেয়েছে।) প্রস্থ ১২০
মিটার। গভীরতা ৬ মিটার এবং অববাহিকা ১৫০ বর্গকিলোমিটার। এটি একটি মৌসুমি নদী এবং জানুয়ারি
থেকে মার্চ পর্যন্ত সাধারণত প্রবাহহীন থাকে। তখন অনেক স্থানে নদী প্রায় শুকিয়ে যায়।
তবে বর্ষা মৌসুমে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ পানি প্রবাহ
দেখা যায়। কীর্তিনাশার বয়স ১২০ থেকে ১৩০ বছরের কাছাকাছি। কীর্তিনাশা পদ্মা হতে নড়িয়া
উপজেলা দিয়ে প্রবেশ করে শরীয়তপুর জেলার ঠিক মাঝ দিয়ে সর্পিলাকারে ভোজেশ্বর বাজার
(বন্দর), মুন্সিরহাট হয়ে শরীয়তপুর জেলা শহরকে বামে রেখে রাজগঞ্জ-আড়িগাঁও বাজার,
আংগারিয়া বাজার (বন্দর) দিয়ে, দাদপুর হয়ে সোজা পশ্চিম দিকে মাদারীপুরের রাজারচর এলাকায়
গিয়ে মিশেছে আড়িয়াল খাঁ নদীর ভালোবাসার আহ্বানে। প্রমত্তা পদ্মার জল দ্বারা পুষ্ট
কীর্তিনাশা শরীয়তপুরের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়ার সময় শরীয়তপুরের আদি নদী ‘পালং’ এর কিছু
অংশ এবং ‘নড়িয়া খাল’কে তার বুকে ধারণ করেছে। তারাও কীর্তিনাশার আহ্বানে সাড়া দিয়ে
বিলীন হয়ে যায় আপাদমস্তক। পদ্মা, মেঘনা ও আড়িয়াল খাঁ নদী বেষ্টিত শরীয়তপুর জেলার
ঠিক মাঝখান দিয়ে প্রবাহিত কীর্তিনাশা নদীর বর্ণনা স্থানীয় কবি খান মেহেদী মিজানের
কবিতায় পাওয়া যায়—
১. আমার
বাড়ি শরীয়তপুর পদ্মা নদীর পাড়
মাঝখান দিয়ে বইছে ধারা কীর্তিনাশা তার
২. জলের
কাব্য ফলের কাব্য মুক্ত বাহু বলের কাব্য
আশার
কাব্য ভাষার কাব্য সব কীর্তি নাশের কাব্য
আড়িয়াল খাঁ আর পদ্মার মাঝে
ছোট্ট নদী কীর্তিনাশা
এই নদীর জল সেচের কাজে—ফসল ফলায় গরিব চাষা।
(কবি: খান মেহেদী মিজান)
আমাদের
বাড়ির চারপাশে কীর্তিনাশা অনেকটা সাপের মতো জড়িয়ে ছিল বলা চলে। রাজগঞ্জ-আড়িগাঁও
বাজার থেকে আংগারিয়া বাজারের দূরত্ব সোজা দক্ষিণে আড়াই থেকে তিন কিলোমিটার। কিন্তু
কীর্তিনাশা রাজগঞ্জ-আড়িগাঁও বাজার পর্যন্ত এসে অনেকটা সাপের মতো কুণ্ডলী পাঁকিয়ে
উল্টো দিকে বাঁক নিয়ে ডোমসারের পাশ দিয়ে চিকন্দি ও গয়াতলা বাজার হয়ে বিনোদপুর
এলাকায় এসে আমাদের বাড়ির সামনে দিয়ে সোজা দক্ষিণে ছুটেছে আংগারিয়ার দিকে।
কীর্তিনাশা রাজগঞ্জ-আড়িগাঁও বাজার থেকে উল্টো দিকে বাঁক নেওয়ায় দূরত্ব বেড়ে দাঁড়ায়
প্রায় আট-নয় কিলোমিটার। তাই দূরত্ব কমাতে স্বাধীনতার পূর্বে রাজগঞ্জ-আড়িগাঁও বাজার
থেকে আংগারিয়া পর্যন্ত খনন করা হয়। ফলশ্রুতিতে উত্তরের স্রোতটি আস্তে আস্তে মরে
যেতে থাকে। পলি জমে জমে অনেক আগেই পুরোপুরি মৃত্যু ঘটেছিল রাজগঞ্জ-আড়িগাঁও বাজার
থেকে চিকন্দি পর্যন্ত। বাকী অংশে বর্ষা মৌসুমে পানি ঢুকে প্রাণ ফিরে পায়। শুষ্ক
মৌসুমে সেই ধারা অব্যাহত রাখতে সম্প্রতি ওই অংশটি খনন করা হলেও আশানুরূপ ফল পাওয়া যায়নি।
এতক্ষণ
ধরে আমার বর্ণনায় মনে হতে পারে কীর্তিনাশা বেছে বেছে হাট-বাজার ও বন্দর ধরে ধরে
এগিয়ে চলেছে। আসলে ব্যাপারটা তা নয়। ইতিহাস বলে সভ্যতা নদীর পাড়েই গড়ে উঠেছে। আমার
কবিতার ভাষায়—
‘সভ্যতার পথে হাজার বছর ধরে নদী
আপন খেলায় বয়ে চলেছে নিরবধি;
মেসোপটেমিয়া থেকে সিন্ধু সভ্যতা
প্রাণ দিয়েছে—ওঠেনি গড়ে অগত্যা।
নদীর কাছাকাছি থেকেছি জীবনভর
খাবার, পানীয় পেতে কূলে বেঁধেছি ঘর।’
(কবি: ইয়াসিন আযীয)
পণ্য
আনা-নেয়া, যোগাযোগ রক্ষা ও খাবার পানীয় পেতে নদীর তীরে মানুষ—জনবসতি তথা সভ্যতা গড়ে তোলে আদি কাল থেকে। নৌপথ এখনো সব
থেকে সাশ্রয়ী যোগাযোগ ব্যবস্থা। আমাদের নিকটতম সভ্যতা ছিল সিন্ধু সভ্যতা। সিন্ধুনদ
অববাহিকায় সিন্ধু সভ্যতা গড়ে উঠেছিল। ঠিক সেভাবেই বর্ণিত হাট-বাজার, বন্দরগুলো
কীর্তিনাশার চলার পথে গড়ে উঠেছে। আমাদের বাড়ির সামনে দিয়ে বয়ে যাওয়া কীর্তিনাশা
বর্তমানে অনেকটা শুকিয়ে গেলেও তার শৌর্যবীর্য স্মৃতিতে অম্লান হয়ে আছে।
আমাদের বাড়ির কাছ দিয়ে বয়ে যাওয়া কীর্তিনাশা ছিল অন্যান্য স্থানের তুলনায় অনেক
বেশি প্রশস্ত। আইয়ুব আলী নামের একজন মাঝি নদী পারাপার করতেন। আমরা তাকে কাকা
সম্বোধন করতাম। আইয়ুব আলী কাকা গায়েপায়ে বেশ লম্বা চওড়া লোক ছিলেন। তার নৌকাটিও
ছিল তার মতই বড়সড়। কারও তাড়াহুড়ায় তিনি ধার ধারতেন না—নিজের মতো করে ধীরে-সুস্থে পারাপার করে যেতেন। আমাদের এদিকে
মাঝিরা সারা বছর লোক পারাপার করত এবং বছরের একটি নির্দিষ্ট সময়ে ধান নিতো। আমাদের
স্থানীয় ভাষায় এই নির্দিষ্ট সময়কে বলা হতো ‘খন্দের সময়’। এই শ্রেণির পেশাজীবীদের
বাবা খুব আতিথেয়তা করতেন।
আমাদের
বাড়ির সামনে দিয়ে দুই-তিন গ্রামের মানুষ কীর্তিনাশায় যেত গবাদি পশু নিয়ে—গোসল করাতে। স্থানীয় ভাষায় যাকে বলা হয় ‘গরু নাওয়ানো’। গরু
নাওয়াতে আনা নেয়ার মাঝে অনেক সময় গরুতে গরুতে লড়াই বেঁধে যেত। একবার মেঝ কাকার
ষাঁড়ে পাশের গ্রামের বেপারিদের গাভীকে গুঁতো মেরে পেট ফুটো করে দেয়! গাভিটা ছিল
আবার গর্ভবতী। ফলে এ নিয়ে বিরাট কাণ্ড ঘটে যায়। আমরা কিশোর-তরুণরাও যেতাম নদীতে
নাইতে। ছোঁয়াছুঁয়ি খেলতাম পানিতে ডুব-সাঁতার কেটে। লাল চোখে বাড়ি ফিরতাম ভয়ে ভয়ে।
আমাদের এদিকে একসময় সুতা বোনা হতো। দেখতে অনেকটা পাটের কাছাকাছি। পাটের মতো সুতাও
পঁচানোর জন্য জাগ দেওয়া হতো নদীতে। কিছুদিন পর পঁচে কাঠি থেকে আঁশ ছাড়ানোর উপযোগী
হলে লোক নিয়ে যাওয়া হতো আঁশ ছাড়াতে। আঁশ ছাড়ানো শেষে খিচুড়ির আয়োজন থাকতো কখনো।
কীর্তিনাশার রাজগঞ্জ-আড়িগাঁও ও গয়াতলা বাজার অংশে মাঝে মধ্যে এবং আংগারিয়া বাজার
এলাকায় প্রায় প্রতি বছর নৌকা বাইচ হতো। বিভিন্ন স্থানের বাচারি নৌকা, পানসি নৌকা
অংশ নিতো সেখানে। সে সময়টায় উৎসব মুখর পরিবেশের সৃষ্টি হতো। একসময় আমাদের এদিকে
প্রচুর আখ চাষ হতো। অনেক বাড়িতেই আখ থেকে রস এবং রস থেকে গুড় তৈরি হতো বর্ষা
মৌসুমে। যেদিন কীর্তিনাশায় নৌকা বাইচ অনুষ্ঠিত হতো সেদিন সকলের মধ্যে উৎসবের আমেজ
বিরাজ করত। গ্রামের মানুষ এমনিতেই ফজরের পর পরই কাজে নেমে পড়ে। আর যেদিন নৌকা বাইচ
অনুষ্ঠিত হতো, সেদিন মাঝ রাতের পর থেকেই কাজ শুরু করতো। আখ থেকে রস করে, রস আগুনে
জ্বালিয়ে গুড় তৈরি করে, গোসল ও দুপুরের খাবার শেষে নৌকা নিয়ে বেড়িয়ে পড়তো। শুধু
তাই নয়। যাওয়া-আসার সময় যারা ডিঙি নিয়ে যেত তারা ডিঙিওয়ালাদের সাথে, যারা কোষা
নিয়ে যেত তারা কোষাওয়ালাদের সাথে, মোদ্দাকথা যারা যে ধরনের নৌকা নিয়ে বাইচ দেখতে
যেত তারা সেই ধরনের নৌকার সাথে বাইচে লিপ্ত হতো। বলা চলে বাইচের ভিতর আরেক বাইচ।
যা ছিল অন্য রকম মজা, অন্য রকম আনন্দ।
ইতিহাস
থেকে জানা যায় আদিকালে শরীয়তপুরের এ অঞ্চল ‘বংগ’ (Vanga) রাজ্যের অধীনে ছিল। ‘বংগ’
পদ্মা নদীর দক্ষিণে বদ্বীপ অঞ্চলে বিস্তৃত তৎকালীন রাজ্যের নাম। এটি তৎকালীন
ভাগীরথী এবং পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদীর দক্ষিণাঞ্চল নিয়ে বিস্তৃত অঞ্চল। রাজা
দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের (৩৮০ খ্রি:-৪১২ খ্রিঃ) রাজত্বকালে প্রখ্যাত
সংস্কৃত কবি কালিদাসের ‘রঘুবানসা’ গ্রন্থে তিনি এ অঞ্চলকে গঙ্গানদীর প্রবাহের
দ্বীপদেশ বলে আখ্যায়িত করেন, যার অধিবাসীগণ জীবনের সকল কর্মকাণ্ডে নৌকা ব্যবহার
করতো। এমনকি যুদ্ধেও নৌকার ব্যবহার ছিল। এ অঞ্চলের জনসাধারণ নৌ বিদ্যায় পারদর্শী
ছিল। এ অঞ্চলের মানুষের যাতায়াত থেকে শুরু করে পণ্য আনা-নেয়ার জন্য নদী ও নৌকার
ব্যবহার ছিল কয়েক বছর আগেও। বর্ষা মৌসুমে নদী ও নৌকা ছিল অপরিহার্য অনুষঙ্গ। নৌকার
ব্যবহার ছাড়া অন্য কিছু কল্পনাই করা যেত না। উৎপাদিত ফসল: ধান, পাট, গম, ডাল, গুড়
ইত্যাদি নিয়ে নৌকায় নদী পথে আংগারিয়া, ভোজেশ্বর, গয়াতলা, চন্দ্রপুর ও টেকেরহাট নিয়ে
যেত বিক্রির উদ্দেশ্যে। পাশাপাশি উৎপাদিত পণ্য বিক্রি করে ইলিশ মাছসহ অন্যান্য
নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্য কিনে আনতো। স্থানীয় লোকজনের ইলিশের বাইরে খুব একটা মাছ
কেনার প্রয়োজন হতো না। নদীতে প্রচুর মাছ পাওয়া যেত। শুধু নদী নয় পুকুর, খালসহ
বিভিন্ন জলাশয়ে প্রচুর মাছ ছিল। কীর্তিনাশায় বাঁধ দিয়ে চাই ও ফালা পেতে মাছ ধরা
হতো। এই বাঁধকে স্থানীয় ভাষায় বলা হয় ‘গড়া দেওয়া’। আর চাই পাতাকে বলা হয় ‘দোয়াইর
পাতা’। গড়া দিতে ব্যবহার করা হয় বাঁশ ও বাঁশের তৈরি বানা বা চালি। বানা বা চালির
বিকল্প হিসেবে অনেক সময় জাল ব্যবহার করা হতো। ভেসাইল ও ফালা পাতা, বেড়জাল, মই জাল,
বড়শি, কারেন্ট জালসহ মাছ ধরার স্থানীয় আরো অনেক কৌশল বা পদ্ধতি ছিল। ‘নিরাগ চাওয়া’
ও ‘বররা বাওয়া’ ছিল অনেক মজার। দুপুরের কড়া রোদে বাতাস পড়ে গেলে জুতি, টেটা কিংবা
কোচ দিয়ে মাছ ধরার পদ্ধতি হচ্ছে নিরাগ চাওয়া। আর বররা বাওয়ার পদ্ধতি হলো—বাঁশের কঞ্চির মাথায় শক্ত সুতার সাথে গুনা বেঁধে রাতের বেলা
ছোট নৌকায় হারিকেন জ্বালিয়ে সেই গুনার ভেতর কেঁচো গেঁথে নদীতে ফেলা। চিংড়ি মাছ সেই
কেঁচো গাঁথা গুনার কাছে এলে আস্তে আস্তে উপরের দিকে তুলে ফেন্নি জাল দিয়ে খেও দিয়ে
চিংড়িমাছ ধরা হতো। কীর্তিনাশায় পাওয়া যেত বেলে, চিংড়ি, রুই, কাতলা, মলা-ঢেলা ও
কার্পসহ নানা রকম ছোট-বড় বিভিন্ন প্রজাতির মাছ।
আমরা
জানি পৃথিবীর সুন্দরতম নদী ‘কানো ক্রিস্টালেস’। প্রতিটি সাহিত্যিকের শৈশবের নদীই
তার কাছে পৃথিবীর সুন্দরতম নদী। তাই নদীকে কেন্দ্র করে যেমনি সভ্যতা গড়ে উঠেছে ঠিক
তেমনি প্রতি যুগে, প্রতি দেশে সাহিত্য তৈরি হয়েছে। নদীমাতৃক বাংলাদেশের
সাহিত্যরচনার একটি বড় অংশের ভীত তৈরি হয়েছে নদীকে আশ্রয় করে। আমরা দেখতে পাই
বাংলা সাহিত্যের আদি নিদর্শন চর্যাপদ থেকে শুরু করে বাংলা সাহিত্যের প্রতিটি যুগে
নদী একটি বড় স্থান দখল করে আছে। মাইকেল, রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, জসীম উদ্দীন,
জীবনানন্দ, আল মাহমুদ এবং হালের নির্মলেন্দু গুণ—কে লিখেননি নদী নিয়ে কবিতা?
এইচএসসি
পাশের পর প্রায় এক বছর পেরিয়ে যায় অনার্সে ভর্তি হতে। সেই সময়টায় এবং অনার্সে
ভর্তির পরেও কীর্তিনাশার পাড়ে ঘন্টার পর ঘন্টা কাটিয়ে দিয়েছি বন্ধুরা মিলে।
কীর্তিনাশার দিকে তাকিয়ে থেকেছি অপলোক...। দেখেছি রাতের চাঁদ কিভাবে দোল খায়
কীর্তিনাশার ঢেউয়ে! দেখেছি অজনায় বয়ে চলা স্রোত। ভেবেছি এই স্রোত কোথা থেকে আসে,
কোথা চলে যায়। এরকমও ভেবেছি কখনো: জীবনের যত ব্যর্থতা-কষ্ট-স্বপ্ন, যত বাসনা বিলাস
ভাসিয়ে দিয়ে স্রোতে—যদি কীর্তিনাশার সাথে ভেসে
যেতে পারতাম শেষ ঠিকানায়!
মা
প্রায়ই তাঁর বড় ছেলেকে হারানো গল্প বলতেন অবলীলায়। খালের পাশের পেয়ারা গাছে পেয়ারা
পাড়তে গিয়ে খালে পড়ে যায় আমার ভাই। স্রোত তাকে টেনে নিয়ে যায় কীর্তিনাশায়। অনেক
খোঁজাখুঁজির পরও পাওয়া যায়নি। শেষে মাছ ধরার জালে উঠে আসে ভাই! মা আরও বলতেন
ইস্টিমারে চড়ে তাঁর মামা বাড়ি বেড়াতে যাওয়ার গল্প। বাবাও বলতেন কীর্তিনাশার যৌবনের
গল্প। পাক খাওয়া ঘোলা স্রোতে ইস্টিমার দুলিয়ে দেওয়া, ছোট ছোট নৌকা ডুবিয়ে দেওয়ার
গল্প। আমি ইস্টিমার দেখিনি। লঞ্চ চলাচল দেখেছি। কালকিনি, বরিশালসহ আংগারিয়া,
মুন্সিরহাট ও ভোজেশ্বর থেকে লঞ্চ ঢাকা, চাঁদপুর ও নারায়ণগঞ্জ যেত কীর্তিনাশা দিয়ে।
গুন টানা, পালতোলা নৌকা দেখেছি। বেদে নৌকার বহর দেখেছি। দেখেছি মালবাহী নৌকা,
ট্রলার, একমালাই নাও ইত্যাদি। মা-বাবার মুখে আরও শুনেছি—‘পশ্চিমা হানাদার বাহিনীরা
লঞ্চ নিয়ে কীর্তিনাশা দিয়ে যাতায়াত করতো। সাবেক এমপি কালু সরদারদের বাড়িতে আগুন
দিয়ে যাওয়ার সময় লঞ্চ থামায় আমাদের বাড়ির কাছে। পাকবাহিনী আমাদের বাড়িকে বাজার
ভেবেছিল। কারণ তখন আমাদের অঞ্চলে বেশিরভাগ বাড়িই ছিল ছনের। টিনের ঘর খুব কমই পাওয়া
যেত। কিন্তু আমাদের বাড়িতে বাজারের মতো দুই সারিতে বড় বড় টিনের ঘর ছিল। এমনকি
দোতালা ঘরও ছিল। পাকবাহিনীর লঞ্চে থাকা একজন বাঙালি চিনতো আমাদের বাড়ি। তাই শেষ
পর্যন্ত আসেনি! তবে আমাদের এখান থেকে ফিরে আংগারিয়া বাজারে আগুন দেয় পাকবাহিনী।
কীর্তিনাশার পাড়ে রাজগঞ্জ বাজারের পাশে ছিল হানাদার বাহিনীর ক্যাম্প।
মুক্তিযোদ্ধারা ঝুনা নারিকেলে ক্যাপ পরিয়ে কীর্তিনাশার স্রোতে ভাসিয়ে দেয়। পাক
হানাদাররা ভাবে মুক্তিযোদ্ধারা সাঁতরিয়ে তাদের আক্রমণ করতে আসছে। ফলে তারা
মুহুর্মুহু গুলি ছুঁড়তে থাকে। মুক্তিযোদ্ধাদের উদ্দেশ্য ছিল পাকবাহিনীর কিছু
গোলাবারুদ ধ্বংস করা। এতে তারা সফল হন। এছাড়াও মুক্তিযোদ্ধারা জেলে সেজে
কীর্তিনাশায় মাছ ধরতে ধরতে নদীর পাড় ধরে এগিয়ে গিয়ে পাকবাহিনীর পজিশন, সৈনিকের
সংখ্যার ধারণা নিতেন অনেক সময়।’
কীর্তিনাশা শুষ্ক মৌসুমে পানি সংকটে পড়লেও বর্ষায় তার যৌবন ফিরে পায়। অতীতে
নদীটির চলার পথে কোনো বাধা না থাকলেও বর্তমানে নদীটির ওপর অসংখ্য সড়ক সেতু নির্মিত
হওয়ায় পাড় ভাঙ্গার হার বৃদ্ধি পেয়েছে। কীর্তিনাশা তার চলার পথের ৩৫ কিলোমিটারের
মধ্যে ১৫টি স্থানে প্রায় ১২ কিলোমিটার ভেঙে যাচ্ছে আপন খেলায়! আহমাদ মোস্তফা কামাল
এর ‘কীর্তিনাশা’ গল্পের ভাষায় যদি লিখি তাহলে দাঁড়ায়—‘কীর্তিনাশা আপনমনে ভেঙে যায়। কারো আহাজারিতে
কান দিলে তার চলে না। কীর্তিনাশা সে। মানুষের কীর্তি নাশ করাই তার কাজ। ভাঙাগড়ার
খেলা তাকে খেলতেই হবে, এই তার স্বভাব।’ তার স্বভাবের বলি হয়ে এখানকার বাসিন্দাদের
মনের অজান্তেই বেরিয়ে আসে এই গান—‘ও
নদীরে, তুই ভাঙলি আমার ঘর/ তোর কিনারে থাকতাম, তুই করলি আমায় পর।’ পরিশেষে একটি
কথা না বললেই নয়। যা শুনলে অনেকেরই হয়তো মাথায় আকাশ ভেঙে পড়বে। আর তা হচ্ছে—শরীয়তপুরের মানচিত্রে এতক্ষণ ধরে আলোচিত ‘কীর্তিনাশা’
নামে কোন নদীর অস্তিত্ব পাওয়া যায় না! শরীয়তপুরের পুরাতন ইতিহাসগ্রন্থ বলে শরীয়তপুর
‘পালং’ নদীর তীরে অবস্থিত। তবে বর্তমান কিছু গন্থে কীর্তিনাশার নাম পাওয়া যায়।
মানচিত্র পর্যালোচনায় দেখা যায়, নড়িয়া থেকে মুন্সিরহাট বা তার কাছাকাছি স্থান
পর্যন্ত প্রায় সরলাকার স্রোতের ধারাটির নাম নড়িয়া খাল (নড়িয়া নদী)। পালং নদী পদ্মা
থেকে জাজিরা উপজেলা দিয়ে প্রবেশ করে বড় গোপালপুর এসে বিভক্ত হয়। একটি ধারা রাজনগর
ও শৌলপাড়ার মাঝখান দিয়ে নশাসন ও ডোমসার হয়ে মুন্সিরহাট দিয়ে শরীয়তপুরে প্রবেশ করে
শহরের পাশ ঘেঁষে, (তখন অবশ্য শরীয়তপুর জেলার সৃষ্টি হয়নি—নাম ছিল পালং মহকুমা। বর্তমান পালং থানা ভবন
তখন আধা কিলোমিটার পশ্চিমে ছিল। পালং নদীর ভাঙনের ফলে থানা বর্তমান স্থানে সরিয়ে
আনা হয়।) রাজগঞ্জ-আড়িগাঁও, আংগারিয়া, দাদপুর হয়ে সোজা পশ্চিম দিকে টেকেরহাটের পাশ
দিয়ে মাদারীপুরের আড়িয়াল খাঁ নদীতে মিশেছে। অপর ধারাটি চন্দ্রপুর, সমিতির হাট হয়ে
টেকেরহাটে এসে শরীয়তপুর-মাদারীপুর জেলাকে বিভক্ত করে পূর্বের ধারাটির সাথে মিশে
দুটি ধারা একত্রে আড়িয়াল খাঁ’য় পতিত হয়েছে। ২য় ধারাটির জয়নগর এলাকায় আড়িয়াল খাঁ’র
সাথে সংযোগ রয়েছে। পালং নদীর দুটি ধারাই সর্পিল আকার এবং বর্তমানে নাব্যতা হারিয়ে
একেবারে সংকীর্ণ। তবে সীমিত পরিসরে জোয়ার ভাটা দ্বারা প্রভাবিত।
আরও
একটি মজার বিষয় হচ্ছে পদ্মার উপনদী ও শাখানদীর তালিকায়ও ‘কীর্তিনাশা’ নামে কোনো
নদী খুঁজে পাওয়া যায় না। না পাওয়ার এটা কারণ হতে পারে, পদ্মা নিজেই কীর্তিনাশা।
তবে আমার আলোচিত কীর্তিনাশা যেহেতু পদ্মা থেকেই সৃষ্ট তাই থাকা উচিত ছিল। পদ্মা
নিজেই কীর্তিনাশা বলেই নেই যদি মনে করি তাহলে ‘পালং’ কিংবা ‘নড়িয়া নদী’ শাখানদী
হিসেবে থাকার কথা। তবে কীর্তিনাশা শাখানদীর সমস্ত শর্তই পূরণ করে। মজার ব্যাপার হলো নড়িয়া খাল (নড়িয়া নদী) পালং নদীতে এবং পালং
নদীর দুটি ধারাই পদ্মা থেকে বেড়িয়ে আড়িয়াল খাঁ’য় মিশেছে। আরও মজার ব্যাপার হলো এই তিনটি
ধারাই বর্তমানে ‘কীর্তিনাশা’ হিসেবে পরিচিত। (পালং নদী যে স্থানে পালং থানাকে ভেঙ্গে
ছিল তার আশপাশের স্থান বর্তমানে চর জাগায় ‘চর পালং’ নামকরণ করা হয়েছে। কিন্তু এরই দক্ষিণে
এবং শরীয়তপুর শহরের ঠিক পশ্চিম পাশে নদীটির চিহ্ন ‘বাওড়’ হিসেবে এখনো টিকে আছে। যেখানে
প্রতি বছর শীতে প্রচুর পরিযায়ী পাখির আগমনে নয়নাভিরাম দৃশ্যের সৃষ্টি করে। তবে মজার
বিষয় হচ্ছে ওই বাওড়টিও ‘কীর্তিনাশা বাওড়’ হিসেবে পরিচিত।) স্থানীয় বাসিন্দাদের জবানবন্দী,
কবি-সাহিত্যিকদের রচিত সাহিত্য কর্ম, পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদেও আলোচিত নদীটির নাম
কীর্তিনাশাই পাওয়া যায়। বর্তমান প্রজন্ম শরীয়তপুরে ‘পালং’ নামে কোনো নদী নাই বলে জানে!
নড়িয়া, জাজিরা ও শরীয়তপুর সদরের তিনটি ধারাকে স্থানীয় লোকজন বর্তমানে কীর্তিনাশা হিসেবেই
পরিচয় তথা সনাক্ত করে আসছে শুধু তাই নয় তাদের মাঝে জনশ্রুতি রয়েছে শরীয়তপুরের মাঝ দিয়ে
প্রবাহিত কীর্তিনাশাই রাজা রাজবল্লভের রাজনগরের কীর্তি নদীগর্ভে বিলীন করে কীর্তিনাশা
নামে খ্যাত হয়েছে। এর সমাধান খুঁজতে হলে পিছনে ফিরে গিয়ে ইতিহাসের আশ্রয় নিতে হবে।
বর্তমান নড়িয়া, জাজিরা ও শরীয়তপুর সদরের বিস্তীর্ণ অঞ্চল একসময় ইতিহাস সমৃদ্ধ বিক্রমপুরের
অংশ ছিল। তখন পদ্মা-মেঘনার সংযোগকারী ছোট্ট নদী কালীগঙ্গা (রাজনগরের কাছ দিয়ে বয়ে যাওয়া
অপ্রশস্ত জলপ্রণালী) বিক্রমপুরকে দুটি ভাগে বিভক্ত করেছিল। জলের অভাবে কালীগঙ্গা শেষে
এতটাই সংকীর্ণ হয়ে পড়েছিল যে, তাকে ডাকা হতো রথখোলা খাল নামে। ‘রথখোলা খাল’ নামের পেছনে
আবার ভিন্ন লোকগাথা (Myth) প্রচলিত আছে—যা প্রাচীন কালীগঙ্গা নদীর অস্তিত্বকে প্রশ্নবিদ্ধ
করে। যাইহোক আজ আমরা সেই দিকে যাব না। আমরা আজ খুঁজতে বেরিয়েছি কীর্তিনাশার জন্ম ইতিহাস।
আমাদের এই অঞ্চল ছিল দক্ষিণ বিক্রমপুরের অংশ। অষ্টাদশ
শতাব্দীর প্রথম দিকে পদ্মা পূর্ণ শক্তিতে কালীগঙ্গা দিয়ে দুইপাড়ের সব কীর্তি তছনছ করে
ফুলে ফেঁপে মেঘনার সাথে মিলিত হয়। ১৮৬৬ থেকে ১৮৭১ সালের মধ্যে পদ্মা আরও দক্ষিণ দিকে
ঢুকে রাজনগরের সমস্ত কীর্তি নদীগর্ভে বিলিন করে। ফলে উত্তর ও দক্ষিণ বিক্রমপুর চিরতরে
আলাদা হয়ে যায় এবং পদ্মা খ্যাত হয় নয়াভাংগনী বা কীর্তিনাশা নামে। অনেক সময় বড়ো চরের
মধ্যেদিয়ে সরু নদী বয়ে যেতে দেখা যায়। পদ্মা রাজনগর পর্যন্ত ভেঙে আবার কিছুদিনপর চর
জেগে ওঠে কীর্তিনাশা সেই চরের মাঝের সরু কোনো নদীও নয় যে তাকে কীর্তিনাশা ডাকা হবে।
এটা মূলত নড়িয়া খাল ও পালং নদীর মিলিত ও রূপান্তরিত ধারা। ফলে শরীয়তপুরের মাঝ দিয়ে
বয়ে যাওয়া কীর্তিনাশা রাজা রাজবল্লভের রাজনগর নদীগর্ভে বিলীন করার জনশ্রুতিটি প্রশ্নবিদ্ধ
করে। এছাড়াও বর্তমান কীর্তিনাশা রাজনগরের অনেক দূর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এই ব্যাপারে
কথা হয় পদ্মা ভাঙন কবলিত এলাকার বাসিন্দা কবি মির্জা হযরত সাইজীর সাথে। তিনি বলেন—‘অঞ্চলটি নদী
ভাঙ্গনকবলিত হওয়ায় একাধিকবার ভাঙাগড়ার খেলা চলেছে। ফলে নদী পথেরও একাধিকবার পরিবর্তন
হয়েছে। পরিবর্তন হয়েছে নদীর নামেরও। এখানে সেন রাজাদের নামে সেনের চর, পাল রাজাদের
নামে পালের চর, রাজার নগর হিসেবে রাজনগর, কৃষ্ণনগর প্রভৃতি নামকরণ থেকেই বোঝা যায় এ
অঞ্চল ইতিহাস সমৃদ্ধ ছিল। ঐতিহ্যবাহী ইতিহাস সমৃদ্ধ বিক্রমপুরের রাজ রাজাদের অমর কীর্তি
নাশকারী পদ্মা নদীর এই শাখাকে আক্ষেপ আর মনবেদনা থেকে বর্তমানে ‘কীর্তিনাশা’ নদী হিসাবে
ডেকে আসছে এ অঞ্চলের মানুষ।’ জীবনানন্দের জীবনী ইতিহাস থেকে জানা যায় কবির পিতামহ সর্বানন্দ
দাশের পৈত্রিক ভিটা ছিল পদ্মার শাখানদী কীর্তিনাশার তীরে বিক্রমপুরের গাঁওপাড়া গ্রামে।
সেই গ্রাম কীর্তিনাশার জলে তলিয়ে যাওয়ার আগেই তাঁরা স্থানান্তরিত হন বরিশালে। জীবনানন্দ
ঠাকুমার কাছে সেই গল্প শুনেছেন ছোট বেলায়। তাই তাঁর কবিতায় অন্যান্য নদীর সাথে কীর্তিনাশার
নাম এসেছে একাধিকবার। উপরের আলোচনা থেকে প্রতীয়মান হয়, অতীতে কীর্তিনাশা নামে পদ্মার
একটি শাখা নদী ছিলো। একটু বিস্তারিতভাবে যদি বলি তবে বলতে হয়—আমরা একসময়
ঢাকা যাওয়ার জন্য পদ্মা নদীর য়ে অংশটি দিয়ে লঞ্চ বা ফেরি পার হতাম অথবা বর্তমানে যে
স্থান দিয়ে পদ্মা সেতু হয়েছে—এটা আসলে পদ্মা নদী না! এটা কীর্তিনাশা। আমরা জানি পদ্মা নদীর
ভারতের অংশের নাম ‘গঙ্গা’। ঠিক তেমনি নবসৃষ্টি পদ্মা—যেটা বিক্রমপুরের
মাঝখান দিয়ে প্রবাহিত হয়ে মেঘনার সাথে মিলিত হয়েছে ঠিক সেই অংশটুকুই মূলত কীর্তিনাশা।
পদ্মা মূলত অতিতে বিক্রমপুরের পশ্চিম দিক দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। যতীন্দ্রমোহন রায় তাঁর
‘ঢাকার ইতিহাস’ গ্রন্থে লিখেছেন, ‘পদ্মার যে অংশ বিক্রমপুর ভেদ করিয়া মেঘনার
সহিত মিলিত হইয়াছে, উহার নাম কীর্তিনাশা। প্রকৃত প্রস্তাবে পদ্মার গতি বিক্রমপুরের
পশ্চিম দিক পরিত্যাগ করিয়া মরাপদ্মা নামে এবং প্রবলাংশ, যাহা প্রায় শত বৎসরের মধ্যে
উদ্ভব হইয়া প্রাচীন কালীগঙ্গা নদীর বিলোপ সাধন করিয়াছে, উহাই কীর্তিনাশা নামে পরিচিত।’
পরবর্তিতে মরাপদ্মা চর পড়তে পড়তে তার অস্তিত্বই
হারিয়ে ফেলে। ফলশ্রুতিতে নবসৃষ্ট ধারাই মূল পদ্মা হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। নবসৃষ্ট ধারা সৃষ্টি এবং গতি লাভ করেছিল মূলত বাংলাদেশের
প্রাকৃতিক এবং ভৌগলিক এক বিশাল পরিবর্তনের ফলে। ১৭৮৭ সালে বাংলাদেশে প্রলয়ঙ্করী ভূমিকম্প হলে ব্রহ্মপুত্র
নদের তলদেশ উঁচু হয়ে গতিপথ পরিবর্তিত হয়। যার ফলে ব্রহ্মপুত্রের মূল স্রোতধারা বিভক্ত
হয়ে একটি ধারা যমুনার দিকে সরে যায়। যমুনা তখন ছিল একটি প্রশস্থ খাল। ভূমিকম্পের ফলে
তিস্তা এবং ব্রহ্মপুত্রের মিলিত শ্রোত যমুনায় গিয়ে মেশে। যমুনা আবার গোয়ালন্দের কাছে পদ্মা নদীর সাথে এসে মেশে। ফলে বর্ষায় পদ্মার বিপুল পানি প্রবাহ এবং প্রবল বেগ নিয়ে ক্রমেই পশ্চিম
দিক পরিত্যাগ করে পূর্ব দিকে অগ্রসর হতে থাকে। যতীন্দ্রমোহন এর ভাষায়, ‘মি. রেনেল ১৭৮০ খ্রিস্টাব্দে পূর্ববঙ্গের
যে মানচিত্র অঙ্কিত করিয়াছিলেন, তাহাতে দেখা যায়, পদ্মা নদী বিক্রমপুরের বহু পশ্চিম
দিক দিয়া প্রবাহিত হইয়া ভবনেশ্বরের সহিত সম্মিলিত
হইয়াছিল। তখন ‘কীর্তিনাশা’ বা ‘নয়াভাঙ্গনী’ নামে কোনো নদীর অস্তিত্ব ছিল না। বিক্রমপুরের
অন্তর্গত রাজনগর ও ভদ্রেশ্বর গ্রামের মধ্যে একটি অপ্রশস্ত জলপ্রণালী মাত্র বিদ্যমান
ছিল। উহা প্রাচীন কালীগঙ্গার শেষ চিহ্নমাত্র। শ্রীপুর, নওপাড়া, ফুলবাড়িয়া, মুলফৎগঞ্জ
প্রভৃতি প্রসিদ্ধ গ্রামসমূহ কালীগঙ্গার তটে বিদ্যমান ছিল। পরে শত বৎসরের মধ্যে কীর্তিনাশা
নদীর উৎপত্তি হইয়া বিক্রমপুরের বক্ষদেশ ভেদ করিয়া এবং নয়াভাঙ্গনী নদী উদ্ভুত হইয়া ইদিলপুরের
প্রান্তদেশ ধৌত করিয়া পদ্মা ও মেঘনাদ পরস্পর সংযুক্ত করিয়া দিয়াছে।’
রেনেলের মানচিত্রে কীর্তিনাশার উল্লেখ না থাকলেও
১৮৪০ সালে জেমস টেইলার তার ‘Topography of Dhaka’ পুস্তকে ‘কাথারিয়া’
বা ‘কীর্তিনাশা’ নদীর কথা উল্লেখ করেছেন। কীর্তিনাশা নাম হওয়ার পেছনে রয়েছে এর বিধ্বংসী
রূপ এবং ভীষণ সংহার মূর্তি ধারণ করে নানা প্রাচীন কীর্তি নাশ বা ধ্বংস প্রভৃতি কারণ।
বিক্রমপুরের জমিদার চাঁদ রায় ও কেদার রায়ের এবং নওপাড়ার চৌধুরীদের কীর্তি ধ্বংস করায়
নদীটির নাম হয়েছে কীর্তিনাশা। পরে মহারাজ রাজবল্লভের কীর্তিনিকেতন ভেঙে নামের সার্থকতা
প্রমাণ করে। কীর্তিনাশা প্রথমে ‘রথখোলা’ পরে ‘ব্রহ্মবধিয়া’ ও ‘কাথারিয়া’ এবং সবশেষে
‘কীর্তিনাশা’ নামে পরিচিতি পায়। ঠিক এরকমই কীর্তিনাশা এবং এর আশেপাশের নদীর বয়ে চলার
পূর্ব এবং বর্তমান ইতিহাস। এবার দেখে আসি এ অঞ্চলের কবি-সাহিত্যিকগণ কীর্তিনাশাকে কিভাবে
দেখছেন।
কীর্তিনাশা পাড়ের কবি-সাহিত্যিকেরাও তাঁদের শৈশব স্মৃতিবিজড়িত কীর্তিনাশা নদীকে
নিয়ে নানা রকম সাহিত্য রচনা করে চলেছেন। ‘স্মৃতির চড়ুই’ কবিতায় কবি রাজু আলীম তার শৈশব
স্মৃতি রোমন্থনে লিখেছেন—
‘নদীর তীরস্থ পথে বৃষ্টি গুনি
হামাগুড়ি দিয়ে
চোখের পুকুরে চুপ চুপিসারে টাপুর
টুপুর...
সকালের আহ্বানে মন্ত্রমুগ্ধ কীর্তিনাশা
বাঁকে
দুপুর বিকেল ওড়না গায়ে দেখে রোদের
সার্কাস...
শুশুকের লম্ফ ছিল নদী শুষ্ক ডানে-বায়ে
খাল...
আমনের ভাত লাউলতা খেয়ে গাঙ্গে
করি স্নান
বাঁচিয়ে রেখেছে এই সবুজেরা আমাদের
প্রাণ।’
(কবি:
রাজু আলীম)
‘স্মৃতি
ও প্রত্যাশা’ কবিতায় কবি মফিজুল ইসলাম লিখেন—‘ঝিনুক খোলার ছুরি দিয়ে কিশোরী
আমা খেয়ে/ ফিরেছি বাড়ি কীর্তিনাশায় সাঁতার কেটে-নেয়ে।’ ‘যদি আমি চলে যাই নিশ্চিত গন্তব্যে লোভনীয় বর্ষায়/কথা দাও আমার সমাধি
দিও কীর্তিনাশার পাড়ে’ (কবি-
নাজমুল হক)।
কবি
মোঃ ফজলুল হক এর একাধিক কবিতায় ঘুরেফিরে শৈশবের নদী কীর্তিনাশা ফিরে ফিরে এসেছে। তিনি
তার কবিতার নীল পরীকে উৎসর্গকৃত অনেক কিছুর সাথে কীর্তিনাশার কলতান উৎসর্গ করেছেন
ঠিক এভাবেই—
‘তোমার জন্য রাখা ছিল মাঠের সবুজ,
বৃক্ষের ছায়া, কীর্তিনাশার কলতান।
তোমার জন্য রাখা ছিল মেঘের বাহন,
মুঠো মুঠো কালোটিপ, বৃষ্টির সুর...
(কবি:
মোঃ ফজলুল হক)
মোঃ
ফজলুল হক এর ‘বহতা নদীর কথা’ কবিতাটি পুরোটাই বাল্যকালের স্মৃতি জড়িত কীর্তিনাশাকে
নিয়ে লেখেন—‘এই তো আমার কীর্তিনাশা,/ বাল্যকালের
স্মৃতির জলধারা।/ অফুরান স্মৃতির জোনাকি এখানে/ এখনো পাখনা ছড়ায় অক্লেশ অরুণিমায়/ দুরন্ত
কৈশোর এখনও এখানে মুখর হয়/ অবিনাশী সুরের ঝংকারে.../ অতঃপর কীর্তিনাশার দুইকূলে সন্ধ্যা
নামে/ অতি সন্তর্পণে.../ আহা কৈশোর!/ আহা কীর্তিনাশা!/ তোমার কাছে জমা আছে,/ দিনমান
ডুবসাঁতারের খেলা, অবিরত নতুন স্বপ্ন।
আমার
‘বৈশাখ’ কবিতায়ও উঠে এসেছে কীর্তিনাশার কথা—‘এসেছে নতুন বছর/ এসেছে বৈশাখ
মাস/ এসেছে কীর্তিনাশায় জোয়ার/ নাচে মাছরাঙ্গা, পানকৌড়ি আর হাঁস।
মানিক
লাল সাধু’র কীর্তিনাশা নদীর পাড়ের মানুষের জীবন সংগ্রাম নিয়ে লিখা উপন্যাস ‘পশ্চিম
পাড়’। রেদোয়ান মাসুদের উপন্যাস ‘ভাঙ্গন’ উল্লেখযোগ্য। এছাড়াও এই নদীর নাম অনুসারেই
কবি খান মেহেদী মিজান ‘কীর্তিনাশার কাব্য’ লিটল ম্যাগাজিন শুরু করেন। এমনিভাবে কীর্তিনাশার
দুপাড়ের মানুষের যাপিত জীবনের গল্প উঠে এসেছে তাঁদের বিভিন্ন লেখায়। কবি মোঃ ফজলুল
হক এর ভাষায়—‘কীর্তিনাশার শান্ত স্রোতে কখনো
ভেসে যায় ভালোবাসার অমিয়ধারা, অনাবিল প্রেম... জীবনের জলছবি। কীর্তিনাশায় ভেসে যায়
গোলাপের ঝাড়, সবুজ বনানী, অস্ফুট আশা, অমলিন প্রেমের ইশতেহার। কীর্তিনাশা তুমিই ভেঙ্গেছ
আশার বসতি, বাসনা বিলাস। তবুও কীর্তিনাশা জেগে থাকো মৃন্ময় স্মৃতির মোহনায়।’
কীর্তিনাশা
নদী নিয়ে স্থানীয় কবি-সাহিত্যিকদের সাহিত্যকর্ম ইতোমধ্যেই আলোচিত হয়েছে। এবার কিছু
পত্রিকার সংবাদ দেখা যাক: দৈনিক জনকণ্ঠ ০৬ অক্টোবর, ২০২১ তারিখে প্রকাশ—‘শরীয়তপুরে কীর্তিনাশা নদী রক্ষায় ৩১৯.৩২ কোটি টাকা বরাদ্দ।’
দৈনিক প্রথম আলো ০৫ অক্টোবর, ২০২০ তারিখে প্রকাশ—‘কীর্তিনাশার ১০টি স্থানে
ভাঙন, ঝুঁকিতে সড়ক-সেতু।’ দৈনিক ইনকিলাব ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ তারিখে প্রকাশ—‘কীর্তিনাশা থেকে যুবকের লাশ উদ্ধার।’ পূর্বের আলোচনা এবং
পত্রিকার সংবাদের বিস্তারিত পাঠে দেখা যায়, পূর্বে যে নামই থাকুক বর্তমানে
শরীয়তপুরের মাঝ দিয়ে প্রবাহিত নদীই ‘কীর্তিনাশা’ হিসেবে সর্বস্থরে পরিচিতি লাভ
করেছে।
এখনো
বাড়ি গিয়ে আমি খুঁজি আমার শৈশবের নদী কীর্তিনাশাকে। হারিয়ে যাই শৈশবের দুরন্তপনায়।
স্মৃতিতে ভাসে কীর্তিনাশার এপার ওপার ছিল ধু ধু... মাঝখানে অথৈই জলরাশি। এপার ওপার
আজ সংযোগ সড়ক; দু’পাশে ফসলের খেত। কীর্তিনাশার এহেন বদলে যাওয়া আমাকে শিখিয়েছে
জীবনের পট পরিবর্তন...। প্রিয় নদী আমার, শৈশবের প্রিয় নদী তুমি ভালো থেকো। নদী
তুমি বয়ে যেতে যেতে... নিজে হারিয়ে গিয়ে সমুদ্রে, আমাকে শিখিয়েছ—কিভাবে অন্যতে বিলীন হতে হয়; প্রিয় নদী আমার—তুমি আজ অন্য দেশে, অন্য নদী। তুমি অন্য দেশে, অন্য নদী হয়ে
ভালো থেকো...।
তথ্যসূত্র: ০১। bn.wikipedia.org
০২।
বাংলাদেশের লোকজ সংস্কৃতি গ্রন্থমালা শরীয়তপুর—বাংলা একাডেমি
০৩।
শরীয়তপুর অতীত ও বর্তমান—আব্দুর রব শিকদার
০৪।
শ্যামসুন্দর দেবনাথ—লোকজ গবেষক, সম্পাদক ও কবি
০৫।
উপন্যাস ভাঙ্গন—রেদোয়ান মাসুদ
০৬। ঢাকার ইতিহাস—যতীন্দ্রমোহন রায়
০৭। নদীবাংলা.নেট/রিভার
০৮।
greenpage.com.bd
