নূরুদ্দীনের জুলাই ।। তৌহিন হাসান
নূরুদ্দীন সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললেন, যে করেই হোক
বাসায় ফিরবেন তিনি। গত ছয়দিন ধরে তিনি অফিসে থাকছেন, খাচ্ছেন, ঘুমাচ্ছেন এবং পরদিন
অফিস করছেন, কিন্তু বাসায় ফিরতে পারছেন না। ছয়দিন আগে তিনিসহ কয়েকজন সহকর্মী বাসা
থেকে অল্প পরিমাণ কাপড় নিয়ে এসেছিলেন, রাতে অফিসে থাকতে হবে বলে। সেগুলোও প্রায়
ময়লা হয়ে গেছে। যদিও মাঝে একবার অফিসের পিয়নকে দিয়ে কিছু কাপড় ধুইয়ে নিয়েছিলেন,
কিন্তু তাতে তার মনে স্বস্তি হচ্ছিল না। তিনি পরিপাটি মানুষ। পাট করে ইস্ত্রি ছাড়া
জামা-কাপড় পরতে পারেন না। তার জুতো বা স্যান্ডেল সবসময় পরিষ্কার থাকে। প্রতিদিন
অফিসে আসার আগে নিয়ম করে দাড়ি-গোঁফ ছাঁটেন তিনি, গোসলের পর চুলে তেল মেখে সিঁথি
করে চুল আঁচড়ান। কিন্তু এই কদিন, অফিসে থাকতে থাকতে তার নাভিশ্বাস উঠে গিয়েছিল।
‘স্যার, যাব এবং কাল
দুপুরে আবার অফিসে চলে আসব।’ বললেন নূরুদ্দীন।
‘এই অবস্থায়, যাওয়া
কি ঠিক হবে? রাস্তায় তো রিকশা-গাড়ি কিছুই পাবেন না।’
চিন্তিত মুখে জানতে
চাইলেন সম্পাদক।
‘চিপাচাপা দিয়ে
হেঁটে হেঁটে চলে যাব। আপনি চিন্তা করবেন না।’
‘হুম।’ কোনো উত্তর না দিয়ে শব্দ করলেন সম্পাদক, তারপর
বললেন, ‘এক কাজ করুন। রাত পর্যন্ত অপেক্ষা করুন। নিউজের গাড়িগুলো যখন ফিরে আসবে,
আপনাকে একবার গিয়ে নামিয়ে দিয়ে আসবে। আমি বলে দেব।’
‘দরকার নেই স্যার।
আমি একাই যেতে পারব। বেশি দূর তো না।’
নূরুদ্দীন কাজ করেন
একটি সংবাদপত্রে, সিনিয়র প্রুফরিডার। আজ তার সাপ্তাহিক ছুটির দিন। আজ যেতে না
পারলে, পরের ছয়দিনও তিনি অফিস থেকে বের হতে পারবেন না। বাইরের যা অবস্থা, এই
অবস্থার অবসান কবে ঘটবে—তা কেউ বলতে পারছে
না। তাই তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন, আজ রাতের জন্য তিনি বাসায় ফিরবেন। জামা-কাপড় বদল
করে, পরদিন দুপুরে এসে আবার অফিসে করবেন এবং নতুন কিছু জামা-কাপড় সঙ্গে আনবেন পরের
সপ্তাহের জন্য। তাই, বিকেলে বাসায় ফিরবেন, খবরটা তিনি সকালে জানিয়ে দিয়েছিলেন
স্ত্রী রাবেয়া খাতুনকে। রাতে বাসায় ফিরে তিনি ভাতের সঙ্গে কী কী তরকারি খাবেন,
সেগুলোও জানিয়ে রেখেছিলেন। টানা ছয়দিন অফিসে থেকে, তিনবেলা রুটি, সবজি আর ডিমভাজি
খেতে খেতে তার জিহ্বায় চর পড়ে গিয়েছিল।
অফিস থেকে রাস্তায়
নেমে এলেন নূরুদ্দীন। সুনসান রাস্তায় মানুষজন নেই বললেই চলে। অল্প কিছু মানুষের
আনাগোনা দেখা যাচ্ছিল মূল রাস্তার আশপাশের গলিগুলোতে। কিন্তু কোনো যানবাহন নেই
রাস্তায়, শুধু মোড়ের গলিমুখে কিছু পুলিশের গাড়ি আর এ্যাম্বুলেন্স ছাড়া। মূল রাস্তায়
বাস-টেম্পু-রিকশা যে চলছে না, সেটা তিনি জানতেন। তবে অলিগলিতে কিছু কিছু রিকশা
চলছে—শুনেছিলেন সহকর্মীদের কাছ থেকে। বিশেষ করে, যেসব সাংবাদিক
মাঠে থেকে সরাসরি খবর সংগ্রহ করছিলেন, তাদের কাছ থেকে। দুদিন আগে একজন ফটোগ্রাফার
সংবাদের ছবি তুলতে গিয়ে মাথা ফাটিয়ে অফিসে ফিরেছিলেন। যদিও তার মাথায় হেলমেট ও
বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট ছিল। বিক্ষোভকারীদের দিক থেকে ছুড়ে আসা একটা বড় ইটের টুকরোর
ধাক্কা সামলাতে পারেননি তিনি। পড়ে গিয়ে মাথায় বড় চোট পেয়েছিলেন এবং ওই অবস্থায়
অনেক্ষণ পড়ে ছিলেন রাস্তায়। তাতে রক্তক্ষরণ হয়েছিল খুব। অন্যদিকে, টিয়ার গ্যাসের
ধোঁয়ায় তার চোখগুলোও ফুলে উঠেছিল বীভৎসরকমভাবে। পরে, তাকে পত্রিকার স্টিকারযুক্ত
গাড়িতে করে হাসপাতালে নিয়ে যেতে হয়েছিল।
গতকাল
সারাদিনব্যাপী, তাদের অফিসের নিচের রাস্তাসহ আশপাশের এলাকাজুড়ে ব্যাপক গোলাগুলি,
ধরপাকড়, ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ঘটেছিল এবং চলেছিল মাঝরাত অবধি। পিঁপড়ের মতো পিলপিল
করা ছাত্র-জনতার দিকে পুলিশকে টিয়ারসেল ছুড়তে দেখেছিলেন তিনি। জলকামানও ছুড়তে
দেখেছেন। মাথার ওপর তখন একটা হেলিকপ্টার বারবার চক্কর দিয়ে যাচ্ছিল পুরো এলাকার
আকাশজুড়ে। সেখান থেকেও কামানের মতো কিছু একটা ছুড়তে দেখেছিলেন, যেটা রাস্তায় পড়তেই
বিকট শব্দে ফেটে গিয়ে মানুষর কানে তালা লাগিয়ে দিচ্ছিল। জানালায় দাঁড়িয়ে, সেসব
দেখতে দেখতে সহকর্মীদের কয়েকজন একসঙ্গে চিৎকার করে উঠেছিল তখন, ‘গুলি করছে ওরা,
গুলি, গুলি।’ গুলি-বন্দুক বিষয়ক অভিজ্ঞতা নূরুদ্দীনের ছিল না কোনোকালে। ফলে, তিনি
ঠিক আন্দাজ করতে পারছিলেন না, আসলে কী ছিল সেটা। জানালা দিয়ে তিনি যত পুলিশ
দেখেছিলেন, সকলেই নানারকম অস্ত্রে সজ্জিত ছিল। পুলিশের দলের ভিড়ে কিছু তরুণকেও
দেখতে পেয়েছিলেন নূরুদ্দীন। তাদের শরীরে পুলিশের পোশাক ছিল না বটে, কিন্তু তাদের
হাতে ছিল পুলিশের মতো অস্ত্র, মাথায় হেলমেট। তারাও অস্ত্রহাতে পুলিশের সঙ্গে
পাল্টা ধাওয়া করছিল বিক্ষোভকারীদের দিকে, গুলিও ছুড়ছিল। দুপুরের দিকে রাস্তায়
ছাত্র-জনতার সংখ্যা যখন কয়েক গুণ বাড়তে শুরু করছিল, পুলিশ তখন অস্ত্রহাতে চারদিক
থেকে গুলি ছুড়তে শুরু করেছিল। নূরুদ্দীন সেসব নিজের চোখে দেখেছিলেন। কিন্তু যখন
তিনি নিজের চোখে দেখলেন, গুলি খেয়ে দুজন তরুণ রাস্তায় লুটিয়ে পড়ছিল, রক্তে ভেসে
যাচ্ছিল রাস্তার কালো পিচ—তিনি জানালা থেকে
মুহূর্তেই তার চোখ দুটো সরিয়ে নিয়েছিলেন। নিজেও সরে গিয়েছিলেন। নূরুদ্দীনের
হৃদপিণ্ড এতটা মজবুত ছিল না যে, সেই দৃশ্য তিনি অবলীলায় দেখে যেতে পারতেন।
দুপুরটা শান্ত।
রাস্তায় বিক্ষোভকারীরা নেই, পুলিশের উপস্থিতিও কম। বাসায় ফেরার জন্য, সকাল থেকে
নূরুদ্দীন জানালা দিয়ে কিছুক্ষণ পর পর, রাস্তায় চোখ রেখে, পরিস্থিতির ওপর লক্ষ
রাখছিলেন। পরে, নিরাপদ ভেবে, দুপুরের দিকে রাস্তায় নেমে এসেছিলেন তিনি, সাথে
পুরোনো জামা-কাপড়ের ছোট একটা ব্যাগ। রাস্তায় নেমেই তিনি দেখলেন, অজস্র ভাঙা ইটের
টুকরো ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে রাস্তা ও ফুটপাতজুড়ে। বুঝলেন, গতকাল সারাদিনের তাণ্ডবের
ফল। নূরুদ্দীন ইটের টুকরোগুলোকে এড়িয়ে রাস্তা পার হলেন। রাস্তা দিয়ে হাঁটা যাচ্ছিল
না ইটের টুকরোর জন্য। তাছাড়া, নিরাপদও ছিল না। তিনি হাঁটতে লাগলেন ফুটপাতের
একেবারে কিনারা ঘেঁষে, যেন ইটের টুকরোয় তিনি হোঁচট খেয়ে পড়ে না যান। রাস্তার
দুপাশের দোকানপাট-অফিসের গেট সব বন্ধ। দেখলেন, কিছু কিছু দোকানের দরজা ভেঙে ফেলেছে
কারা—হয়তো দোকান লুট করে নিয়ে গেছে। কিছু কিছু দোকানের দরজা তখনো
আধভাঙা। রাস্তার পাশে, কাচঘেরা বাণিজ্যিক ভবনগুলোর বাইরের দিকের কাচগুলোর কোনোটি
আন্ত নেই, ইট ছুড়ে ছুড়ে সব ভেঙে ফেলা হয়েছে। সেখানকার রাস্তায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে
অসংখ্য কাচের টুকরো। সেসব দেখতে দেখতে নূরুদ্দীন একটু একটু করে এগুতে লাগলেন। আর খানিকটা
রাস্তা এগুলে, বাম দিকে একটা গলির মুখ আছে। তিনি তখন গলির ভেতর ঢুকে পড়বেন এবং গলি
ধরে বেশ কিছুটা রাস্তা হাঁটলে, অনেকটা পথ বাঁচিয়ে তিনি মূল রাস্তার অন্যপ্রান্তে
গিয়ে উঠতে পারবেন। যদি গলির ভেতর কোনো রিকশা পাওয়া যায়, সেটাও চিন্তা করতে লাগলেন
তিনি।
‘সাধারণ মানুষ
বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছে কেন?’ হাঁটতে হাঁটতে নিজেকেই প্রশ্ন করলেন নূরুদ্দীন।
নূরুদ্দীনের পেশা
প্রুফরিডিং। সাংবাদিকদের লেখা সংবাদের বানান ও ভাষারীতি সংশোধন করা নূরুদ্দীনের
কাজ। এই কাজের জন্য, তিনিসহ তার পত্রিকায় আরো ছয়জন প্রুফ রিডার আছে। তিনি তাদের
মধ্যে বয়োজ্যেষ্ঠ। বিভিন্ন পত্রিকায় দীর্ঘ আটাশ বছর একই কাজ করতে করতে, নূরুদ্দীন
নিজেকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলেছিলেন সংবাদের সঙ্গে। অফিসে, প্রতিটি সংবাদ তাকে
খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়তে হয়—একবার তো বটেই, কখনো
কখনো দুবারও। ফলে, যেকোনো সংবাদ তার মাথায় গেঁথে যেত। তাই সংবাদের জন্য তাকে আলাদা
করে পত্রিকা পড়তে হতো না।
‘মানুষের সহ্যের
সীমা অতিক্রম করে গেলে, মানুষ বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে।’ নিজেকে নিজেই উত্তর দিলেন
নূরুদ্দীন।
‘মানুষের সহ্যের
সীমা কতটুকু?’ আবার নিজেকে প্রশ্ন করলেন তিনি।
‘যতটুকু পর্যন্ত
মানুষের জীবনযাপনের নিশ্চয়তা থাকে।’
‘সরকার তো দেশের
উন্নয়ন করছিল। বিশ্বের বুকে দেশের সুনামও হচ্ছিল।’
‘দেশের উন্নয়ন আর
মানুষের উন্নয়ন—এক বিষয় না।’ মনে মনে উত্তর দিলেন নূরুদ্দীন।
‘মানুষের উন্নয়ন কী?’
নূরুদ্দীন প্রশ্ন করলেন নিজেকে।
‘স্বাভাবিকভাবে
বেঁচে থাকার নিশ্চয়তা।’
সত্যিকার অর্থে,
মানুষের জীবনযাপনের নিশ্চয়তা দিনে দিনে লোপ পেতে শুরু করেছিল, ভাবলেন নূরুদ্দীন।
নিজেও ছা-পোষা একজন মানুষ। সাধারণ একটা চাকরি করেন। এরকম চাকরিতে উন্নতির সুযোগ
নেই জেনেও তরুণ বয়সে পত্রিকায় যোগ দিয়েছিলেন তিনি। তখন তিনি কবিতা লিখতেন, তাই
ভাষার প্রতি ছিল অগাধ দখল। কিন্তু সেসব দক্ষতা তার জীবনকে উন্নত করতে পারেনি।
এমনকি, পরবর্তী জীবনে তিনি কবিও হতে পারেননি। আবার, সাংবাদিকতা করার যে বিশেষ
দক্ষতার প্রয়োজন, সেটাও তার ছিল না। ফলে, একই পেশায় রয়ে গিয়েছিলেন দীর্ঘ আটাশ বছর
এবং চাকরিজীবনে তার বেতন যতটুকু বেড়েছিল, তা-ও নামেমাত্র—সময়ের
চাহিদার তুলনায় অর্ধেকেরও কম। ততদিনে তিনি বিবাহিত হয়েছেন, সন্তান জন্ম দিয়েছেন
দুটি এবং বৃদ্ধ বাবা-মায়ের প্রতি তার দায়িত্বও বেড়ে গিয়েছিল। কিন্তু জীবনের মান
আগায়নি একচুলও। জীবনের নিশ্চয়তাও খুঁজে পাননি তিনি, বরং দিনে দিনে অনিশ্চিত হয়ে
পড়ছিল তার সংসারের ভবিষ্যৎ। ভাবতে ভাবতে নূরুদ্দীনের মনে হতে লাগলো, তারও সহ্যের
সীমা পার হয়ে গেছে। তবে তিনি কেন অন্য সবার মতো কেন রাস্তায় নামছেন না? কেন
বিক্ষোভে অংশ নিচ্ছেন না? কেন সরকারের পতন চাচ্ছেন না?
নিজেকে কোনো উত্তর
দিতে পারলেন না নূরুদ্দীন, বরং একটা অস্পষ্ট ধোঁয়ার কুণ্ডলি তার মাথার ভেতর ধীরে
ধীরে জট পাকাতে শুরু করল।
নূরুদ্দীন হাঁটতে
হাঁটতে প্রায় গলিমুখের কাছাকাছি চলে এলেন। অন্যসময়, গলির মুখে রিকশাওয়ালাদের জটলা
থাকে। এখন কিছু নেই, পুরোপুরি ফাঁকা। দুটো নেড়িকুকুর রাস্তায় শুঁকে শুঁকে এলোমেলো
ঘুরে বেড়াচ্ছিল সেখানে, হয়তো খাবার খুঁজছে। গলিমুখের আগে একটা সরকারি অফিস ছিল,
সেটা প্রায় পুড়ে ছাই। অফিসের ধারঘেঁষে রাস্তায় দাঁড়ানো সরকারি গাড়িগুলো থেকে তখনও
পোড়া ধোঁয়া উড়ছিল। ততক্ষণে নূরুদ্দীনের দুচোখে মৃদু জ্বালা করতে শুরু করেছে। হয়তো
গতকাল সারাদিনের টিয়ার সেলের গ্যাস সম্পূর্ণভাবে বাতাসে মিলিয়ে যায়নি। ভাবতে
ভাবতে, নূরুদ্দীন হঠাৎ কিছুক্ষণের জন্য থমকে দাঁড়িয়ে পড়লেন রাস্তায়। তিনি যেসব
গলিগুলোকে ভেবেছিলেন ফাঁকা, দেখলেন, সেখান থেকে মুহূর্তের মধ্যে নানাবয়সী মানুষ
ছোট ছোট দলে বেরিয়ে আসতে শুরু করেছে মূল রাস্তায়। চোখের পলকে মূল রাস্তা ভরে উঠতে
শুরু করল মানুষে-মানুষে। ধীরে ধীরে নূরুদ্দীন দেখলেন, সরকারবিরোধী স্লোগানে
স্লোগানে আশপাশের বাতাস ভারি হয়ে উঠতে শুরু করেছে।
‘মানুষ সরকারের পতন
চাইছে কেন?’ আবার নিজেকে প্রশ্ন করলেন নূরুদ্দীন।
‘কারণ, দেশটা
জনগণের। সরকারের না।’ নিজেকে উত্তর দিলেন তিনি।
‘তাহলে সরকার কে?’
‘জনগণ যাদের চাইবে।
তারাই সরকার।’
সাধারণ জনগণ সরকারকে
আর ক্ষমতায় চাইছে না। তাহলে জনগণ কাকে চাইছে? কার নেতৃত্বে আন্দোলন করছে সাধারণ
মানুষ? সরকারকে হটিয়ে জনগণ কাদের হাতে ক্ষমতা তুলে দিতে চায়? তৎক্ষণাৎ প্রশ্নের
উত্তর পেলেন না নূরুদ্দীন। তিনি জানেন, বিক্ষোভটা শুরু হয়েছিল কিছু ছাত্রদের
দাবি-দাওয়াকে কেন্দ্র করে। ছাত্ররা সরকারের কাছে তাদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট
দাবি-দাওয়া করবে—এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু, পরে সেটা রূপ নিয়েছিল
সরকার পতনের আন্দোলনে। বলা হচ্ছিল, দেশব্যাপী আন্দোলনের নেতৃত্ব দিচ্ছে ছাত্ররা।
কিন্তু তাদের কোনো নাম বা পরিচয় বা নেতৃত্ব প্রকাশ করা হয়নি। যাদেরকে নূরুদ্দীন
টেলিভিশনের পর্দায় দেখেছিলেন, পত্রিকায় যাদের নাম ছাপা হচ্ছিল, সাধারণ মানুষ তাদের
কাউকে চিনত না বা নেতা হিসেবে তারা পরিচিত নন। তাহলে একক কোনো রাজনৈতিক দল বা
নেতার অধীনে আন্দোলন তৈরি হয়নি, এটুকু নিশ্চিত হয়েছিলেন নূরুদ্দীন। মনে মনে তিনি
ভাবলেন, সরকারের প্রতি সাধারণ মানুষের ক্ষোভ ও অসমর্থন এতটাই বেড়ে গিয়েছিল যে,
তারা নেতৃত্ব বা রাজনীতি ভুলে গিয়ে সকাতরে রাস্তায় নেমে এসেছিল।
নূরুদ্দীন দেখলেন,
মূল রাস্তার অন্যপ্রান্তেও জড়ো হতে শুরু করেছে পুলিশ এবং আরো বেশি অস্ত্রশস্ত্রে
সজ্জিত হয়ে। তারা মাইক হাতে কীসব ঘোষণা দিয়ে যাচ্ছিল বারবার। কিন্তু জনগণের
স্লোগানের ভিড়ে সেসব কথা শোনা যাচ্ছিল না। নূরুদ্দীন দ্রুত পা চালিয়ে, খানিকটা
দৌড়ে, গলির ভেতর ঢুকে পড়লেন। বিক্ষোভকারী ছাত্র-জনতা এবং পুলিশের অবস্থানের
মধ্যবর্তী রাস্তার অংশ তার কাছে কোনোভাবেই নিরাপদ মনে হচ্ছিল না। কিন্তু নূরুদ্দীন
দেখলেন, এপ্রান্ত থেকে কিছু তরুণ ছুটে গিয়ে রাস্তার মাঝখানে গাড়ির কিছু টায়ার
স্তূপ করে রেখে, তাতে আগুন ধরিয়ে দিল। তাদের দেখাদেখি আরো কিছু তরুণ-যুবক যোগ দিল
সেখানে। কিছুক্ষণের মধ্যে রাস্তার বিভিন্ন জায়গায়, টায়ারপোড়া কালো ধোঁয়ায় ছেয়ে
যেতে লাগলো আকাশ।
‘সাধারণ মানুষ
সরকারকে ভোট দিয়ে নির্বাচিত করতে পারেনি। অনেক বছর মানুষ ভোট দেওয়ার সুযোগ পায়নি।’
নিজেকে বললেন নূরুদ্দীন। কিছুক্ষণ পর আবার নিজেকেই প্রশ্ন করলেন, ‘তাহলে কি ভোট-ই
একমাত্র সমাধান? কিংবা নতুন কাউকে ক্ষমতায় বসানো?’
‘না। বিশ্বের
ভূ-রাজনীতিও এর সঙ্গে জড়িত।’
‘আর কী কী?’
‘ইতিহাস এবং
বাস্তবতা।’
‘যেমন?’ জানতে
চাইলেন নূরুদ্দীন।
‘ক্ষমতার লোভে
মানুষের সমর্থন ও ভালোবাসাকে উপেক্ষা করতে শুরু করেছিল সরকার। কোনো শাসক একবার
ক্ষমতাসীন হলে, ক্ষমতা হারানোর ভয়ও তার ভেতর কাজ করে। তখন সে, তার চারপাশে
সুরক্ষার দেওয়াল তৈরি করতে শুরু করে। প্রয়োজনে বলপ্রয়োগ, গুম, খুন, কারাবন্দির মতো
ঘটনা ঘটাতেও দ্বিধা করে না। অন্যদিকে, ইতিহাসের আবেগকে পুঁজি করে সাধারণ মানুষকে
মানসিকভাবে দুর্বল করে রাখতেও শিখে গিয়েছিল সরকার। তারা বুঝে গিয়েছিল, মানুষ তার
দেশকে ভালোবাসে। ফলে, দুর্বল মানুষগুলো শত নির্যাতন সহ্য করেও কখনো রুখে দাঁড়াতে
পারেনি সরকারের বিরুদ্ধে। কারণ, মানুষ ভাবত কিংবা বছরের পর বছর তাকে ভাবতে শেখানো
হয়েছিল যে, মানুষের জীবন থেকে ইতিহাসের গুরুত্ব অনেক বেশি। তাই, সরকারের বিরোধিতা
করলে সে ইতিহাস থেকে ছিটকে যেতে পারে, সে হয়ে পড়তে পারে দেশদ্রোহী। ইতিহাসে, দেশের
জন্য সাধারণ মানুষ প্রাণ দিয়েছিল অকাতরে, তাই সে দেশদ্রোহী হতে চাইত না। নীরবে
সরকারের সকল নির্যাতন সহ্য করে যেত, কোনো প্রতিবাদ পর্যন্ত করত না। অন্যদিকে,
আবেগে দুর্বল হয়ে থাকা মানুষগুলোর পিঠে পা রেখে, সিঁড়ি বেয়ে বেয়ে, সরকার হয়ে
উঠেছিল স্বৈরাচার—নিকৃষ্টতম স্বৈরাচার।’
‘আর যারা
ইতিহাসবিরোধী ছিল?’
‘তারা হয়তো এই
বিক্ষোভকারী ছাত্র-জনতার মধ্যে মিশে গেছে ইতিমধ্যে, পরাজয়ের প্রতিশোধ নেবে বলে।
কারণ, তারা সবসময় কোনো না কোনো সুযোগের অপেক্ষায় ছিল, সুযোগ পেলেই দেশের ইতিহাসকে
বদলে দেবে বলে। অথচ, সাধারণ মানুষ তাদের মুখোশ কখনোই চিনে নিতে পারেনি, আজও না।’
ততক্ষণে পুলিশের
একটা বড় দল, রাস্তার ওপ্রান্ত থেকে একটু একটু করে এগিয়ে আসতে শুরু করল এপ্রান্ত
বরাবর। তাদের হাতের অস্ত্রগুলো ছিল তাক করা এবং কিছু কিছু পুলিশের হাতে ছিল বর্ম ও
লাঠি-পেটরা। দুপুরে যখন নূরুদ্দীন অফিস থেকে বের হয়েছিলেন, তখন এলাকাটা ছিল শান্ত।
যদিও ছয়তলা ভবনের জানালা দিয়ে দূর-দূরান্তের বিভিন্ন এলাকায় পোড়া ধোঁয়া উড়তে
দেখেছিলেন তিনি। সেখানের আকাশে গোটা দুয়েক হেলিকপ্টারও চক্কর দিচ্ছিল তখন।
নূরুদ্দীন একবার ভাবলেন, গলির ভেতর দিয়ে তিনি অন্যদিকে চলে যাবেন কিনা। কিন্তু
গলির ভেতর মানুষের ছোটাছুটি দেখে আন্দাজ করতে পারলেন, সম্ভবত গলির ভেতরও পুলিশের
একটা ছোট দল ঢুকে পড়েছিল। সেখান থেকেও মানুষের শ্লোগানের শব্দ শুনতে পাচ্ছিলেন
তিনি। নূরুদ্দীন পকেট থেকে তার সংবাদপত্রের পরিচয়পত্র গলায় ঝুলিয়ে নিলেন, পুলিশের
মুখোমুখি পড়লে যেন তৎক্ষণাৎ দেখাতে পারেন। মূল রাস্তায় পুলিশের দল এগিয়ে আসতে
আসতে, এপ্রান্তের বিক্ষোভকারীদের মধ্যে উত্তেজনা দেখা দিতে শুরু করল। তাদের
স্লোগানের স্বর বাতাস কাঁপিয়ে আরো চড়া হতে লাগলো। একসময়ে তারা ধৈর্যের বাধ ধরে
রাখতে পারল না। পুলিশের দিকে মুহুর্মুহু ইটপাটকেল ছুড়তে শুরু করে দিল। তার আগেই,
রাস্তার পাশে দুটো দোকানের খাঁজের মধ্যে নিজের শরীরকে লুকিয়ে ফেললেন নূরুদ্দীন।
পুলিশও বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে, তাদের দিকে পাল্টা টিয়ারশেল ছুড়ল কয়েকটা।
নূরুদ্দীন দেখলেন, বিক্ষোভকারীরা ছত্রভঙ্গ না হয়ে বরং ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে রাস্তার
কয়েকদিকে ছড়িয়ে পড়েছে এবং ইটপাটকেল ছুঁড়েই যাচ্ছে। নূরুদ্দীন তখন রাস্তার দিকে
তাকিয়ে থাকতে পারছিলেন না, তার চোখ জ্বালা করছিল ভীষণ। তার সঙ্গে থাকা ছোট ব্যাগ
থেকে একটা ময়লা জামা বের করে, তাতে চোখ-মুখ চেপে ধরে রাখলেন তিনি কিছুক্ষণের জন্য।
‘সরকারি অফিসে,
গাড়িতে, স্টেশনে, বিভিন্ন স্থাপনায় আগুন ধরিয়ে দিয়েছিল যারা, বিভিন্ন থানার অস্ত্র
লুট করেছিল যারা, তারা কি সকলেই ছাত্র?’
‘এমন ধ্বংসলীলা
চালানোর জন্য যথেষ্ট প্রশিক্ষিত না ছাত্ররা। তার জন্য দরকার বিশেষ সাহস ও
প্রশিক্ষণ, নিখুঁত পরিকল্পনা ও ধ্বংসযজ্ঞের সঠিক উপকরণ।’
‘সরকার পতনের
আন্দোলন তো ছাত্ররাই শুরু করেছিল।’
‘আন্দোলন আর
ধ্বংসযজ্ঞ—এক জিনিস না।’
পুলিশের দল ততক্ষণে
এগিয়ে এসেছে অনেকটা। ছাত্র-জনতাও এক-পা পিছু হটছে না। তাদের চোখেমুখে বিন্দুমাত্র
ভয়ের চিহ্ন নেই, যেন বিজয়ী না হয়ে তারা বাড়ি ফিরতে চায় না। ফলে, তারাও ইট-পাটকেল
ছুড়তে ছুড়তে একটু একটু করে এগুতে লাগলো পুলিশের দিকে। রাস্তার দুই প্রান্ত একে
অপরের মুখোমুখি হলে, কী কী ঘটতে পারে, তা-ই মনে মনে একবার ভেবে নিলেন নূরুদ্দীন।
তিনি যেখানে ছিলেন, দুই দোকানের খাঁজে, সেখানে আর টিকে থাকতে পারছেন না। তার
চোখগুলো লালচে হয়ে ফুলে উঠতে শুরু করেছে ততক্ষণে। কারণ, এরমধ্যেই পুলিশ আরো কয়েক
রাউন্ড টিয়ারসেল ছুঁড়েছিল ছত্রজনতার দিকে। তার ঝাঁঝালো ধোঁয়ায় রাস্তার আশপাশ ঢেকে
যাচ্ছিল ঘন কুয়াশার মতো করে। নূরুদ্দিন দেখলেন, রাস্তার এপ্রান্ত থেকে কুয়াশা ভেদ
করে হঠাৎ একঝাঁক তরুণ-যুবক-ছাত্র-জনতা গুলির মতো ছুটে গিয়ে ধাওয়া করল পুলিশের ওপর।
হয়তো এমন আকস্মিক আক্রমণ করার প্রস্তুতি তাদের মধ্যে আগে থেকেই ছিল। মুহূর্তের
জন্য নূরুদ্দীন লক্ষ করলেন, ছুটে যাওয়া সেই তরুণ-যুবকদের মধ্যে, কারো কারো চোখ অন্ধকারে
জ্বলতে থাকা হায়েনার চোখের মতো জ্বলজ্বল করে জ্বলছিল। মুখের দুপাশ থেকে বেরিয়ে
এসেছিল সূঁচালো হিংস্র দুটো দাঁত এবং তাদের ক্ষিপ্রতা দেখে মনে হচ্ছিল, তারা যেন
পুলিশের দিকে নয়, দেশের মানচিত্রের দিকে ধেয়ে যাচ্ছিল, মানচিত্র চিবিয়ে খাবে বলে।
পুলিশও এমন আচমকা ধাওয়ার
জন্য প্রস্তুত ছিল না। ফলে, তারাও উল্টোদিকে ঘুরে রাস্তার অন্যপ্রান্তের দিকে
নিরাপদে সরে যাওয়ার চেষ্টা করল। পিছিয়ে যেতে শুরু করল পুলিশের দল। কিছুদূর ধাওয়া
করে ছাত্র-জনতা উল্লসিত হয়ে, এক দফা-এক দাবির স্লোগান দিতে দিতে আবার ফিরে আসতে
শুরু করল রাস্তার এপ্রান্তের দিকে। নূরুদ্দীন তৎক্ষণাৎ শুনতে পেলেন হেলিকপ্টারের
আওয়াজ। দূরের এলাকা থেকে একটা হেলিকপ্টার দ্রুতগতিতে উড়ে আসছে এদিকে। হয়তো তারা
রাস্তার অন্যপ্রান্তের পুলিশদের থেকে কোনো সংকেত পেয়েছিল। ছাত্র-জনতা তখনো সবাই
এপ্রান্তে এসে পৌঁছাতে পারেনি, তার আগেই হেলিকপ্টারটি রাস্তার দশ হাত উপরে নেমে
এসে একটা চক্কর দিয়ে আবার উড়ে চলে গেল দূরের আকাশে। নূরুদ্দীন তার জায়গা থেকে
স্পষ্ট দেখতে পেলেন, হেলিকপ্টারের খোলা দরজার দুপাশে দুজন ভারি অস্ত্র তাক করে আছে
রাস্তার এপ্রান্তে থাকা ছাত্র-জনতার দিকে। সঙ্গে সঙ্গে নূরুদ্দীন দুই দোকানের
খাঁজের আরো ভেতরে গলিয়ে দিলেন তার শরীরটাকে, যেন হেলিকপ্টার থেকে তাকে দেখা না
যায়। বেশি সময় পার হয়নি, হেলিকপ্টারটি আকাশে বৃত্তাকায় একটি চক্কর দিয়ে আবার ফিরে
এল রাস্তার দশহাত উপরে এবং পর পর দুই রাউন্ড গোলা ছুড়ল রাস্তার এপ্রান্ত বরাবর।
বিকট শব্দে গোলা দুটি ফাটল আশপাশের সকলের কানের পর্দা ছিন্নভিন্ন করে দিয়ে। প্রায়
একই সময় হেলিকপ্টার থেকে গুলি ছোঁড়ার শব্দও পেলেন তিনি। নূরুদ্দীন বুঝলেন, বিকট
শব্দগুলো সাউন্ড-গ্রেনেডের। নূরুদ্দীনের দুই কান বন্ধ হয়ে গেল মুহূর্তের জন্য,
মাথার ভেতর বোঁ বোঁ শব্দ করতে লাগলো এবং তিনি দেখলেন, সাউন্ড-গ্রেনেড ফাটার সঙ্গে
সঙ্গে রাস্তার অন্যপ্রান্ত থেকে পুলিশের দল টিয়ারসেল ছুড়তে ছুড়তে এগিয়ে আসতে শুরু
করেছে এপ্রান্তের দিকে। আবার কুয়াশার মতো ধোঁয়ায় ছেয়ে যেতে শুরু করল রাস্তার
আশপাশ। দুই দোকানের খাঁজের মধ্যে আর থাকা সম্ভব না—ভাবলেন নূরুদ্দীন।
সেখান থেকে বের হওয়া দরকার, নইলে টিয়ার গ্যাসের ধোঁয়ায় তার চোখ দুটো অন্ধ হয়ে যেতে
পারে। তার উপর তিনি নিঃশ্বাসও নিতে পারছিলেন না। পরে, তিনি এক ছুটে বের হয়ে গেলেন
ধোঁয়ার মধ্য দিয়ে, নিজেকে আড়াল করতে চাইলেন ছাত্র-জনতার ভিড়ের মধ্যে। কিন্তু তার
আগে, টিয়ারসেলের ধোঁয়ায় যখন সব আচ্ছন্ন হয়ে গেল, বিক্ষোভকারীরা ছত্রভঙ্গ হয়ে যেতে
লাগলো, ছুটোছুটি করতে শুরু করল এদিক-ওদিক, ঠিক তখন পুলিশ এলোপাতাড়ি গুলি করতে শুরু
করল ছাত্র-জনতার দিকে। গুলির সেই শব্দ ঢাকার জন্য, নূরুদ্দীন ছুটতে ছুটতে তার
কানগুলো চেপে ধরলেন দুই হাত দিয়ে। হাত থেকে তার কাপড়ের ব্যাগটা কোথায় যে ছিটকে
পড়ল, বুঝতেও পারলেন না তিনি।
পুলিশ কতগুলো গুলি
ছুড়েছিল, নূরুদ্দীন মনে করতে পারলেন না। তিনি যখন রাস্তা থেকে উঠে দাঁড়ালেন,
পুলিশের দল তখন রাস্তায় ছিল না। কতক্ষণ তিনি রাস্তায় পড়ে ছিলেন সেটাও আন্দাজ করতে
পারলেন না। কিন্তু ততক্ষণে, টিয়ারসেলের ধোঁয়া কমে গিয়ে কুয়াশাভাবটা কেটে গেছে
অনেকটা, তাই আশপাশটা বেশ পরিষ্কার লাগছিল তার কাছে। কিন্তু ঝাঁঝালো গন্ধটা তখনো
নাকে লাগছিল তীব্র হয়ে, চোখও জ্বালা করছিল। বিক্ষোভকারী ছাত্র-জনতাদের কাউকে তিনি
দেখতে পেলেন না। হয়তো সবাই ছত্রভঙ্গ হয়ে নানাদিকে ছড়িয়ে গিয়েছিল, কিংবা হয়তো শহরের
অন্যদিকের কোথাও আবার জড়ো হতে শুরু করেছে তারা। তবে রাস্তার এখানে-সেখানে অনেকগুলো
গুলিবিদ্ধ মৃতদেহ পড়ে থাকতে দেখলেন নূরুদ্দীন। একবার গুনতে শুরু করেছিলেন মৃতদেহের
সংখ্যা, কিন্তু শেষ করতে পারলেন না। মাথার ভেতর সংখ্যাগুলো বারবার এলোমেলো হয়ে
যাচ্ছিল তার, নাকি তিনি তৎক্ষণাৎ ছোটবেলার ধারাপাত ভুলে গিয়েছিলেন, কে জানে!
নূরুদ্দীন আবার
হাঁটতে শুরু করলেন তার বাসার দিকে। দুপুর গড়িয়ে, বিকেল হয়ে এসেছিল চারপাশ।
রাস্তাগুলো আবার ফাঁকা হয়ে গেছে। ইট আর কাচের টুকরোয় ঢেকে আছে রাস্তাগুলো। তিনি
ফুটপাত ধরে হাঁটতে শুরু করলেন এবং মূল রাস্তা এড়ানোর জন্য পরের গলিতে ঢুকে পড়লেন।
গলির রাস্তাগুলোও সুনসান। গলির দোকানপাট সব বন্ধ, বাসা-বাড়ির দরজা খিল দেওয়া,
এমনকি জানালাগুলোও। নূরুদ্দীনের কাছে মনে হচ্ছিল, যেন একটি মৃতগলি পেরিয়ে অনন্তের
দিকে হেঁটে চলছেন তিনি। যদি একটা রিকশা পাওয়া যায়, এই ভেবে ঘাড় ঘুরিয়ে
এদিক-ওদিক-পেছনে তাকালেন একবার, কিন্তু কিছুই দেখতে পেলেন না। কিছুক্ষণ হেঁটে
হেঁটে তিনি মূল রাস্তার আরেকটা শাখায় গিয়ে পৌঁছালেন। রাস্তায় ওঠার আগে আরেকবার
চারপাশটা দেখে নিলেন, বিক্ষোভকারী ছাত্র-জনতা কিংবা পুলিশের উপস্থিতি আছে কিনা।
কিন্তু নেই। পুরো শহর যেন নিস্তব্ধ। শুধু দূরের কিছু কিছু এলাকার বিভিন্ন জায়গার
আকাশে কুণ্ডলিপাকানো ধোঁয়া উড়তে দেখা যাচ্ছে। সেসব আকাশে হেলিকপ্টারের ওড়াওড়িও
দেখতে পাচ্ছেন তিনি।
ক্লান্ত শরীরে তিনি
যখন তার এলাকায় গিয়ে পৌঁছালেন, দেখলেন এলাকার দোকানগুলোতে মানুষের উপচেপড়া ভিড়।
লোকজন বলাবলি করছিল, সন্ধ্যার পর নাকি কার্ফিউ জারি হবে পুরো শহরজুড়ে, রাস্তায়
নামবে সেনাবাহিনী। কাউকে দেখলে সরাসরি গুলি করবে তারা। ইতিমধ্যে দেশজুড়ে ইন্টারনেট
বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। ফলে, সোশ্যাল মিডিয়ায় কেউ কারো খবর আদান-প্রদান করতে পারছিল
না। হালনাগাদ তথ্যও কেউ জানতে পারছে না। আবার এই অবস্থা কতদিনের জন্য, তা-ও কেউ
নিশ্চিত করে বলতে পারছে না। তাই সবাই চাচ্ছিল, আগামী কিছুদিনের জন্য প্রয়োজনীয়
খাবার কিনে বাসায় মজুদ করে রাখতে। অন্যদিকে, রাস্তাঘাট বন্ধ থাকায়, দোকানগুলোতে
পর্যাপ্ত পণ্যের সরবরাহ ছিল না বলে দোকানগুলোও কুলিয়ে উঠতে পারছিল না। ফলে বেশি
দামে দোকানের জিনিসপত্র বিক্রি করতে হচ্ছিল তাদের। তাতেও, এলাকার দোকানগুলোতে
মানুষের ভিড় কমছিল না, বরং বাড়তেই থাকছিল। নূরুদ্দীন তার বাসার নিচে এসে দেখলেন,
বাসার গেটে পাড়া-প্রতিবেশীদের জটলা। তারা একে অপরের সঙ্গে শহরের নানা পরিস্থিতি
নিয়ে আলোচনা করছিল। কোথায় কী কী ঘটেছে, দেশের ভবিষ্যৎ কোনদিকে যাচ্ছে, কারা দেশের
শত্রু, কারা মিত্র, এইসব। কারো কারো অফিস বন্ধ, তারা বাড়িতে অলস সময় কাটাচ্ছিলেন।
কেউ কেউ, তাদের ব্যবসার অফিস খোলেননি, তারাও বাড়িতে টেলিভিশনের খবরের সামনে বসে
বসে সময় পার করছিলেন। তাই সকলের চোখে-মুখে একটা অনিশ্চয়তার ছায়া দেখতে পাচ্ছিলেন
নূরুদ্দীন।
নূরুদ্দীনের বাসা
দোতলায়। তিনি প্রতিবেশীদের জটলা এড়িয়ে, সিঁড়ি বেয়ে সোজা উঠে গেলেন তার বাসার দরজা
পর্যন্ত। বাসার দরজা হাট করে খোলা ছিল। বাসায় ঢুকতে ঢুকতে তিনি বাসার ভেতর থেকে
রাবেয়া খাতুনের মৃদু চাপা কান্নার শব্দ শুনতে পেলেন। রাবেয়া খাতুনের হাত চেপে ধরে,
পাশে বসে ছিল তার বড় ছেলে আজফার। তাদের ঘিরে সোফায়, চেয়ারে বসে সান্ত্বনা
দিচ্ছেলেন কিছু প্রতিবেশী, কেউ কেউ পাশঘেঁষে দাঁড়িয়েও ছিলেন। নূরুদ্দীন তৎক্ষণাৎ
তাদের কান্নার কারণ বুঝে উঠতে পারলেন না। পুরো বাসা যেন শোকে থমথমে হয়ে আছে। তিনি
যে এত ঝামেলা পেরিয়ে বাসায় ফিরেছেন, তা যেন কেউ লক্ষই করল না, এমনকি তার স্ত্রী
রাবেয়া খাতুনও না। সবাই তাহলে কাঁদছে কেন? বসার ঘরের টেলিভিশনে তখন বারবার করে
শহরের নানা এলাকার খবর প্রচারিত হচ্ছিল। টেলিভিশনের পর্দায় সংবাদপাঠিকার কণ্ঠে
নূরুদ্দীন তখন শুনতে পেলেন—
‘...মুহুর্মুহু
ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার পর, বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ টিয়ারসেল ছুড়তে বাধ্য
হয়। এসময় পুলিশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হেলিকপ্টার থেকে ছোড়া হয় সাউন্ড-গ্রেনেড।
বিক্ষোভকারীদের মধ্যে, বিদেশি শক্তির মদদপুষ্ট অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীরা ওত পেতে ছিল
বলে ধারণা করছে পুলিশ। সংঘর্ষের সময়, আত্মরক্ষার্থে পুলিশ গুলি ছুড়লে ঘটনাস্থলে
মৃত্যু হয় এগারো সন্ত্রাসীর। পুলিশ তাদের সকলের পরিচয় নিশ্চিত করেছে। তাদের মধ্যে
একজন ছিলেন সংবাদপত্রের কর্মী। সংবাদপত্রে কাজের আড়ালে তিনি দেশবিরোধী একটি
সন্ত্রাসীদলের সক্রিয় সদস্য ছিলেন। তার নামে স্থানীয় থানায় তিনটি অস্ত্রমামলা
রয়েছে। তার নাম নূরুদ্দীন পাটোয়ারী।’