শুভ জন্মদিন।।সুলতান মাহমুদ
জন্মদিন নামে যে একটা বিশেষ দিন আছে তা সজলের প্রায়ই মনে থাকে না। নেহাৎ কেউ মনে করে দিলেই তার মন পড়ত- অ হ্যাঁ আজতো আমার জন্মদিন! তবে সজল বোধহয় একটু সেকেলে। এই ফেসবুক টুইটারের যুগে বিষয়টি বড্ড বেমানান। অবশ্য আজকাল জন্মদিন পালন একটা ট্রেন্ড হয়ে দাঁড়িয়েছে। এটা যেন একটা অবশ্য পালনীয় বিষয়। একটা কালচার। কিছু কালচার আছে যাতে মানুষ একসময় অভ্যস্ত হয়ে যায়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কল্যাণে এসব চর্চা আরো বেড়েছে। ভার্চুয়ালি অনেক দিবসই যথাযথ মর্যাদায় পালিত হয়। যেমন- বাবা দিবস, মা দিবস, ম্যারিজ ডে, ঈদ, পুজা- পার্বণ ইত্যাদি। হয়ত সারা বছর কেউ আপনাকে মনে করবে না কিন্তু জন্মদিনে সো আপনাকে শুভেচ্ছা জানাল কিংবা ঈদের সময় জানাল "ঈদ মোবারক"। দূর থেকে হলেও এর মাধ্যমে ক্ষয়ে যাওয়া সুতোয় যেন জোড়া লাগে। সেহিসেবে সজল বিষয়গুলো পজেটিভলিই দেখে। তবে মাঝে মাঝে ভয়ও হয়। সজলের প্রায়ই মনে হয় ইদানীং মানুষ সুখে থাকার অভিনয় করে। আর সে অভিনয়ের সফল মঞ্চায়ন হয় সামাজিক মাধ্যমে। যেমন- দেখা গেল ফেসবুকে স্বামী- স্ত্রীর একটা হাস্যোজ্জ্বল যুগল ছবি আবার কয়দিন বাদেই দেখা যায় তাদের ছাড়াছাড়ি হয়ে গেছে। তাই বাইরের সো অফের সাথে ভিতরের সুখে থাকার পরিমাপটা ঠিক মেলানো যায় না। সজলের জন্মদিনে সবচেয়ে বেশি উইশ করত তার ছোট বোন সানজিদা ও বন্যা। তখন ফেইসবুক তেমনভাবে চালু হয়নি। মুঠোফোনের কল্যাণে ক্ষুদে বার্তায় ভেসে উঠত - শুভ জন্মদিন ভাইয়া। অবশ্য এ বিশেষ দিনে ছোট বোনদের এভাবে স্মরণ করার বিষয়টা সজলের খারাপ লাগত না। নিজেকে খুব গুরুত্বপূর্ণ মনে হত। তবে সজল সেটা বাইরে প্রকাশ করত না। সে ধন্যবাদ জানিয়ে তার বোনদের একবার পাল্টা বার্তা পাঠিয়েছিল- " যখন ফিলিস্তিনে শিশুরা মারা যায়, ক্ষুধার জ্বালায় পৃথিবীর লাখো মানুষ অনাহারে থাকে তখন আমি কিভাবে জন্মদিন পালন করি? এ বার্তা যদিও ওদের ভড়কে যাওয়ার কথা তবে ওরা ভড়কে না গিয়ে প্রতিবছর নিয়ম করে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানাত। সজলের জন্মদিন এলেই মনে পড়ে খোদার আরশের সেই গাছটির কথা। পৃথিবীতে যত মানুষ আছে ঐ গাছে নাকি ঠিক ততটি পাতা আছে। মানুষের মৃত্যুর চল্লিশ দিন আগে ঐ গাছে পাতাটি পাকতে শুরু করে। মৃত্যুর ঠিক আগ মূহুর্তে পাতাটি মৃত্যুর ফেরেশতার নিকট এসে পৌঁছায়। পাতাটিতে যে ব্যক্তি মারা যাবে তার নাম ঠিকানা লেখা থাকে। মৃত্যুর ফেরেশতা পাতাটি পেয়ে যথা নিয়মে উক্ত ব্যক্তির মৃত্যু পরোয়ানা নিয়ে হাজির হয়। মৃত্যু নিয়ে একটা কথা প্রচলিত আছে। যার যেখানে মৃত্যু হবে মৃত্যুর আগে যে করেই হোক সে সেখানে পৌঁছবেই। একবার হলো কি নবী সুলেমান (আঃ) এর সময় এক ব্যক্তির মৃত্যু হওয়ার কথা সূর্যের মধ্যে। কিন্তু মৃত্যুর ঠিক আগ মুহূর্তে মৃত্যুর ফেরেশতা নবী সুলেমানের দরবারে এসে দেখতে পেলেন লোকটি সেখানে বসে আছেন। তিনি লোকটার দিকে কড়া চোখে তাকালেন। যেন বলতে চাইছেন ; তোমারতো এখন মৃত্যু হওয়ার কথা সূর্যের মধ্যে কিন্তু তুমি এখানে কেন? লোকটা মৃত্যুর ফেরেশতা দেখে ভয় পেয়ে আল্লাহর কাছে সূর্যে উঠিয়ে নেয়ার দোয়া করলেন। আল্লাহ তায়ালা তার দোয়া কবুল করলেন। মৃত্যুর ফেরেশতা যথাসময়ে সূর্যে গিয়ে তার জান কবজ করল। সজল মাঝে মাঝে ভাবে তার নামে আরশে আজিমের পাশের গাছে যে পাতাটি আছে তাতে কি কোন পাক ধরেছে? তবে মাঝে মাঝে মনে হয় জীবন সুন্দর তেমনি মৃত্যুও সুন্দর। বেদনাদায়ক সুন্দর! মৃত্যু আছে বলেই জীবনের এত দাম। মৃত্যু না থাকলে জীবনের কোন অর্থ থাকে না। আর শুধু বেঁচে থাকার জন্য বেঁচে থাকাকে কেউ জীবন বলে না। তেলাপোকার হাজার বছর বেঁচে থাকা সেটা তেলাপোকারই জীবন অপর দিকে সিংহের একদিন বেঁচে থাকা সেটা সিংহেরই জীবন। একবার এক রাজপুত্র যুবক বয়সে এক সুন্দরী দেবীর প্রেমে পড়েছিল। সে চেয়েছিল সারা জীবন দেবীর সাথে থাকতে। ঈশ্বরের কাছে সে মৃত্যুহীন জীবন চেয়েছিল। ঈশ্বর নিরব হেসে তাকে তা দান করেছিলেন। কিন্তু দেবী চির যৌবনা। তার যেমন মৃত্যু নেই তেমনি তার যৌবনেরও ক্ষয় নেই। কিন্তু রাজপুত্র যৌবন স্থায়ী নয়। সে আত্মার অমরত্ব লাভ করলেও দেহের অমরত্ব লাভ করেনি। ফলে যৌবনে ভাটা পড়তে পড়তে একসময় থুত্থুড়ে বুড়ো হয়ে গেল। চির যৌবনা দেবী একসময় তাকে পারিত্যাগ করল। কিন্তু রাজপুত্র অনাদরে অবহেলায় পড়ে রইলো বন পাহাড়ে। একসময় সে মৃত্যু কামনা করল। কিন্তু মৃত্যু আসে না। জীবনের বোঝা সে বইতে পারে না। তার সুন্দর সুকোমল দেহ পরিণত হয় একটা মাংশপিন্ডে। নিজেকে এক সময় নিজেই ঘৃণা করতে শুরু করে। চায় মৃত্যু। কিন্তু তার বহু আরাধ্য মৃত্যু আর আসে না! গালিভারস ট্টাভেলেসে সজল এরকম কিছু মানুষের কথা পড়েছিল। যারা কখনো মৃত্যুবরণ করত না। তাদের দুঃখ দুর্দশা দেখে গালিভারের মন কেঁদে উঠে। তাই প্রকৃতির নিয়মে জন্ম যেমন সুন্দর তেমনি মৃত্যুও সুন্দর। সুকান্ত যর্থাথই বলেছেন, " এসেছে নতুন শিশু তাকে ছেড়ে দিতে হবে স্থান.. "। কিন্তু সজল মাঝে মাঝে ভাবে তার জন্ম কেন হল? তাকে নিয়ে খোদার কি পরিকল্পনা? অবশ্যই অহেতুক কোন কারণে তার জন্ম হয়নি। কিছু মহান দায়িত্ব পালনের জন্যই তাকে পৃথিবীতে পাঠানো হয়েছে। কিন্তু সজল কি সে দায়িত্ব পালন করতে পারছে? দায়িত্ব পালনের অবহেলায় খোদা কি তাকে পাকড়াও করবে? প্রতি জন্মদিনে বিষয়টা তাকে ভাবায়। সূরা আসরের একটা আয়াত আছে। সময়ের কসম, নিশ্চয়ই মানুষ ক্ষতির মধ্যে রয়েছে। আল্লাহ সময়ের কসম করছেন। সময় অত্যন্ত দামি জিনিস। মানুষ স্বর্ণ মুদ্রাকে দামি মনে করে কিন্তু সময় তারচেয়ে অনেক বেশি দামি। সজল মনে মনে ভাবে- জীবনে কত সময় হেলায় কাটিয়ে দিলাম অথচ পৃথিবীর সফল মানুষেরা সবচেয়ে বেশি মূল্যায়ন করেছেন সময়ের। তাই তারা হতে পেরেছেন মহান, বেঁচে থেকেও অমর। সজল সময়কে দুভাগে ভাগ করে। জীবিত সময় ও মৃত সময়। যে সময়টা কাজে লেগেছে সে সময়টাই জীবিত কিন্তু যে সময়টা হেলায় নষ্ট করা হয়েছে তাই মৃত। সেহিসেবে সজল তাকিয়ে দেখে জীবনের অনেকটা সময় সে বেঁচে থেকেও মৃত ছিল। আসলে মৃত্যুই মানুষের মৃত্যু ঘটায় না বরং অর্থহীন জীবনই মানুষের আসল মৃত্যু ঘটায়। যে জীবন পোকামাকড়ের মত কিংবা পশুর মত। জন্মালাম, খেলাম, মারা গেলাম। মানুষের জীবন আসলে আরও বড় কিছু। কিন্তু সেই বড় কিছুটা করার পথে কি সজল এখনো হেঁটেছে?
আজ সজলের জন্মদিন ছিল। সজলের স্ত্রী রাতের প্রথম প্রহরেই তাকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানিয়েছে। বেলা বাড়ার সাথে সাথে আত্মীয়- স্বজন, বন্ধু-বান্ধব, বহু পরিচিতজন তাকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানিয়েছে। তারা ভালোবাসা থেকেই কাজটি করেছে। সজল ভালোবাসার কাছে বড্ড অসহায়। মান্নাদের একটি গান আছে- শুধু একদিন ভালোবাসা পেতে চাই, চাই না বাঁচতে আমি প্রেমহীন হাজার বছর। ভালোবাসাহীন পৃথিবীতে বেঁচে থাকা আসলেই কঠিন। তাই সজলের জন্মদিনে তাকে যারা ভালোবাসা জানিয়েছে তাদের ভালোবাসায় সে আপ্লূত। হয়ত এ ভালোবাসার দাম সে কোনদিনই পরিশোধ করতে পারবে না।
এখন মাঝ রাত। আর কিছুক্ষণের মধ্যেই দিনটি শেষ হবে। আবার এক বছর বেঁচে থাকলে এমনি করে সে হয়ত জন্মদিনের শুভেচ্ছার জোয়ারে ভেসে যাবে। দূর অন্ধকারে একটা কুপ পক্ষি অবিরাম ডেকে যাচ্ছে। কুপ..কুপ..কুপ। প্রচলিত আছে এ পাখি মানুষের মৃত্যুর গন্ধ পায়। সে ডেকে ডেকে মানুষকে সর্তক করে মৃত্যু সম্বন্ধে। আজ এ জন্মদিনে কুপ পক্ষির ডাক শোনে সজলের মনে সে মৃত্যু চিন্তাই ক্ষণে ক্ষণে জেগে উঠে।
