ঐতিহাসিক পানাম নগরে
ইয়াসিন আযীয
আমার
দুই মেয়ে নাদিরা নূর এবং নাজিফা নূর; পড়ে শরীয়তপুর শহরের কেন্দ্রস্থলে ‘এসডিএস
একাডেমি’ নামের একটি কিন্ডারগার্টেনে। আমাদের বাসা এর পাশেই। বেসরকারি শিক্ষা
প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ভালো অবস্থানেই রয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। প্রতি বছর জানুয়ারি থেকে
মার্চ এর প্রথম সপ্তাহের মধ্যে ছাত্র-ছাত্রীদের নিয়ে শিক্ষা সফরে যায়
প্রতিষ্ঠানটি। ২০২৩ সালে গিয়েছিল ক্রিকেটার মাশরাফি বিন মর্তুজার নড়াইর জেলায়—একটা পিকনিক স্পটে। বড়ো মেয়ে
নাদিরা তখন ২য় শ্রেণিতে পড়ে। ওর সাথে সফরসঙ্গী হিসেবে ছিলাম আমি। আরো ছিল ওর মা,
ছোটো মেয়ে এবং আমার বোন। এক জনের সাথে চার চার জন! এ যেন বাংলাদেশের
প্রধানমন্ত্রীর রাজকীয় বিদেশ সফর। এই সফর—প্রধানমন্ত্রীর সাথে মন্ত্রী, আমলাদের
অপ্রয়োজনীয় সফরসঙ্গী হওয়ার সাথে তুলনা হবে না আশা করি। বাচ্চা মেয়ের সাথে নিজস্ব
খরচে তার পরিবারের লোকজনের যাওয়ার বিষয়টি বেসরকারি প্রটোকল হিসেবেই ধরা হবে
নিশ্চয়ই।
এবার
মূল প্রসঙ্গে আসি। ২০২৪ সালের মার্চে আবার আয়োজন হয় এসডিএস একাডেমি কর্তৃক শিক্ষা
সফরের। প্রথমে সম্ভাব্য কয়েকটি স্থানের নাম প্রস্তাব করে, শেষে ‘পানাম নগরী’র নাম
চূড়ান্ত হয় সর্বসম্মতিক্রমে। আমার স্ত্রী এসে আমাকে জানায় বিষয়টি। জনপ্রতি পনেরোশ
টাকা ধার্য করা হয়েছে আসা-যাওয়া, সকালের নাস্তা এবং দুপুরের লাঞ্চ বাবদ। যারা যেতে
চায় দু’দিনের মধ্যে টাকা জমা দিতে হবে। আগেরবারের মতো যদি আমরা সমভিব্যাহারে যাই তবে সাড়ে সাত হাজার টাকা লাগবে শুধু
ধার্য ফি বাবদ। আমি মনে মনে একটি হিসাব করে ফেললাম। স্ত্রীকে বললাম, ‘এই অসময়ে এত
টাকা পাব কোথায়? গত বছরই তো গেলাম। এইবার না গেলে কি হবে না? আগামীতে আবার যাওয়া
যাবে।’ আমার স্ত্রী বলল, ‘পানাম নগরী যাওয়ার আমার অনেক দিনের ইচ্ছা। পুরনো অনেক স্থাপনা
রয়েছে ওখানে।’ আমিও একদিন ইউটিউবে একটা ভিডিওতে পানাম নগরী সম্পর্কে দেখেছিলাম।
মনে মনে আমারও সেখানে যাওয়ার ইচ্ছা। তবুও সেটা লুকিয়ে না যাওয়ার অপারগতা প্রকাশ
করলাম। আগের বছর শুধু বড়ো মেয়ে ওই স্কুলের স্টুডেন্ট ছিল। এবার তার সাথে যুক্ত
হয়েছে ছোটো মেয়ে। তাই আমার স্ত্রী বলল, ‘যাইবা না? দাঁড়াও ছোটো মেয়েকে পাঠাচ্ছি।’
আমি জানি, ও নাছোড়বান্দা একবার একটা কিছুর আবদার করলে, ‘হ্যাঁ’ না বলা পর্যন্ত, ও
ছাড়বে না।
একটুপর
চলে আসে ছোটো মেয়ে। এসেই বলল, ‘বাবা টাকা দাও।’ আমি বললাম, ‘কেন?’ ‘স্কুল থেকে...’
এ পর্যন্ত বলে আর বলতে পারল না। ওর মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। ওর মা বলল,
‘পানাম নগরী যাব।’ এবার ছোটো মেয়ে প্রথম থেকে বলা শুরু করল, ‘স্কুল থেকে পানাম
নগরী যাব—টাকা দাও। টাকা দাও...।’ আমি
বললাম, ‘গত বছরই না গেলে তোমার আপুর সাথে।’ আমি জানি ওর কাছে এবারেরটা বেশি
গুরুত্বপূর্ণ; কারণ এবার সে নিজেই ওখানকার স্টুডেন্ট। ওর অনেক বন্ধুরা যাবে। ছোটো
মেয়ের সাথে এবার এসে যুক্ত হল বড়ো মেয়ে। দুজনে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরল। এক পা-ও কোনো
দিকে নড়তে সুযোগ দিচ্ছে না। শেষমেশ আমি বললাম, ‘আচ্ছা ঠিক আছে যাবো।’ আর সাথে
সাথেই সবাই মিলে শেষ বলে ছয় রান করে ক্রিকেট ম্যাচ জয়লাভ করার মতো চিৎকার করে উঠলো
ওরা। স্ত্রীকে গুনে গুনে সাড়ে সাত হাজার টাকা দিয়ে দিলাম। পরের দিন আবার স্ত্রী
বলল, ‘কিছু কেনাকাটা আছে ওখানে গেলে তো আর এভাবে যাওয়া যাবে না। শাড়িসহ আরো কিছু
টুকিটাকি জিনিসপত্র কিনতে হবে।’ পরের দিন নিয়ে গেলাম মার্কেটে। স্ত্রীর প্রয়োজনীয়
জিনিস পত্রের সাথে আমার জন্যও তার শাড়ির সাথে ম্যাচিং করে একটা টি-শার্ট কিনলো।
স্কুল
কর্তৃপক্ষ আট মার্চ দিন ধার্য করেছে পানাম নগরী যাওয়ার জন্য। পদ্মা সেতু হওয়ার পর
থেকে শরীয়তপুরের সবচেয়ে জনপ্রিয় পরিবহন সার্ভিস ‘শরীয়তপুর সুপার সার্ভিস’। স্কুল
কর্তৃপক্ষ চারটি বাস ভাড়া করে শরীয়তপুর সুপার সার্ভিসের। স্কুলের পাশেই মেইন রোড
বা শরীয়তপুর জেলার প্রধান সড়ক। সেখান থেকে সকাল সাড়ে ছয়টায় ছাড়া হবে বাস।
সাত
তারিখ রাতে খেয়েদেয়ে মোবাইলে ভোর পাঁচটা পয়ত্রিশ মিনিটে এলার্ম সেট করে শুয়ে
পড়লাম। কিন্তু কোথাও যাওয়ার প্রোগ্রাম থাকলে আমার সহজে ঘুম আসে না। সেদিনও তাই
হলো। অনেকটা রাত এপাশ-ওপাশ করে কেবল চোখ বন্ধ করেছিলাম। কিন্তু চারটা বাজতেই
অন্যান্য অভিভাবকরা আমার স্ত্রীকে ফোনে কল দেয়া শুরু করলো। আমার অ্যালার্ম কোনো
কাজে এলো না। শেষে ঢুলু ঢুলু চোখ নিয়ে উঠে ফ্রেশ হয়ে ১০ মিনিট থাকতেই বাস ধরতে
বেরিয়ে পড়লাম আমরা। বেরিয়ে দেখি বাসের কাছে মানুষের ভিড়। স্কুল এবং আমাদের বাসা
পাশাপাশি থাকায় আমাদের খুব তাড়াতাড়ি বের হতে হলো না। আমার বড়ো মেয়ের একটা বদ
অভ্যাস আছে কোনো দিকে যাবার সময়, ও বারে বারে ওয়াশরুমে যাবে। ইদানিং সেটা আমাকেও
পেয়ে বসেছে। আমি বাসে উঠে আবার ফিরে এলাম বাসায়—ওয়াশরুমে যাওয়ার জন্য। এর মধ্যেই ফোন আসা শুরু
করল, ‘বাস ছেড়ে দিচ্ছে তাড়াতাড়ি আসো।’ তাড়াহুড়া করে দৌড়ে গিয়ে উঠলাম বাসে। কিন্তু
বাস আর ছাড়ছে না। একজনকে জিগ্যেস করে জানতে পারলাম, কোনো এক ফ্যামিলির সদস্যরা
এখনো এসে পৌঁছায়নি; তাদেরকে ফোনে কল দিয়েও পাওয়া যাচ্ছে না। শেষ পর্যন্ত তাদের
জন্য লোক পাঠানো হলো আর তারা আসতে আসতে ঘড়ির কাটা সাতটা ছাড়িয়ে গেল। শেষে সাতটা
পয়ত্রিশে বাস ছাড়ে। যে কটাই বাজুক বাস ছেড়েছে অবশেষে এটাই স্বস্তি। গাড়িতে চড়লে
আমার মাথা ব্যাথা করে। জার্নি করতে সমস্যা হয়। তাই পকেটে ঔষধ রাখতে হয় মাথা
ব্যাথার। এবারও ঔষধ আনতে ভুল করিনি। তবে মাথা ব্যথা থেকে বাঁচতে আমি চোখ বন্ধ করে
ঘুমের ভান করে থাকি। ঘুম না এলেও এতে মাথা ব্যথা থেকে অনেকটা বেঁচে থাকা যায়। বাস
চলছে, আমি চোখ বন্ধ করে ঘুমের ভান ধরে থাকলাম। পদ্মা ব্রিজের দক্ষিণ প্রান্ত শরীয়তপুর
জেলার মধ্যে পড়লেও শরীয়তপুর জেলায় সংযোগ সড়ক হয়নি। এর জন্য শরীয়তপুরের জনগণ
শরীয়তপুরের তিন এমপিকে দোষারোপ করে থাকেন। আশার কথা, দেরিতে হলেও রাস্তার কাজ শুরু
হয়েছে। কাজ চলমান তাই ভাঙাচুরা রাস্তায় চলতে গিয়ে একেবারে বাজে অবস্থা গাড়ির।
ধুলোবালিতে গাড়ির ভেতরে একাকার। তাই বারবার জানালা আটকাতে হচ্ছে আবার খুলতে হচ্ছে।
খোলা থাকলে ধুলা ঢোকে, আটকালে আবার গরম লাগে। উভয় সংকট। আমি চোখ বন্ধ করেই আছি।
বাসটি দুলতে দুলতে যাত্রিদের ধুলাবালি মাখিয়ে দিয়ে আটটা বেজে আটান্ন মিনিটে পদ্মা
ব্রিজের গোড়ায় পৌঁছাল। ত্রিশ কিলোমিটার রাস্তা অতিক্রম করতে ত্রিশ মিনিটও লাগার
কথা না। কিন্তু আমাদের সময় লেগে গেল প্রায় এক ঘন্টা তেইশ মিনিট। পদ্মা পাড়ের জেলা
হয়েও আমরা পদ্মা সেতুর সুফল থেকে বঞ্চিত রয়েছি।
পদ্মা
সেতুর টোল পরিশোধ করে বাস সাই সাই করে চলতে শুরু করল। বাসটি যেন তার প্রাণ ফিরে
পেল। এর আগে আমি চোখ খুলে উঠে দাঁড়ালাম এবং বাচ্চাদের বললাম, ‘দেখো আমরা পদ্মা
ব্রিজে চলে এসেছি।’ বাচ্চারা এতক্ষণ আনন্দে নাচানাচি এবং গান করছিল। আমার কথায়
বাসের সবাই পদ্মা ব্রিজের দিকে তাকিয়ে রইল হা করে। আমি এর আগে অনেকবার সেতুটির ওপর
দিয়ে গেলেও, অন্যান্য যাত্রিদের মতো আমিও তাদের বিস্ময়ের সঙ্গি হলাম। আমাদের হা
বন্ধ হওয়ার আগেই পদ্মা সেতু অতিক্রম করে গেল বাসটি। বিশ্বের অন্যতম প্রমত্তা নদীকে
কিভাবে মানুষ বশে এনে তার ওপর দিয়ে সাই সাই করে চলে যাচ্ছে গাড়ি নিয়ে। আমি যতবারই
যাই এটার ওপর দিয়ে ততবারই আমায় বিস্মিত করে। পদ্মা ব্রিজ পার হয়ে একটু সামনে গিয়ে
বাস থামানো হলো ৫/৭ মিনিটের জন্য। যাদের প্রকৃতিক ডাকে সাড়া দেওয়া দরকার তারা নেমে
পড়ল। আমি তাদের দলে যোগ দিলাম। সকালে আমার খালি পেটে পানি পান করার অভ্যাস। যেটা
আমি আমার আব্বার কাছ থেকে পেয়েছি। যার দরুন আল্লাহর রহমাতে আমি গ্যাসটিকের মতো জটিল
রোগ থেকে অনেকটা মুক্ত আছি। কিন্তু যে ভয়ে আজ সকালে পানি পান করিনি, সে ভয় আমাকে
ছাড়ল না। পুনরায় বাস ছাড়ার আগে স্কুল কর্তৃপক্ষ সবাইকে সকালের নাস্তা পরিবেশন
করলো। নাস্তা মূলত নিয়ে আসা হয়েছিল শরীয়তপুর থেকেই। নাস্তা হিসেবে দেওয়া হলো
ঠান্ডা খিচুড়ি এবং ডিম। আমরা নাস্তা খাচ্ছিলাম আর বাস চলছে। সামান্য একটু খিচুড়ি
এবং ডিম খেয়ে আমি প্যাকেটটি রেখে দিলাম।
শ্রীনগর
চৌরাস্তায় গিয়ে বাসটি হাইওয়ে ছেড়ে ডান দিকে টার্ন নেয়। শুরু হয় নতুন রাস্তা ধরে
চলা। এদিকে আমার কখনো আসা হয়নি তাই চোখ খুলে জানালা দিয়ে তাকিয়ে সবকিছু দেখতে শুরু
করলাম। নতুন রাস্তায় পারতপক্ষে আমি চোখ বন্ধ রাখি না। চলার পথের নতুন যায়গার
অভিজ্ঞতা নিতে থাকি। শ্রীনগর চৌরাস্তা ছেড়ে ডান দিকে টার্ন নিতেই সিংগাচুড়াবাজার,
কুসুমপুর, সিরাজদিখান, ইছাপুর আমান কোল্ডস্টোরেজ, সিরাজদিখান উপজেলা স্বাস্থ্য
কমপ্লেক্সে, মাদ্রাসা, কাকালদি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রভৃতি স্থান অতিক্রম
করতে থাকল আমাদের বাস। জানালা দিয়ে ঘাড় বাঁকা করে থেকে ততক্ষণে আমার মাথা ব্যথা
শুরু হয়ে গেছে। তবুও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সাইবোর্ডে মোটা মোটা অক্ষরের লেখাগুলো
পড়ে কোন স্থান দিয়ে আমরা যাচ্ছি এবং কোন স্থানে আমরা আছি বুঝার চেষ্টা করে যাচ্ছি।
এতে করে যখন বাস দ্রুত চলছে, বাসের গতির সাথে আমার চোখ পেড়ে উঠছে না। আমি
সাইনবোর্ডে লেখা পড়ার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। ফলে আমার চোখের ওপর চাপ বেড়ে
যাচ্ছে এবং মাথা প্রচণ্ড ব্যথা করে যাচ্ছে। তবু আমি কখনো এক চোখ বুজে, কখনো মিটিমিটি
চোখের চাহনিতে বাইরে দেখার চেষ্টা করেই যাচ্ছি! শুধু যে প্রতিষ্ঠান ও জায়গার নাম
দেখেই আমি সন্তুষ্ট হচ্ছি তা নয়। রাস্তার যানবাহন, রাস্তার পাশের গাছগাছালি, খেতের
ফসলও দেখছি। দেখে দেখে মিলাচ্ছি আমার জেলার সাথে এখানকার জেলার মিল অমিলগুলো।
মুন্সিগঞ্জ এবং শরীয়তপুর জেলা এক সময় বিক্রমপুর জেলার আওতাভুক্ত ছিল। পদ্মা নদী
অষ্টাদশ শতাব্দীর প্রথম দিকে তার গতিপথ পরিবর্তন করায়, উত্তর ও দক্ষিণ বিক্রমপুর
আলাদা হয়ে যায় এবং পরবর্তীতে পদ্মার দুই পাড়ে মুন্সিগঞ্জ এবং শরীয়তপুর নামে আলাদা
দুটি জেলার জন্ম হয়। তাই এখানকার গাছপালা এবং ফসলের খুব একটা পার্থক্য আমি পেলাম
না। তবে মুন্সিগঞ্জে প্রচুর আলুর আবাদ হয়। সে হিসেবে শরীয়তপুরে হয় না বললেই চলে।
অনেক স্থানেই চোখে পড়ল কৃষকরা আলু তুলে খেতের পাশে বস্তা ভর্তি করে রেখেছে। কাছেই
সম্রাট কোল্ড স্টোরেজ। কৃষকরা সেখানে নিয়ে যাওয়ার জন্যই বস্তা ভর্তি করে রেখেছে
হয়তো।
শ্রীনগর
থেকে শুরু হওয়া রাস্তাটি অপেক্ষাকৃত সরু। তার ওপর ৫২ সিটের তিন চারটা বাস একসাথে।
তাই বিপরীত দিক থেকে আসা গাড়িগুলো অতিক্রম করতে গিয়ে মাঝেমধ্যেই বিশাল জ্যামের
সৃষ্টি হচ্ছে। একেকবার চার-পাঁচ মিনিট আটকে থাকেতে হচ্ছে। এভাবে আমরা মুন্সিগঞ্জ
জেলা শহর অতিক্রম করে তালতলা খালের ব্রিজের ওপর পৌছালাম। তালতলা খালটি আমাদের
শরীয়তপুরের কীর্তিনাশা নদীর মতোই প্রশস্ত। তারপরও এটাকে খাল বলার কারণ খুঁজে পাই
না। এই খালটি আমার খুবই পরিচিত। আমরা ছোটোবেলা লঞ্চে করে তালতলা খালের এই ব্রিজের
নিচ দিয়ে ঢাকা যেতাম। ব্রিজটি সরু হওয়ায় ব্রিজ পার হতে আমাদের অনেক সমস্যা হচ্ছিল।
তাই অনেকেই এই রাস্তায় আসায় বাসের সুপারভাইজার এবং ড্রাইভারকে শাসাতে লাগল।
পোস্তগোলা ব্রিজ পাড় হয়ে গেলে এতো সময় লাগত না এবং রিস্কও থাকত না। অবশেষে আমরা
তালতলা বেইলি ব্রিজ পাড় হয়ে কুন্ডের চর বাজার, টঙ্গীবাড়ি, বেতকা হয়ে হাতিমারা,
রামপাল পৌঁছে গেলাম। রামপাল থেকে বুড়িগঙ্গা নদীর ওপর নতুন সেতু পার হয়ে
নারায়ণগঞ্জের বন্দর থানা হয়ে আঁকাবাঁকা রাস্তা দিয়ে চলতে থাকে গাড়ি।
আমরা
যখন নদী পথে ঢাকা যেতাম তখন এই ব্রিজটি ছিল না। ব্রিজটি মুন্সিগঞ্জ এবং নারায়ণগঞ্জ
জেলাকে সংযুক্ত করেছে। নারায়ণগঞ্জ প্রবেশ করার পর আমার মাথাব্যথা প্রচণ্ডরকম বেড়ে
যায়, ফলে বাইরে দেখা ছেড়ে চোখ বন্ধ করে রাখলাম। অবশেষে আমরা বারোটার দিকে গিয়ে
পৌঁছাই। আমাদের বাস গিয়ে থামে বড়ো সরদার বাড়ির সামনে। সেদিন শুক্রবার ছুটির দিন
হওয়ায় প্রচুর লোকের সমাগম এবং দর্শনার্থীর ভিড় ছিল। ছিল প্রচুর গাড়ি। তাই স্থানটি
ধুলোবালিতে একাকার হয়ে ছিল। আমরা বাস থেকে নেমে সরদার বাড়িতে না ঢুকে কোনো এক
অদৃশ্য হেমিলিওনের বাঁশিওলার নির্দেশে সামনের দিকে হাঁটতে লাগলাম। কিছুদূর হেঁটে
গিয়ে একটা বাড়িতে প্রবেশ করলাম। বাড়িটি খুবই পরিচ্ছন্ন। মাঝখানে ছোট্ট উঠান।
উঠানের চারপাশে বসার পাকা বেঞ্চি। মাঝখানে একটি বড়ো জামরুল গাছ। জামরুল গাছের
চারপাশটা বাঁধানো। বাড়ির পাশেই দীঘি। বাধানো ঘাট। আমরা বিভিন্ন জন বিভিন্ন স্থানে
বসে বিশ্রাম নিতে থাকলাম। কেউ দীঘির ঘাটে নেমে পা ধুতে লাগল। কেউ সিঁড়িতে বসে সেলফি
তুলতে লাগল। অনেকে প্রকৃতির ডাকে সাড়ো দিতে লাইনে দাঁড়াল। দীঘির পানি কিছুটা
নোংরা। দীঘির সিঁড়ির সাথে নাম ফলক রয়েছে। ঈশা খাঁর স্ত্রী সোনা বিবির দীঘি। দীঘির
এক পাড় থেকে অন্য পাড় ধুধু করে। আমি প্রথমে ভেবেছিলাম বাড়িটা হয়তো আমাদের ভেতরকার
কারো আত্মীয়ের বাড়ি। পরে দেখলাম আসলে তা না। এখানে এরকম অসংখ্য বাড়ি রয়েছে।
বিভিন্ন স্থান থেকে পর্যটক বা দর্শনার্থীরা দলবেঁধে আসে, কিছু সময়ের জন্য ভাড়া
নেয়। বিশ্রাম করে, খাওয়া দাওয়া করে। বিনিময়ে ভাড়া দেয় এবং শেষে চলে আসে। আমরা গিয়ে
একটু বিশ্রাম নেওয়ার পরে জুমার আজান হয়ে যায়। আমরা কয়েকজন জুমার নামাজ পড়তে যাই।
পাশেই মসজিদ কিন্তু যাওয়ার রাস্তাটা এত এলোমেলো যে খুঁজেই পাচ্ছিলাম না। হুজুরের
খুতবা শুনতে পাচ্ছিলাম কিন্তু মসজিদ খুঁজে পাচ্ছিলাম না। নামাজ পড়ে দ্রুত ওই
বাড়িতে চলে আসি। দুপুরের খাবারের আয়োজন চলছিল। কিছু কিছু খাবার শরীয়তপুর থেকেই
হালকা ফ্রাই বা রান্না করে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। বাকিটা ওখানে গিয়ে রান্না করা হয়।
কিন্তু স্কুলের শিক্ষক প্রতিনিধিরা একটি বিষয়ে দ্বিধা বিভক্ত ছিল। কেউ বলছে খেয়ে
বের হবে, কেউ বলছে পাশের সরদার বাড়ি দেখে এসে খেয়ে তারপর পানাম নগরী যাবে।
শেষ
পর্যন্ত সিদ্ধান্ত হয় খেয়ে তারপর বের হওয়াই শ্রেয়। কারণ একবার গিয়ে ফিরে এসে
খেয়েদেয়ে আবার যাওয়া অনেক বেশি সময় সাপেক্ষ। দুইবার যেতে আসতে অনেক বেশি সময় কিল
হবে। শেষে বের হতে হতে প্রায় তিনটে।
সরদার
বাড়ি এবং লোকশিল্প জাদুঘর ওই বাড়ির পাশেই। কিন্তু আমার স্ত্রীর বলল, ‘আমরা এখানে
আগে যাব না, পানাম নগরীতে আগে যাব। আমরা সরদার বাড়ি দেখে ওখানে গিয়ে কিছু দেখতে
পারবো না।’ আমাদের সফর সঙ্গীর অনেকেই সরদার বাড়িতে আগে ঢুকলো কিন্তু আমরাসহ কয়েকজন
একটি গাড়িতে চড়ে দ্রুতই পানাম নগরী চলে গেলাম।
পানাম
নগর নারায়ণগঞ্জ জেলার সোনারগাঁওতে অবস্থিত একটি ঐতিহ্যবাহী প্রাচীন শহর। বড় নগর,
খাস নগর এবং পানাম নগরের মধ্যে পানাম সবচেয়ে প্রাচীন এবং আকর্ষণীয়। এখানে কয়েক
শতাব্দী পুরনো অনেক ভবন রয়েছে, যা বাংলার বারো ভূইয়াঁদের ইতিহাসের সাথে সম্পর্কিত।
১০ বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে এই নগরী গড়ে ওঠে। মজার বিষয় হচ্ছে সোনারগাঁও বলতে আমি
ঈশা খাঁর রাজধানীকে বুঝতাম। কিন্তু পানাম নগরী যে ঈশা খাঁর রাজধানীর একটা অংশ সেটা
আমি আসলে জানতাম না। আমি ভেবেছিলাম সোনারগাঁও এবং পানাম নগরীর একটির অপরটির সাথে কোনো সংযোগ নেই। কিন্তু পানাম নগরীতে গিয়ে আমার সে ভুল ভাঙে। অটো রিক্সা আমাদের পানাম নগরীর কাছে নিয়ে নামায়। ছোট একটি কালর্ভাট পেরিয়েই পানাম নগরের প্রবেশ দ্বার। পূর্বে কালর্ভাটের স্থানে ৭২ ফুট দৈর্ঘ্য এবং ১৫.৫ ফুট প্রস্থ অর্ধচন্দ্রাকৃতি উঁচু একটি পুল ছিল। আমরা টিকেট কেটে প্রবেশ করলাম। পানাম নগরীর বুক চিরে চলে গেছে পানাম সড়ক। আর সড়কের দুপাশে সারি সারি আবাসিক একতলা ও দ্বিতল বাড়িতে ভরপুর পানাম নগর। আমরা পানাম সড়ক ধরে হাঁটা শুরু করলাম।
পানাম সড়কের দুই পাশে পানামের টিকে থাকা বাড়িগুলোর মধ্যে ৫২টি বাড়ি উল্লেখযোগ্য।
পানাম সড়কের উত্তর পাশে ৩১টি, আর দক্ষিণ পাশে ২১টি বাড়ি রয়েছে। যার বেশিরভাগ বাড়িই
উনবিংশ শতাব্দির (১৮১৩ খ্রিষ্টাব্দের) নামফলক রয়েছে। বাড়িগুলোর অধিকাংশই আয়তাকার,
উত্তর-দক্ষিণে বিস্তৃত, উচ্চতা একতলা থেকে তিনতলা। বাড়িগুলোর স্থাপত্যে ঔপনিবেশিকতা
ছাড়াও মোঘল, গ্রিক এবং গান্ধারা স্থাপত্যশৈলীর সাথে স্থানীয় কারিগরদের
শিল্পকুশলতার অপূর্ব সংমিশ্রণ দেখা যায়। প্রতিটি বাড়িই ব্যবহারোপযোগিতা, কারুকাজ,
রঙের ব্যবহার এবং নির্মাণকৌশলের দিক দিয়ে উদ্ভাবনী কুশলতায় ভরপুর। ইটের সঙ্গে
ব্যবহার করা হয়েছে ঢালাই-লোহার তৈরি ব্র্যাকেট, ভেন্টিলেটর আর জানালার গ্রিল।
মেঝেতে রয়েছে লাল, সাদা, কালো মোজাইকের কারুকাজ। প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই খিলান ও
ছাদের মধ্যবর্তী স্থানে নীল ও সাদা ছাপ দেখা যায়। এছাড়া বাড়িগুলোতে নকশা ও কাস্ট
আয়রনের কাজ নিখুঁত। কাস্ট আয়রনের এই কাজগুলো ইউরোপের কাজের সমতুল্য বলে
বিশেষজ্ঞদের অভিমত। এর সাথে আছে সিরামিক টাইলসের রূপায়ণ। প্রতিটি বাড়িই অন্দরবাটি এবং
বহির্বাটি—এই দুই ভাগে বিভক্ত। বেশিরভাগ বাড়ির চারদিকের ঘেরাটোপের ভিতর আছে
উন্মুক্ত উঠান।
ইতিহাস
থেকে জানা যায় ১৫ শতকে ঈসা খাঁ বাংলার প্রথম রাজধানী স্থাপন করেছিলেন সোনাগাঁওয়ে।
পূর্বে মেঘনা আর পশ্চিমে শীতলক্ষ্যা নদীপথে বিলেত থেকে আসতো বিলাতি থানকাপড়, দেশ
থেকে যেতো মসলিন। পরবর্তীতে এই পোশাক বাণিজ্যের স্থান দখল করে নীল বাণিজ্য।
ইংরেজরা এখানে বসিয়েছিলেন নীলের বাণিজ্যকেন্দ্র। মূলত পানাম ছিলো বাংলার সে সময়কার
ধনী ব্যবসায়ীদের বসতক্ষেত্র। ব্যবসায়ীদের ব্যবসা ছিলো ঢাকা-কলকাতা জুড়ে। তারাই গড়ে
তোলেন এই নগর। পানাম নগরীর পরিকল্পনাও নিখুঁত। নগরীর পানি সরবরাহের জন্য দুপাশে
২টি খাল ও ৫টি পুকুর আছে। প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই আছে কুয়া বা কূপ। নগরীকে
জলাবদ্ধতামুক্ত রাখতে করা হয়েছে খালের দিকে ঢালু। প্রতিটি বাড়ি পরস্পর থেকে
নির্দিষ্ট দূরত্বে রয়েছে। নগরীর ভিতরে আবাসিক ভবন ছাড়াও আছে মসজিদ, মন্দির, গীর্জা,
মঠ, গোসলখানা, নাচঘর, পান্থশালা, চিত্রশালা, খাজাঞ্চিখানা, দরবার কক্ষ, গুপ্ত পথ,
বিচারালয়, পুরনো জাদুঘর।
অসংখ্য মানুষের পদচারণায় মুখর পানাম নগরীর দুপাশের স্থাপনা দেখতে দেখতে বিভিন্ন ভঙ্গিতে বিভিন্ন স্থাপনার সামনে ও ভিতরে ছবি তুলতে তুলতে এগুতে লাগলাম আমরা। আমি একটি দরবার কক্ষে প্রবেশের সিঁড়িতে বসে ছবি তুললাম। দোতালার দরবার কক্ষটি তালা মারা তাই প্রবেশ করতে পারলাম না। তবে দুঃখের বিষয় হচ্ছে—অযত্ন আর অবহেলায় পানাম নগরের বাড়িঘরগুলোতে শ্যাওলা ধরেছে, ভেতরের পরিবেশটা স্যাঁতস্যাঁতে, গুমোট। বাড়িগুলোর দেয়ালে গজাচ্ছে গাছপালা, অনেক বাড়ির ভিতরে ঢুকে গেছে গাছের শিকড়। অনেক ঘরের চৌকাঠ ও রেলিং খুলে পড়েছে। চুরি হচ্ছে কড়িকাঠ ও তক্তা। ফলে বিভিন্ন সময় বাড়িগুলোর ছাদ ধ্বসে পড়ছে, ভেঙে পড়ছে সিঁড়ি ও দেয়াল। পরিত্যক্ত এসব বাড়িগুলোর অনেকগুলোতে মানুষ কিংবা পশু-পাখি মলমূত্র ত্যাগ করে থাকে। অনেক বাড়িরই সিরামিক টাইলসে ভাঙন ধরেছে, খিলানে ধরেছে মরিচা। কোনো কোনো বাড়ির কার্ণিশে গজিয়েছে আগাছা। কখনো কখনো পুরো বাড়ি বা বাড়ির অংশ বিশেষ সম্পূর্ণ ধ্বসে পড়ছে।
এই
নগরীতে যখন জনবসতি ছিল এবং জন-মানুষের কর্মচাঞ্চলে মুখর ছিল তখন কী রকম ছিল এই
পানাম নগরী আমি তা ভাবার চেষ্টা করি। আমরা আস্তে আস্তে একেবারে শেষ প্রান্তে গিয়ে
পৌঁছে যাই। ততক্ষণে আমার মাথা ব্যথা চরম পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। শেষপ্রান্তে গেটের
বাইরে একটি ছোট্ট চায়ের দোকান পেয়ে গেলাম। সেখান থেকে সবাই মিলে চা পান করি। চা
পান শেষে আমরা দ্রুত পানাম সড়ক ধরে ফিরে যেতে থাকলাম। সময় কম ছিল আমাদের সর্দার
বাড়ি যেতে হবে। ঘড়ির কাটা যেন আজ দ্রুত ঘুরছে। পানাম নগরীতে বিদেশি অনেক পর্যটক
ছিল। আমার স্ত্রী এবং বাচ্চারা তাদের সাথে ছবি তুলল এবং কুশল বিনিময় করল। আমি
পানাম নগরের স্থাপত্যশৈলী দেখে দেখে আমার মাথা ব্যথা ভুলে থাকার চেষ্টা করলাম।
অবশেষে
আমরা পানাম নগরী থেকে বেরিয়ে আরেকটা রিক্সা ধরে সরদার বাড়ি পৌঁছাই। সরদার বাড়ি
গিয়ে প্রথমে শিল্পাচার্য জয়নুল লোক ও কারুশিল্প জাদুঘরে প্রবেশ করি। সেখানে
অবহেলিত গ্রামীণ বাংলার নিরক্ষর শিল্পীদের হস্তশিল্প এবং জনজীবনের দৈনন্দিন
পণ্যাদি সংরক্ষিত রয়েছে। গ্যালারিগুলিতে কাঠের খোদাই, কারুশিল্প, চিত্রকর্ম এবং
মুখোশ, উপজাতি জীবন-ভিত্তিক নিদর্শন, গ্রামীণ লোকজীবন পরিবেশ, লোক বাদ্যযন্ত্র এবং
পোড়ামাটির নিদর্শন, তামা-ঢালাই-পিতলের নিদর্শন, লোহার তৈরি নিদর্শন, লোক অলঙ্কার
এবং আরও অনেক কিছু প্রদর্শিত হয়। বাংলার প্রকৃতি ও পরিবেশ কেন্দ্রিক ঐতিহ্যবাহী এ
সকল জিনিস আমি আমার মেয়েদের দেখাই এবং কোনটি দিয়ে কী কাজ করা হয় এবং করা হতো তার
বর্ণনা দেই।
লোক
ও কারুশিল্প জাদুঘর থেকে বেরিয়ে আমরা বড় সরদার বাড়িতে প্রবেশ করব কিন্তু প্রবেশের
সময় একেবারেই নেই। বাইরে থেকে সরদার বাড়ির সৌন্দর্য দেখলেই যে কেউ ভিতরে প্রবেশ
করতে চাইবে। আমরাও তাই করলাম সময় একেবারেই নেই সরদার বাড়িতে ঢোকার—তারপরও আমরা জনপ্রতি ১০০
টাকা খরচ করে সরদার বাড়িতে প্রবেশ করলাম। বড় সর্দার বাড়ি সোনারগাঁ এ অবস্থিত একটি
সুদৃশ্য ভবন। দুটি ভাগবিশিষ্ট সর্দারবাড়ির ছোট প্রবেশমুখের ভাগটিতে একটি দেয়াললিখন
থেকে জানা যায় যে, এই ভবনের পিছনে চারপাশের তিনটি ভবন মুঘল আমলের প্রথমদিকে
নির্মিত। মধ্যভাগের লাল বর্গাকার ভবনটি বাংলার বারো ভূঁইয়ার সময় নির্মিত হয়েছে।
সামনের অংশ ১৯০২ সালে নির্মাণ করা হয়। এর নিচতলায় ৪৭টি এবং দ্বিতীয় তলায় ৩৮টি কক্ষ
বিদ্যমান। ২০১২ সালের দিকে ‘সিএসআর’ (কর্পোরেট সোসিয়াল রেসপন্সিবিলিটি) অর্থাৎ
সামাজিক দায়বদ্ধতার অংশ হিসেবে চীনা বহুজাতিক কোম্পানি ইয়ংওয়ান করপোরেশন ২০ লক্ষ
ডলার ব্যয়ে সর্দার বাড়িটি যথাযথভাবে সংরক্ষণের উদ্যোগ নেয়। ফলে বর্তমানে বাড়িতে
দেখতে একেবারেই নতুনের মতো চকচক করছে। পশ্চিম ও দক্ষিণ দিকে এর দুটি সুসজ্জিত
প্রবেশ পথ রয়েছে। দক্ষিণের প্রবেশমুখের বারান্দাটি ২৫ ফুট দীর্ঘ এবং কাদামাটির
ফুলপাতা ও চিনামাটির কাটা টুকরার নকশাসজ্জিত অর্ধবৃত্তাকার তোরণের সঙ্গে যুক্ত।
বাঁকা তোরণটির নকশায় মোজাইকের মতো বিভিন্ন লতাপাতা ও জ্যামিতিক আকৃতির ব্যবহার
দেখা যায়। তোরণটির উভয়দিকে তিনটি ছোট গোলাকার স্তম্ভ ও দুটি বড় করিন্থিয়ান স্তম্ভ রয়েছে—যেগুলোর প্রত্যেকটি ক্রমান্বয়ে সাদা ও কালো
মোজাইকের সর্পিল বলয় দ্বারা সজ্জিত। উভয় দিকের অর্ধবৃত্তাকার চূড়াযুক্ত
জানালাগুলোও সরু করিন্থীয়
স্তম্ভ দ্বারা স্থাপিত। বারান্দার উপরের প্যারাপেট মুক্ত লতাপাতার নকশায় সাজানো।
উপরের
দেয়ালের লিখনে এর নির্মাণকাল ১৩০৮ বঙ্গাব্দ লেখা আছে। সম্পূর্ণ আয়তাকার ব্লকটি দ্বিতল বিশিষ্ট ভবন। এতে বিভিন্ন আয়তনের প্রায়
৭০টি কক্ষ আছে। পূর্বদিকে ৫০ ফুট × ৫০ ফুট আর পশ্চিম দিকে ৫০ ফুট × ২৫ ফুট খোলা
আঙিনা রয়েছে। সুসজ্জিত পশ্চিম দুয়ারে ইটের তৈরি বাঁধানো ঘাটসহ একটি দিঘি বিদ্যমান,
যার পাড়ে দুজন ইংরেজ অশ্বারোহীর মানবাকার পরিমিত মূর্তি রয়েছে। আমরা সেখানে ছবি তুললাম। সর্দারবাড়ির ভিতরে
প্রবেশ করে দেখি ভিতরের খোলা স্থানে বিজ্ঞাপনের শুটিং হচ্ছে। নায়ক, নায়িকা
একাধিকবার পোজ দিচ্ছেন। একটা কক্ষে ফ্যান কিংবা এসি নেই তারপরও পরিবেশটা ঠাণ্ডা।
ওখানে সব সময় নির্দিষ্ট তাপমাত্রা বিরাজ করে। কয়েকটি কোনায় রয়েছে বৃষ্টির পানি ধরে
রাখার অনেক বড়ো বড়ো মাটির পাত্র। মাঝখানের একটি কক্ষে রয়েছে পুরানো আমালের একটি খাট।
সরদার
বাড়ির ভেতরে অবস্থানের সময় শেষ হয়ে গেলে আমরা বেরিয়ে পুকুর ঘাটে ঘোড়ার কাছে ও
সিড়িতে বসে আমাদের সাথে থাকা আরেকটি পরিবার মিলে ছবি তুললাম। মাগরিবের আগ মুহূর্তে
সরদার বাড়ি থেকে চলে এলাম সেই বাড়িটিতে, যেখানে প্রথমে আমরা উঠেছিলাম। এরপর সবাই
মিলে শরীয়তপুরের উদ্দেশ্যে বাসে উঠলাম। এবার বাস ঢাকা হয়ে শরীয়তপুরের উদ্দেশ্যে
যাত্রা করল। ঢাকায় অনেক জ্যামে পড়তে হলো। আমরা প্রায় রাত বারোটার সময় বাসায়
পৌঁছালাম। কিন্তু আসার পথে কয়েটি লাইন মাথার ভেতর ঘুরপাক খাচ্ছিল:
খসেপড়া পলেস্তারার নিচ থেকে
জেগে ওঠা
ইটেরা সাক্ষি মানে পানাম
নগরীরে
চিরস্থায়ী নয় কোনো রাজা,
মহারাজার রত্নখচিত অট্টালিকা
ক্ষয়ে যায় একদিন ধীরে...
অপূর্ব সুন্দরী অবয়বে ধনী
বণিকের নিকেতন রূপে
যে নগরী গড়ে উঠেছিল
শীতলক্ষার ধারে
কতো শ্রমে, কতো ঘামে—শুকিয়ে গেছে, মিলিয়ে গেছে...
একদিন ঠিক এভাবেই ভুলে যাবো—বারো ভূঁইয়া শ্রেষ্ঠ ঈসা খাঁ’রে।
