জীবনানন্দ দাশের তিনটি কবিতা

জীবনানন্দ দাশের তিনটি কবিতা

জীবনানন্দ দাশের তিনটি কবিতা

অন্ধকার

গভীর অন্ধকারের ঘুম থেকে নদীর চ্ছল চ্ছল শব্দে জেগে উঠলাম আবার;
তাকিয়ে দেখলাম পাণ্ডুর চাঁদ বৈতরণীর থেকে তার অর্ধেক ছায়া
গুটিয়ে নিয়েছে যেন
কীর্তিনাশার দিকে।

ধানসিড়ি নদীর কিনারে আমি শুয়েছিলামপউষের রাতে
কোনোদিন আর জাগবো না জেনে
কোনোদিন জাগবো না আমি
কোনোদিন জাগবো না আর

হে নীল কস্তুরী আভার চাঁদ,
তুমি দিনের আলো নও, উদ্যম নও, স্বপ্ন নও,
হৃদয়ে যে মৃত্যুর শান্তি ও স্থিরতা রয়েছে
রয়েছে যে অগাধ ঘুম
সে-আস্বাদ নষ্ট করবার মতো শেলতীব্রতা তোমার নেই,
তুমি প্রদাহ প্রবহমান যন্ত্রণা নও

জানো না কি চাঁদ,
নীল কস্তুরী আভার চাঁদ,
জানো না কি নিশীথ,
আমি অনেক দিন
অনেক অনেক দিন
অন্ধকারের সারাৎসারে অনন্ত মৃত্যুর মতো মিশে থেকে
হঠাৎ ভোরের আলোর মূর্খ উচ্ছ্বাসে নিজেকে পৃথিবীর জীব ব’লে
বুঝতে পেরেছি আবার;
ভয় পেয়েছি,
পেয়েছি অসীম দুর্নিবার বেদনা;
দেখেছি রক্তিম আকাশে সূর্য জেগে উঠে
মানুষিক সৈনিক সেজে পৃথিবীর মুখোমুখি দাঁড়াবার জন্য
আমাকে নির্দেশ দিয়েছে;
আমার সমস্ত হৃদয় ঘৃণায়
বেদনায়আক্রোশে ভ’রে গিয়েছে;

সূর্যের রৌদ্রে আক্রান্ত এই পৃথিবী যেন কোটি-কোটি শূয়োরের আর্তনাদে
উৎসব শুরু করেছে।
হায়, উৎসব!
হৃদয়ের অবিরল অন্ধকারের ভিতর সূর্যকে ডুবিয়ে ফেলে
আবার ঘুমোতে চেয়েছি আমি,
অন্ধকারের স্তনের ভিতর যোনির ভিতর অনন্ত মৃত্যুর মতো মিশে
থাকতে চেয়েছি।


হে নর, হে নারী,
তোমাদের পৃথিবীকে চিনিনি কোনোদিন;
আমি অন্য কোনো নক্ষত্রের জীব নই।
যেখানে স্পন্দন, সংঘর্ষ, গতি, যেখানে উদ্যম, চিন্তা, কাজ,
সেখানেই সূর্য, পৃথিবী, বৃহস্পতি, কালপুরুষ, অনন্ত আকাশগ্রন্থি,
শত-শত শূকরের চিৎকার সেখানে,
শত-শত শূকরীর প্রসববেদনার আড়ম্বর;
এই সব ভয়াবহ আরতি!

গভীর অন্ধকারের ঘুমের আস্বাদে আমার আত্মা লালিত;
আমাকে কেন জাগাতে চাও?
হে সময়গ্রন্থি, হে সূর্য, হে মাঘনিশীথের কোকিল, হে স্মৃতি, হে হিম হাওয়া,
আমাকে জাগাতে চাও কেন।

অরব অন্ধকারের ঘুম থেকে নদীর চ্ছল চ্ছল শব্দে জেগে উঠবো না আর;
তাকিলে দেখবো না নির্জন বিমিশ্র চাঁদ বৈতরণীর থেকে
অর্ধেক ছায়া গুটিয়ে নিয়েছে
কীর্তিনাশার দিকে।
ধানসিড়ি নদীর কিনারে আমি শুয়ে থাকবো
ধীরেপউষের রাতে
কোনোদিন জাগবো না জেনে

কোনোদিন জাগবো না আমিকোনোদিন আর।

 

তবু তাহা ভুল জানি

তবু তাহা ভুল জানি … রাজবল্লভের কীর্তি ভাঙে কীর্তিনাশা;
তবুও পদ্মার র‍ূপ একুশরত্নের চেয়ে আরো ঢের গাঢ়
আরো ঢের প্রাণ তার, বেগ তার, আরো ঢের জল, জয় আরো;
তোমারো পৃথিবী পথ; নক্ষত্রের সাথে তুমি খেলিতেছ পাশা:
শঙ্খমালা নয় শ‍ুধু:অনুরাধা রোহিণীরও চাও ভালোবাসা,
না জানি সে কত আশাকত ভালোবাসা তুমি বাসিতে যে পার!

এখানে নদীর ধারে বাসমতী ধানগ‍ুলো ঝরিছে আবারো;
প্রান্তরের কুয়াশায় এইখানে বাদুড়ের যাওয়া আর আসা

এসেছে সন্ধ্যার কাক ঘরে ফিরে;দাঁড়ায়ে রয়েছে জীর্ণ মঠ;
মাঠের আঁধার পথে শিশ‍ু কাঁদেলালপেড়ে পুরোনো শাড়ির

ছবিটি মুছিয়া যায় ধীরে ধীরেকে এসেছে আমার নিকট?

‘কার শিশ‍ু? বল তুমি’:শ‍ুধালাম; উত্তর দিল না কিছু বট;
কেউ নাই কোনোদিকেমাঠে পথে কুয়াশার ভিড়;

তোমারে শ‍ুধাই কবি: ‘তুমিও কি জান কিছু, এই শিশুটির।’

 

মনে হয় একদিন

মনে হয় একদিন আকাশে শুকতারা দেখিব না আর ;
দেখিব না হেলেঞ্চার ঝোপ থেকে একঝাড় জোনাকি কখন
নিভে যায়
দেখিব না আর আমি এই পরিচিত বাঁশবন ,
শুঁকনো বাঁশের পাতা-ছাওয়া মাটি হয়ে যাবে গভীর আঁধার
আমার চোখের কাছে
লক্ষ্মীপূর্ণিমার রাতে সে কবে আবার
পেঁচা ডাকে জোছনায়
হিজলের বাকা ডাল করে গুঞ্জরন ;
সারা রাত কিশোরীর লাল পাড় চাঁদে ভাসে
হাতের কাঁকন
বেজে ওঠে : বুঝিব না
গঙ্গাজল ,নারকোলনাড়ুগুলো তার

জানি না সে কারে দেবেজানি না সে চিনি আর সাদা তালশাঁস
হাতে লয়ে পলাশের দিকে চেয়ে দুয়ারে দাড়ায়ে রবে কি না …
আবার কাহার সাথে ভালবাসা হবে তার
আমি তা জানি না;
মৃত্যুরে কে মনে রাখে ?… কীর্তিনাশা খুঁড়ে খুঁড়ে চলে বারো মাস
নতুন ডাঙার দিকে
পিছনের অবিরল মৃত চর বিনা
দিন তার কেটে যায়
শুকতারা নিভে গেলে কাঁদে কি আকাশ ??

Post a Comment (0)
Previous Post Next Post